১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৪ নবেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস

  • ডাঃ শাহজাদা সেলিম

IDF-International Diabetics Federation-এর উদ্যোগে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ ডায়াবেটিস সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে এতে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ বাংলাদেশ ডায়াবেটিকস সমিতির প্রধান অংশীদার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) সহ মেডিক্যাল কলেজসমূহের এ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দিবসটি উদ্যাপন করে আসছে।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয়-‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ডায়াবেটিস’। এটি অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রতিপাদ্য বিষয়। কেননা ডায়াবেটিস বিপাক সংক্রান্ত রোগ (মেটাবলিক ডিজিস) রোগ হলেও এটি জীবনযাপনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত।

ডায়াবেটিস হবার জেনেটিক কারণ যেমন আছে তেমনি অনেকগুলো প্রবলভাবে সক্রিয় পরিবেশগত কারণও আছে। এমনকি এটিও প্রায় সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, যাদের পূর্বপুরুষদের ডায়াবেটিস ছিল না, তাদেরও অনেকে কমবেশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ জীবদ্দসার কোন এক সময়ে তারা ডায়াবেটিসের রোগী হিসেবে শনাক্ত হতে পারেন। এখানেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে ডায়াবেটিস হওয়ার নিবিড় সম্পর্কটা।

স্বাস্থ্যকর জীবন একটি সামগ্রিক দর্শন। কেননা প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন আলাদা রকম হয়। কিন্তু সকলকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। আমরা সংক্ষেপে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বলতে বুঝাচ্ছি-

১. উচ্চতা অনুসারে নিরাপদ দৈহিক ওজন অর্জন বজায়ে রাখা।

২. বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক প্রত্যাহিক শারীরিক শ্রম সম্পাদনা।

৩. ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য পরিহার করা।

৪. উপকারী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।

৫. সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা।

৬. চিনি ও লবণের আধিক্য বর্জন করা।

৭. ধূমপান ও তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন না করা।

৮. খাদ্য গ্রহণের সমতা স্থাপন।

এগুলো ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে। আবার যাদের ডায়াবেটিস হয়েছে তাদের ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণ করতে ও নিয়ন্ত্রণকে ধরে রাখতে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের বিকল্প নেই। ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর এবং এটি ‘ডায়েটিং’ নয় বরং পরিপূর্ণভাবে সুষম খাবার। যা ডায়াবেটিস রোগীর বয়স, কাজের ধরন, দৈহিক ওজন, ডায়াবেটিস জনিত জটিল রোগের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এবং তাদের তীব্রতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে ডাক্তার রোগীর জন্য ঠিক করে দেবেন।

যারা ডায়াবেটিসের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ভালভাবে বুঝতে পারে না, মেনে চলতে পারে না বা উদাসীন তাদের পক্ষে ডায়াবেটিস কন্ট্রোল করার সামর্থ্য অর্জন হবে না এবং দ্রুত ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় নিপতিত হতে থাকবেন। শুধু তা-ই নয় খাদ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে অনুসরণ না করার কারণে কারও কারও ডায়াবেটিস কন্ট্রোল না হওয়া অবস্থাতেই পুনঃপুনঃ হাইপোগ্লাইসোমিয়া হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে যা অতীশয় মারাত্মক।

২০১৩ সাল পর্যন্ত ওউঋ-এর হিসাবমতে পৃথিবীর ডায়াবেটিসের মহামারীতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট ৩৮২ মিলিয়ন। যা ২০৩৫ সালে ৫৯২ মিলিয়নে পৌঁছার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ৬.৪ মিলিয়ন ডায়াবেটিসের রোগী ছিল যা ২০৩৫ সালে ১৬ মিলিয়নে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখানে মোট রোগীর ৪৬ শতাংশ আবার অশনাক্তই রয়ে গেছে।

আবার ডায়াবেটিসে প্রাদুর্ভাব উন্নত দেশসমূহের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে বেশি। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহÑ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে সারা পৃথিবীর ডায়াবেটিস রোগীর বিরাট অংশের অবস্থান। কিন্তু পৃথিবীর দেশসমূহের মধ্যে তুকেলাউ, মাইক্রোনেশিয়া, মার্শাল আইল্যান, কিরিবাতিতে ভয়ঙ্কর হারে ডায়াবেটিসের রোগীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব (মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কুয়েত-কাতারের অবস্থান কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের ঝুঁকি বিশেষ মনযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। কারণ এ দেশগুলোতে দ্রুত টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার বয়স নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যা দেশগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো বটেই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাই এসব দেশের নেতাদের এখনই সামগ্রিক আয়োজন করে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

বাংলাদেশের করণীয় দিকসমূহ হচ্ছে-

১. স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিশেষ কারে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পদ্ধতিগুলো নিয়ে সহযবোধ্য আলোচনা করা উচিত।

২. রেডিও-টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস বিষয়ক আলোচনা হওয়া উচিত।

৩. বিষয়টিকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে না ভেবে সামগ্রিক জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে, সে অনুসারে অর্থ বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৪. সরকারী সকল হাসপাতালে বিশেষভাবে ডায়াবেটিস চিকিৎসাকে গুরুত্ব দিতে হবে। (বর্তমানে যা প্রায় অনুপস্থিত)

৫. ন্যূনতম পক্ষে ঢাকায় ডায়াবেটিস চিকিৎসার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকা জরুরী।

৬. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার পর্যাপ্ত আয়োজন থাকতে হবে।

৭. নগরায়ন ব্যবস্থাপনায় নগরবাসীদের হাঁটাহাঁটির পর্যাপ্ত স্থান, সুপরিসর ফুটপাথ ও সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

৮. সারাদেশের মানুষকেই সুস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণে অভ্যাস তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ থাকতে হবে।

এমবিবিএস, এমডি (এ্যান্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম), এমএসিই (ইউএসএ)

সহকারী অধ্যাপক

ফোন : ৮১২৪৯৯০, ৮১২৯৬৬৭