২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডুবছে আবাসন খাত ॥ মহাসঙ্কট- ১৩ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রীত

ডুবছে আবাসন খাত ॥ মহাসঙ্কট- ১৩ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রীত
  • প্রতিবন্ধক- ভূমির উচ্চ মূল্য, চড়া ব্যাংক সুদ, গ্যাস-বিদ্যুত সংযোগে বিড়ম্বনা, জমির রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আকাশচুম্বী ;###;ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতাই প্রধান সঙ্কট : রিহ্যাব;###;সিঙ্গেল ডিজিট ঋণ সুদে ঘুরে দাঁড়াবে এই খাত

রহিম শেখ ॥ সঙ্কটে ডুবতে বসছে আবাসন খাত। ভূমির উচ্চমূল্য, নির্মিত ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়া, ক্রেতাপর্যায়ে ঋণ সুবিধার অভাব, ব্যবসায়ীদের অপরিশোধিত ব্যাংক ঋণ, গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগের বিড়ম্বনাসহ নানা কারণে আশার আলো দেখতে পারছে না এক সময়ে অর্থনীতিতে আলো ছড়ানো এই আবাসন শিল্প। ফ্ল্যাট ও জমির রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও ভূমির মূল্য শতাংশের ওপর ছাড় দিয়েও ক্রেতার আগ্রহ বাড়াতে পারছে না কোম্পানিগুলো। সঙ্কট উত্তরণে সরকারকে বারবার বলার পরও ক্রেতাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ সরবরাহের কোন উদ্যোগ নেই। কিছু আবাসন কোম্পানির প্রতারণার কারণে ইমেজ সঙ্কটও পুনরুদ্ধার করতে পারছে না এই শিল্প। ফলে প্রতিনিয়তই কমছে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির হার। সব ধরনের কাজ শেষ হলেও প্রায় ১৩ হাজার ফ্ল্যাট এখনও অবিক্রীত। নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে আবাসনের সহযোগী বা লিঙ্কেজ ২০০টির অধিক শিল্পেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশী অনেকেই মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার করছেন। যাদের অধিকাংশই মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ছেন এই অর্থে।

