১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হত্যার হুমকিদাতা শনাক্ত ॥ আইজি

  • বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিম ক্লোন করলেও ধরা পড়েছে প্রকৃত হুমকিদাতা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকিদাতা শনাক্ত হয়েছে। যে মোবাইল নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে, সেটির মালিক একজন নিরীহ ব্যক্তি। তার মোবাইল নম্বরটি ক্লোন করে (হুবহু নকল বানিয়ে) হত্যার হুমকি দেয়া হয়। শুধু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নয়, এখন পর্যন্ত হুমকি পাওয়া সবাইকে একটি বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী একটি গোষ্ঠী পুলিশের মনোবল ভেঙ্গে দিতে এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে গুপ্তহত্যা থেকে শুরু করে হুমকিসহ নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। হুমকিদাতাসহ সব ধরনের অপরাধী গ্রেফতারে ধারাবাহিক অভিযান চলছে।

সোমবার দুপুরে পুলিশ সদর দফতরে গত ৩ মাসে দুর্ঘটনা ও দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত ১৪ পুলিশ সদস্যের পরিবারকে ৬১ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক এ কথা বলেন। তিনি জানিয়েছেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে যে নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়েছিল, সেই মোবাইল ফোন নম্বরের মালিককে আটক করা হয়েছিল। তিনি একজন নিরীহ লোক। তদন্তে ওই ব্যক্তি নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ওই নির্দোষ ব্যক্তির মোবাইল নম্বরটি ক্লোন করা (হুবহু নকল করা)। ক্লোন করে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। তবে ক্লোনকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত হুমকি পাওয়া ব্যক্তিদের ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। হুমকিদাতাসহ সব ধরনের অপরাধী গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ প্রধান বলেন, সারাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব নাশকতা চালাচ্ছে। তারা নাশকতা চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। চলমান ধারাবাহিক অভিযানে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। তবে এমন গ্রেফতার গণহারে গ্রেফতার নয়, বলে তিনি দাবি করেন।

প্রসঙ্গত, বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে কোন নির্দিষ্ট মোবাইল সিমের নম্বর অনুযায়ী আরেকটি সিম তৈরি করা। ক্লোন করা সিম দিয়ে কাউকে হুমকি দেয়ার পর সিমটি বন্ধ করে দেয় হুমকিদাতারা। কোন সিম ক্লোন করলে, সিমের আসল মালিক সেটি স্বাভাবিক কারণেই জানতে পারেন না। তিনি যথারীতি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেই কেবল বিষয়টি প্রকাশ পায়। ইতোপূর্বে অনেক নামীদামী ব্যক্তির সিম ক্লোন করে হুমকি, চাঁদা দাবিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালানোর চেষ্টা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১০ নবেম্বর মোবাইল এসএমএসে হত্যার হুমকি পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। হুমকি বার্তায় বলা হয়, ব্লগারদের পক্ষে দাঁড়ালে তাকে চাপাতির আঘাতে মরতে হবে। বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লেখালেখিতে সব সময় সক্রিয়। হুমকি পাওয়ার পর তিনি গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। হুমকিদাতা উগ্র মৌলবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে হুমকিদাতার বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে কোন তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও তদন্ত কর্মকর্তারা।

প্রসঙ্গত, চলতি বছর ঢাকায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা লেখক প্রকৌশলী ড. অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নিলয়, জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন, সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশকে, ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য মুকুল হোসেন ও গাবতলীতে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। প্রতিটি হত্যাকা-ের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গী সংশ্লিষ্টতা তথ্য বেরিয়ে এসেছে তদন্তে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেছেন, হোসেনী দালানে বোমা হামলা, দুই বিদেশী নাগরিক, ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যা এবং হত্যাচেষ্টা থেকে শুরু করে হুমকি ধমকির সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গী গোষ্ঠী জড়িত। পুলিশের মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এসব অপরাধমূলক কর্মকা- চালানো হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। মাঠ পর্যায়ে নিরাপত্তা জোরদারসহ প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে। অনেক ঘটনার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অধিকাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা প্রায় শনাক্ত হয়েছে। গ্রেফতারও হয়েছে কিছু কিছু আসামি। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

এর আগে পুলিশ প্রধান নিহত পুলিশ সদস্যের পরিবারের হাতে টাকা তুলে দেন। পুলিশ প্রধান বলেন, এই অনুদান আইজির বিশেষ তহবিল থেকে দেয়া। নিহতদের পরিবার নিয়মানুযায়ী অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাবে। এছাড়া নিহতদের পরিবারের সদস্যদের পুলিশে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোন প্রকার অসুবিধা অনুভব করলে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। পুলিশ সুপার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন। পুলিশ সুপারদের এ সংক্রান্ত আগাম নির্দেশ দেয়া আছে।

দায়িত্বরত অবস্থায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ঢাকায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী পুলিশ সুপার নাফিজ ইমতিয়াজ (৩০), ঢাকায় এসআই আব্দুল মালেক (৩৯), কনস্টেবল আব্দুল আজিজ (৩৫), লক্ষ্মীপুরে কনস্টেবল সফিকুল ইসলাম (৩০), নীলফামারিতে কনস্টেবল শামসুল আলম (৪৬), মাইদুল ইসলাম (২৯), শরিফুল ইসলাম (৩৫) ও ফারুক হোসেন (৫০), ফরিদপুরে হাইওয়ে পুলিশের কনস্টেবল চালক জাহিদুল ইসলাম (২৮), খাগড়াছড়িতে কনস্টেবল মীর আহম্মদ শরীফ (২৫), নরসিংদীতে কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার (৫০) ও পাবনায় এটি এসআই সুজাউল ইসলাম (৩৩)। এছাড়া দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাতে গাবতলীতে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা ও আশুলিয়া চেকপোস্টে কনস্টেবল মুকুলকে হত্যা করে।