২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ২০১৫ ॥ আজকের পদক্ষেপ, ভবিষ্যতের প্রতিরোধ

  • ডাঃ গোবিন্দ চন্দ্র দাস

বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ৯০ লাখ, বছরে বাড়ছে আরও ১ লাখ রোগী। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করলে রোগী নিজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সব বয়সের মানুষই আজ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছরই দ্বিগুণহারে বাড়ছে নতুন নতুন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা। সচেতনতার অভাবে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম স্থানে।

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হলো বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ক্যাম্পেইন, যা প্রতিবছর ১৪ নবেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের থিম হলো আজকের পদক্ষেপ, ভবিষ্যতের প্রতিরোধ। ২০১৪ থেকে ২০১৬-তিন বছর এটি মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল-এ ১৪ নবেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন।

২০০৭ সালে সিদ্ধান্ত হয়, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ অভিযান পরিচালনার থিমটি আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ২০০৭-০৮-এর থিম নির্ধারিত ছিল ‘শিশু ও তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস’। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের থিম নির্ধারিত হয়েছিল, ‘ডায়াবেটিস শিক্ষা ও প্রতিরোধ’। ২০০৭-০৮ সালে এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আরও বেশি শিশু ও তরুণকে এই পরিচর্যার আওতায় আনা। ডায়াবেটিসের জরুরী সঙ্কেত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। আর শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা। এ দিবসের নীল বৃত্তের ‘লোগো’টি ডায়াবেটিসকে পরাভূত করার জন্য বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের সূচক। লক্ষ্য হলোÑ পৃথিবীতে কোন শিশুই যেন ডায়াবেটিসে মারা না যায়। ডায়াবেটিসের মতো ক্রনিক রোগ ব্যক্তি, পরিবার, দেশ, এমনকি সারা পৃথিবীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি বহন করে- এমন সত্যটি জাতিসংঘ অনুধাবন করে ২০০৬ সালে একে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ : দিন দিন খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে । হঠাৎ হজমশক্তি বেড়ে গেল নাকি? কিন্তু এত খাবার যাচ্ছে কোথায়, হাতি-ঘোড়ার মতো নয়, চেহারা হচ্ছে একেবারে তালপাতার সিপাহীর মতো। ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেকটা এ রকমই।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ : এ রোগের চিকিৎসায় সর্করা নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়, শর্করামাত্রা বৃদ্ধিজনিত সমস্যাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তবেই ভবিষ্যতের জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নিয়মিত কায়িক পবিশ্রম এবং প্রয়োজনে ওষুধের ব্যবহার। একটা কথা ভুললে চলবে না যে শুধুমাত্র ওষুধের সাহায্যে কখনওই এই অসুখ সারানো সম্ভব নয়। অন্য দুটি নিয়ম পালন করা আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিক্যাল এক্সারসাইজের ব্যাপারটা বিশেষ করে মাথায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

স্ট্রেস ও ডায়াবেটিস : নার্সারির শিশু থেকে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক- এ যুগের প্রায় প্রতিটি মানুষকেই অনবরত মোকাবেলা করতে হচ্ছে স্ট্রেস আর এ্যাংজাইটির। ডায়াবেটিস ডেকে আনতে এই বাড়তি স্ট্রেসের একটা প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। গবেষণায় জানা গিয়েছে, ডায়াবেটিসের একটা মেজর রিস্ক ফ্যাক্টও হল স্ট্রেস। স্ট্রেসের আরও কিছু আনুষঙ্গিক কারণ ডায়াবেটিস ডেকে আনতে সাহায্য করে। যেমন স্ট্রেস কাটাতে অনেকেই ধূমপান করেন। নিকোটিনের অনেক অপকারিতার অন্যতম হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দেয়, ফলে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাড়ে। আবার অনেকে কাজের চাপমুক্ত হতে অতিমাত্রার মদ্যপান করেন। এর ফলে প্যাংক্রিয়াস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর তার অবশ্যম্ভাবী ফল ব্লাড সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি। সুতরাং স্ট্রেস কাটাতে আড্ডা দিন, গান শুনুন, ধ্যান ও নিউরোবিক জিম করুন বা বেড়াতে যান- ধূমপান, মদ্যপান করে বিপদ ডেকে আনবেন না।

সুরের মায়াজালে বন্দী করা যায় স্ট্রেস ও ডায়াবেটিসকে : গান ভালবেসে গাইতে না পারলেও শুনতে নিশ্চয়ই অসুবিধা নেই। মনের চাপ কমাতে সুরের একটা বিরাট ভূমিকা আছেÑ সে কথা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন পৃথিবীর প্রায় সব দেশের চিকিৎসক গবেষকরা। স্ট্রেস, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, হার্টেও অসুখের প্রবণতা কমাতে ইদানীং কিছু কিছু চিকিৎসক সেøাগান তুলেছেন-’ ‘ঝঃড়ঢ় উৎঁম, ঝঃধৎঃ সঁংরপ’ হ্যাঁ, গবেষণায় প্রমাণিত যে ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ রুখতে সর্বোপরি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঙ্গীতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