জানা গেছে, জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান প্রায় ১৫ ভাগ। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এ খাতে নিয়োজিত রয়েছে। আবাসন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্প খাতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা। মূলত ২০০৯ সাল পর্যন্ত এ ব্যবসা ছিল রমরমা। আবাসন খাতকে ‘অনুৎপাদনশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করে ২০১০ সালের ২৬ এপ্রিল তহবিলটি বন্ধ করা হয়। ২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের সঙ্গে সঙ্গে বিধ্বস্ত হয় আবাসন খাতও। ওই বছরের ২১ জুলাই হঠাৎ করে আবাসন খাতে সব ধরনের নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালের ৮ মে পুনরায় এ খাতে গ্যাস সংযোগ চালুর নির্দেশনা জারি করে সরকার। প্রায় তিন বছর গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় আবাসন কোম্পানিগুলো ক্রেতার কাছে কোন ফ্ল্যাটই হন্তান্তর করতে পারেনি। ওই সময়ে ফ্ল্যাটের ক্রেতা কমে গিয়েছিল ৪২ শতাংশ। চলতি বছর ৯ এপ্রিল বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেন। এর আগে ২০১১ সালে ফ্ল্যাট ও জমি বিক্রির মন্দাভাবে রীতিমতো দুর্যোগ বয়ে যায়। এ দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকার ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। ২০১৩ সাল পুরোটাই গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মুখথুবড়ে পড়ে আবাসন খাত। এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রাণপণ চেষ্টার পর গত ১ বছরেও ঘুরে দাঁড়ায়নি আবাসন শিল্প। এ প্রসঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার ২০১৩-১৪ জাতীয় বাজেটে ২০ শতাংশ কর হ্রাস এবং ফ্ল্যাট ক্রয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালো টাকা) বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় আবাসন ব্যবসা কিছুটা চাঙ্গা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় তা হয়নি। এ প্রসঙ্গে সংগঠনের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন জনকণ্ঠকে বলেন, আবাসন খাতের অবস্থা ছয় মাস বা এক বছর আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। এ খাতের কোন উন্নতি হচ্ছে না। সঙ্কট উত্তরণে বারবার বলার পরও কোন উদ্যোগ নেই। ফলে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে আবাসন শিল্প।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সূত্র জানায়, বর্তমানে এ সংগঠনের সদস্য ১ হাজার ২০৩ জন। আর রিহ্যাবের সদস্য হননি এমন আবাসন ব্যবসায়ী আছেন হাজারেরও বেশি। সব মিলিয়ে দেশে আবাসন ব্যবসায়ী আছেন ২ হাজারেরও বেশি। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো গত ২০ বছরে এক লাখ ৬৪ হাজার ফ্ল্যাট হন্তান্তর করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর আগে ১০ হাজার ফ্ল্যাট এবং পাঁচ হাজার প্লট হস্তান্তর করত। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হন্তান্তর করেছে মাত্র ৯ হাজার ৭৭৯টি ফ্ল্যাট। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ১২ হাজার ১৮৫টি ফ্ল্যাট অবিক্রীত ছিল। এরপর চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের কারণে অবিক্রীত ফ্ল্যাটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজারে। সমস্যা সমাধানে সরকারের দিক থেকে নীতিগত সহায়তা জরুরী হলেও উল্টো ফ্ল্যাট নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ফি আট গুণ করা হয়েছে। প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি আগে ছিল ২৫০ টাকা, বর্তমানে তা দুই হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে একটি ফ্ল্যাট নিবন্ধন করতেই এলাকাভেদে তিন থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য নিজের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন আরও ফিকে হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে উৎসে আয়কর বৃদ্ধি করায় বর্তমানে নিবন্ধন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশ। অথচ ভারতে ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি মাত্র ৬ শতাংশ।

আবাসন ঘিরে কর্মসংস্থান ॥ সরকারের রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও আবাসন খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। এ খাত থেকে সরকার প্রতিবছর সরাসরি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। নির্মাণসামগ্রীর আমদানি কর থেকে আরও দেড় হাজার কোটি টাকা সরকারী কোষাগারে জমা হচ্ছে। সিমেন্ট ও রডশিল্প থেকে সরকারের রাজস্ব আয় এক হাজার কোটি টাকার বেশি। রিহ্যাবের হিসাব অনুযায়ী, আবাসন কোম্পানিগুলোতে ২০ হাজার নির্মাণকাজ ব্যবস্থাপক, ১০ হাজার ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, তিন হাজার স্নাতক প্রকৌশলী এবং প্রায় ৫০০ স্থপতি নিয়োজিত আছেন। এ খাতের ওপর নির্ভর করছে ছোট-বড় ২০০টির অধিক শিল্প খাত। এসব খাতে দুই হাজারেরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, স্টিল ও রি-রোলিং মিলস, ইট, বালু, রং, টাইলস ও সিরামিকের বিভিন্ন পণ্য, বিভিন্ন ধরনের পাইপ, ফিটিংস, কেবলস, কাচ ও কাচজাতীয় অন্যান্য পণ্য, পাথর ও পাথরজাত পণ্য, পেইন্ট, লোহাজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, আসবাবপত্র ও কাঠজাত বিভিন্ন পণ্য, প্লাইউড, বৈদ্যুতিক ফিটিংস ও অন্যান্য সামগ্রী, নির্মাণকাজের যন্ত্রপাতি, আঠাজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, স্টিলজাত পণ্য, এ্যালুমিনিয়াম পণ্য ইত্যাদি। এর মধ্যে অনেক শিল্পই আবাসন খাতের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। এর সঙ্গে নির্মাণশ্রমিক ও দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের গুরুত্বের দিকও অপরিসীম। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালে আবাসন খাতকে ঘিরে ২০ লাখের মতো কর্মসংস্থান ছিল। ২০১৪ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ লাখের মতো। ২০২০ সাল নাগাদ এ খাতে প্রায় ৪৫ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ভাল না যাওয়ায় এ খাতে উদ্যোগ গ্রহণের সংখ্যা কমছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।

কম দামেও ক্রেতা নেই ॥ দেশে ভোক্তা অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত কনজুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, ঢাকা নগরীর ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের ৬৫ শতাংশ বাড়িভাড়ায় ব্যয় করেন। বছর দশেক আগে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ থেকে ২০ ভাগের মধ্যে। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৪০-৪৫ ভাগে। জমির স্বল্পতা, আইনী জটিলতা, দুর্বল পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সর্বোপরি নীতিগত সমর্থনের অভাবে এখানে অপরিকল্পিত নগরায়নও বাড়ছে। সঙ্কুচিত হচ্ছে নগরবাসীর সুবিধা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শুমারি অনুযায়ী- মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি সঞ্চয় করেন। এমন আয়ের মানুষের জন্য আগামী পাঁচ বছরে রাজধানীতে এক লাখের বেশি ফ্ল্যাটের প্রয়োজন হবে। তবে গত পাঁচ বছরে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ অর্ধেকের মতো কমে গেছে বলে জানিয়েছেন আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রথমসারির আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যে জনবল অর্ধেকে কমিয়ে এনেছে। খরচ পোষাতে অতিরিক্ত সব খরচই কমিয়ে আনা হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের মতো চলতে থাকলে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ারও চিন্তা করছেন। ব্যাংকঋণ শোধ করতে কোনমতে খরচ উঠে এমন দামে এ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিচ্ছেন। কোন ক্রেতা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলে চেষ্টা করা হয় তাকে ধরে রাখতে। প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণ নিজেরাই ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে শেলটেক বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপক তৌফিক এম সেরাজ জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১০ সালকে বেঞ্চমার্ক করলে আমি মনে করি ঢাকা শহরে গড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দাম কমে গেছে ফ্ল্যাটের। তারপরও ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়ছে না। এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের সহ-সভাপতি মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান অবস্থায় আমরা অনেক কম দামে এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে দিচ্ছি টিকে থাকার স্বার্থে। এখন কিনলে ক্রেতা অনেক লাভবান হবেন। কারণ আমরা এ্যাফরডেবল প্রাইসে এ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিচ্ছি। কেউ এ্যাপার্টমেন্ট কিনতে এলেই বুঝতে পারবেন যে আগের চেয়ে এখন কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। তাতেও ক্রেতাদের সাড়া মিলছে না।

ব্যাংকঋণের সুদ চড়া ॥ আবাসন ঋণে ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদের হার ১২ থেকে সাড়ে ১৯ শতাংশ। কিন্তু বিভিন্ন চার্জ ও প্রসেসিং ফি মিলিয়ে এ হার বাস্তবে ১৬ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। এমন উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা। সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ না পাওয়ায় ক্রেতাদেরও আগ্রহ অনেক কম। অথচ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় গৃহঋণের সুদের হার গড়পড়তা ৬ শতাংশ। ওই দেশের বেসরকারী ব্যাংকগুলো ৪ দশমিক ৩৯ থেকে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ হার সুদে গ্রাহকদের গৃহঋণের অফার দিচ্ছে। জাপানে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে আবাসন ঋণ পাওয়া যায়। এমনকি প্রতিবেশী ভারতে ঋণের সুদ হার ১০ শতাংশ বা এর নিচে। বিশ্বে আবাসন খাতে সুদের হারের এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে উচ্চ সুদহার এবং প্রকাশ্য ও গোপন নানা চার্জ ও প্রসেসিং ফির কারণে আবাসন ঋণ মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য সহনীয় নয়। ঢাকার সেগুনবাগিচায় এক সরকারী কর্মকর্তা আমিন আল আসাদ জনকণ্ঠকে জানান, বাড়িওয়ালার নানা অনুশাসনের কারণে সবাই নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে চান। কিন্তু অনেকেরই তার সামর্থ্য নেই। তিনি বলেন, বিদেশে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে তা অনেক বেশি। ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। এতে তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আবাসন শিল্পের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতাই আবাসন খাতের প্রধান সঙ্কট। এ খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি না থাকলেও ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় না। দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের সিঙ্গেল ডিজিট হারে ঋণ দেয়া হলে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াবে। এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতাই আবাসন খাতের প্রধান সঙ্কট। এ খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি না থাকলেও ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় না। দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের সিঙ্গেল ডিজিট হারে ঋণ দেয়া হলে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াবে।