যত পারুন হাঁটুন : ফিনিস একটি গবেষণায় দেখা গেছে যেসব লোক বেশি ব্যায়াম করছেল- সপ্তাহে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বা দিনে ৩৫ মিনিট তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমেছে ৮০%, ওজন না কমানো সত্ত্বেও কেবল হেঁটে। ব্যায়াম কেন এত হিতকরী? কেন হাঁটা এত স্বাস্থ্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে ব্যায়াম করলে দেহকোষের ইনসুলিন রিসেপটারের সংখ্যা বাড়ে।

কফি পান ভাল : হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ গবেষণায় দেখা গেছে ৩-৪ কাপ কফি দিনে পান করলে কমে ২৯-৫৪% ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ।

মসলাযুক্ত খাবার খান : দারুচিনি, মেথি ও লবঙ্গ বেশ প্রভাব ফেলে রক্তের সুগারের উপর । জার্মান গবেষকরা দেখেছেন এক গ্রাম দারুচিনি পাউডারের একটি ক্যাপসুল খেলে রক্তের সুগার কমে ১০% । দারুচিনিতে এমন উপকরণ আছে যা ইনসুলিন রিসেপটারকে উদ্দীপ্ত করে এমন এনজাইমদের সক্রিয় করে। মিষ্টি এ মসলা রক্তের কোলেস্টেরল ও চর্বিও কমিয়ে থাকে।

শিথিল হোন প্রতিদিন : চাপগ্রস্ত হলে শরীর হয় সক্রিয়। শরীর হয় উত্তেজিত। হৃদস্পন্দন হয় দ্রুত। শ্বাস হয় দ্রুত। রক্তের সুগারও উঠে শীর্ষে। চাপগ্রস্ত হলে, শরীরে থাকে ’যুদ্ধ কর নয়ত পালাও’ এমন। সুখবর হলো, সামান্য শিথিলায়ন ব্যায়াম ও অন্যান্য স্ট্রেস মোকাবেলার কৌশল রক্ত সুগারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

রাতে যেন হয় সুনিদ্রা : ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুম রাতে ৬ ঘণ্টার কম হয় নিয়মিত এদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হয় দ্বিগুণ যারা ৮ ঘণ্টা ঘুমান তাদের তুলনায়। সুনিদ্রার জন্য বিকেল থেকে চা-কফি, চকলেট গ্রহণ করা উচিত নয়। অফিসে কাজ রেখে আসবেন, ঘরে কাজ নিয়ে আসবেন না। লেটনাইট টিভি দেখবেন না। মোবাইল অফ রেখে ঘুমাবেন।

সঙ্গীর সঙ্গে থাকুন, থাকুন বন্ধুবান্ধবসহ : নিঃসঙ্গ থাকেন সেসব মহিলা, এদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আড়াইগুণ বেশি পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকা মহিলাদের তুলনায়। গবেষকরা এমনই অভিমত প্রকাশ করেছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। তাই সৎসঙ্গে থাকুন সব সময়।

বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুস্থ জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সুস্থ জীবনযাপন মানে হচ্ছেÑ স্বাস্থ্যকর খ্যাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা বা ব্যয়াম এবং মন সুস্থ রাখা। মন সুস্থ রাখতে হলে মনের ওপর চাপ নেয়া যাবে না। শারীরিক এবং মানসিক চাপ উভয়ই স্বাস্থ্যের জন্য অপকারী। অধিকাংশ মানুষই মনে করেন যে চাকরি-বাকরি আর পরিবারের নানা চাপই হচ্ছে আসল মানসিক চাপ। এগুলো অবশ্যই স্ট্রেস বা চাপ। কিন্তু আসল চাপ হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, বায়ুদূষণ, আমরা যা খাই সেটা, টিভিসেট, কম্পিউটার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে যে বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ প্রবাহিত হয় সেসব; এছাড়াও আছে অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে ভাল কাজের জন্য উৎসাহ না পাওয়া। চাপ কমানোর জন্য যোগব্যায়াম, ধ্যান ও নিউরোবিক জিম করা উপকারী পদ্ধতি। আরও একটি দিন বেঁচে থাকার জন্য মনে মনে সকলকে ধন্যবাদ দেয়াও চাপ কমানোর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য হলিস্টিক পদ্ধতি এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। হলিস্টিক পদ্ধতি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিৎসার মূল চাবিকাঠি হলোÑ লাইফ স্টাইলে পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন, নিউরোবিক জিম ও আকুপ্রেশার। রোগীর বয়স এবং রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। পুষ্টিকর ও পরিমিত আহার তাকে ফিট রাখে। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত প্রায় এক দশক যাবত হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার হলিস্টিক চিকিৎসায় দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে হাজার হাজার ডায়াবেটিস ও করোনারী আর্টারি ব্লকেজ রোগীর জীবনে সুবাতাস বয়ে এনেছে। এর ফলে একদিকে যেমন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে আসছে। অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস রোগীদের জীবনে স্বস্তি নেমে এসেছে। বহু রোগী ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে এবং অনেকে ইনসুলিনকে বিদায় দিয়েও চমৎকার জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশের ডায়াবেটিস, করোনারী ব্লকেজ রোগীদের জন্য হলিস্টিক চিকিৎসা উপকারী বন্ধুর মতো কাজ করছে। আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন ও সুস্থ থাকুন

হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার

মোবাইল : ০১৭২১৮৬৮৬০৬