পুনর্অর্থায়ন তহবিল চালুর দাবি ॥ দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের আবাসন চাহিদা মেটাতে স্বল্প সুদে ঋণের যোগান দিতে বছর সাতেক আগে একটি পুনর্অর্থায়ন তহবিল চালু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘূর্ণায়মান এ তহবিলটি ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০১০ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এ তহবিল থেকে ৬১০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। ১৪টি ব্যাংক ও ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ পুনর্অর্থায়ন তহবিল থেকে যাদের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার কম, তাদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হতো। ওই বছরের এপ্রিলে আবাসনকে ‘অনুৎপাদনশীল খাত’ উল্লেখ করে এ তহবিল থেকে পুনর্অর্থায়ন করা বন্ধ করে দেয় তারা। দুই বছর ধরে মন্দায় আক্রান্ত আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা এ স্কিমটি চালুর দাবি জানিয়ে এলেও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সরকারী প্রতিষ্ঠান হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন বাড়ি নির্মাণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২ শতাংশ এবং এর বাইরে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে সংস্থাটি এখন খুব বেশি ঋণ দিতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটি গত বছর সরকারের কাছে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল চাইলেও সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে এ তহবিলটি চালু করা হয়েছিল। কেননা তাদের পক্ষে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন। তহবিলটি আবারও চালু করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারী প্রতিষ্ঠান হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন থেকে ১০-১২ শতাংশ হার সুদে ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে পারতেন বাড়ি নির্মাতারা। তহবিল সঙ্কটে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এখন ঋণ দিচ্ছে খুব সামান্য পরিমাণে। রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন জনকণ্ঠকে জানান, আবাসন খাতের সমস্যা সমাধানে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে একটি বড় ‘রিভলভিং লোন ফান্ড’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরী। কেবল ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ঋণ প্রদান তা পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্যকে আলাদা করে দেখলে দেখা যাবে তারা ৯৯ শতাংশ ঋণ সময়মতো পরিশোধ করে বলে এ খাতে ঋণ দেয়ায় কোন ঝুঁকি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তহবিল চালুর দাবি জানান সংগঠনের সভাপতি। একই সঙ্গে এ খাতের সঙ্কট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও বিশেষ নির্দেশনা কামনা করেন আবাসন খাতের এ উদ্যোক্তা।

প্রতারণায় ইমেজ সঙ্কটে আবাসন খাত ॥ এমনিতেই নানা সঙ্কটে ধুঁকছে আবাসন খাত। চোখ ধাঁধানো সাইন বোর্ডের ফাঁদে আটকে প্লট ও ফ্ল্যাটের ব্যবসা করছে কিছু আবাসন কোম্পানি। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব জানিয়েছে, যেসব কোম্পানি প্রতারণা করছে সেগুলো তাদের সদস্যভুক্ত নয়। জানা গেছে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ঢাকা থেকে সাভার যাওয়ার পথে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চোখে পড়বে আবাসন ব্যবসায়ীদের আকর্ষণীয় দামে প্লট বিক্রির চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন। এগুলো যেন একেকটি প্রতারণার ফাঁদ। বেসরকারী আবাসন কোম্পানির বেশিরভাগ প্লট বিক্রি বা বুকিং হয় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই। সড়কের দু’পাশের বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির প্রতারণা ফাঁদের এমন তথ্যই পাওয়া গেছে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। ধলেশ্বরী সেতু থেকে মাওয়া পর্যন্ত চোখে পড়বে প্রতারণার এ রকম ফাঁদ। সেখানে রয়েছে নামসর্বস¦ অনেক আবাসন কোম্পানির প্রকল্প। সরেজমিন দেখা যায়, মহাসড়কের দু’পাশে বিল, নিচু জমি, জলাশয় ও ফসলের মাঠে বিলবোর্ড। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্বপ্নধারা, পদ্মা ফিউচার পার্ক, বিডি প্রোপার্টিজ, ডিভাইস সাউথ সিটি, আশালয়, চিয়ারফুল গ্রীন সিটি, দিশারী গ্রুপ, সিলভার গ্রীন সিটি, এশিয়ান টাউন শান্তি নিবাস। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ভুয়া হাউজিং কোম্পানির সাইনবোর্ড। অন্যদিকে, রূপগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজ পার হলেই যেন পশ্চিমা দুনিয়ার শুরু। সেখানে রয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের বড় বড় দেশের নামে সাইনবোর্ড। পূর্বাচলের পরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চোখে পড়বে আমেরিকান সিটি, এ্যারাবিয়ান সিটি, কানাডা সিটি, ফ্লোরিডা সিটি, সিডনি সিটি, প্রবাসী পল্লী, স্যাটেলাইট টাউন, ইতালিয়ান সিটি ইত্যাদি নামের সাইনবোর্ড। এসব সাইনবোর্ডে বিজ্ঞাপন অনুযায়ী যে কারও মনে হতে পারে সেখানে বিশ্বের সমৃদ্ধ সিটির নামে গড়ে উঠছে সব প্রকল্প, যা গ্রাহকদের চোখে পড়ার মতো।

মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ॥ দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশী অনেকেই মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার করছেন। পাচারকৃত অর্থ এ দেশে বিনিয়োগ করলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হতো। দেশের নানা শ্রেণীর মানুষ কাজের সুযোগ পেত। দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে যারা বিদেশে অর্থ পাচার করছেন তাদের তালিকায় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন আছেন। তবে বেশি অর্থ পাচার করা হচ্ছে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে। পাচারকৃতদের তালিকায় কালো টাকার মালিকও আছেন। মালয়েশিয়া সরকারের দেয়া তথ্যানুসারে গত এক যুগে সেখানে সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন ৩ হাজার ৫ জন বাংলাদেশী। তাদের প্রত্যেককে মালয়েশিয়ায় ১০ বছরের জন্য নন-মালয়েশিয়ান হিসেবে ভিসা নিতে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা করে মালয়েশিয়ার ব্যাংকে জমা রাখা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় করতে হয়েছে। সে হিসেবে শুধু মালয়েশিয়ায় পাচার হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় কোন দেশে বিনিয়োগ বা অন্য কোন কারণে এত টাকা নিয়ে যাওয়ার কোন আইনী সুযোগই নেই। তাই পুরোটাই গিয়েছে হুন্ডি বা অন্য কোন অবৈধ উপায়ে। সেকেন্ড হোম গড়তে আগ্রহীদের কাছে মালয়েশিয়া ছাড়া আরেকটি জনপ্রিয় গন্তব্য কানাডা। সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রও আছে তালিকায়। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়ামে অনেক রাজনীতিকের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। কেউ কেউ সেসব দেশের নাগরিক। রয়েছে অল্টারনেটিভ পাসপোর্ট। এভাবে বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছেন অনেকেই।