২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শাহজালালসহ সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বৃদ্ধির তাগিদ ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের

শাহজালালসহ সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বৃদ্ধির তাগিদ ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের

আজাদ সুলায়মান ॥ হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরসহ দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সফররত ব্রিটিশ এভিয়েশন গোয়েন্দা দল। তারা বলেছেন, গত ১১ নবেম্বর সরেজমিন শাহজালাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করে তারা সেখানে বেশকিছু নিরাপত্তা ঘাটতি দেখেছেন। বিশেষ করে বিমানবন্দরের বহির্গমন হলের স্ক্যানিং ব্যবস্থার দুর্বলতা ছিল উদ্বেগজনক। এছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সে বিমানের নিজস্ব জনবল না থাকা, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) মানদ- অনুযায়ী সিভিল এভিয়েশনের মনোনীত জনবল নিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা না করা, সশস্ত্র আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্যদের দিয়ে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা, শাহজালালের চারদিকে নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে সিভিল এভিয়েশনের সিকিউরিটি গার্ড না থাকা, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার হ্যাংগার, দোকানপাট স্থাপনের অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি তাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।

সোমবার দুপুরে ব্রিটিশ এভিয়েশন গোয়েন্দা দলের দুই সদস্য বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে দেখা করে তাদের এই উদ্বেগের কথা বলেন। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার স্বার্থে উল্লিখিত ব্যবস্থাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান দুই ব্রিটিশ গোয়েন্দা। মন্ত্রী ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। পাশাপাশি দ্রততম সময়ের মধ্যে যেসব জায়গায় নিরাপত্তা ঘাটতি আছে তা পূরণেরও আশ্বাস দেন। প্রতিনিধি দলের দুই সদস্য হলেন যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্ট বিভাগের রিজওনাল এভিয়েশন সেক্রোটারি ও লিয়াজোঁ অফিসার এশিয়া এ্যান্ড প্যাসিফিক জন লোভেসি, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের ডেপুটি হাইকমিশনার মার্ক ক্লেটনের, সেকেন্ড সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) স্টেভেন ডটস।

গোয়েন্দা দল বলেছে, তারা শুধু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই নয়, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের যেসব বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল করে সব বিমানবন্দরকে এই তালিকায় নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করছে। রাশেদ খান মেনন ব্রিটিশ গোয়েন্দা দলকে বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য অনেক কিমানবন্দরের তুলনায় শাহজালালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভাল। তারপরও তাদের সুপারিশ অনুযায়ী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হবে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জনকণ্ঠকে বলেন, বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখার জন্যই দলটি ঢাকায় এসেছিল। সেটা তারা দেখেছেও। এর সঙ্গে তাদের দেশের নিরাপত্তাও জড়িত। ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানে চারটি ফ্লাইট সরাসরি লন্ডন যায়। এছাড়াও কিছু এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটও ঢাকা হয়ে যাতায়াত করে। এসবের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জড়িত।

বিমান মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দল মন্ত্রীকে জানিয়েছে, ওই দিন তারা বিমানবন্দরের ১ নম্বর টার্মিনালের বহির্গমন লাউঞ্জে আসে। সেখানে লাগেজ স্ক্যানিং মেশিন, যাত্রীদের তল্লাশির ব্যবস্থা, ইমিগ্রেশন পদ্ধতি ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘুরে ঘুরে দেখেন। কর্তব্যরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন সদস্য, পুলিশ, আনসার, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা গার্ড ও এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। ডিউটি ফ্রি শপসহ বেসরকারী সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঘুরে দেখেন। বিমানবন্দরে কর্মরত সদস্যদের নিরাপত্তা পাসও খতিয়ে দেখেন। একটি লাগেজ তিনভাবে স্ক্যানিং মেশিনে দিয়ে এর ফল জানতে চান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীদের কাছে। যথাযথ উত্তর না পেয়ে তাদের হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। এরপর তারা বিমানবন্দরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা ৮ নম্বর গেটে যান। দীর্ঘ সময় ওই গেটে অবস্থান করেন। কীভাবে মানুষজন ও যানবাহন বিমানবন্দরে প্রবেশ করছে ও বের হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করেন। ওই গেটের স্ক্যানিং মেশিনটিও নানাভাবে পরীক্ষা করেন এবং সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তারা যান বিমানের কার্গো ভিলেজে। সেখানে তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে বিদেশে কার্গো পাঠানোর বিষয় খতিয়ে দেখেন। ব্রিটিশ দল কার্গো পণ্য স্ক্যানিং পদ্ধতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তর্জাতিকমানের আরও ট্রেনিং দেয়ার জন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেন। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে ডগ স্কোয়াডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা মজবুত, তা পরখ করে দেখেন।

পরিদর্শন শেষে দলটি সিভিল এভিয়েশন সদর দফতরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন দেখেছেন সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে সম্মত হননি দলটির সদস্যরা। সরেজমিন পরিদর্শনের সামগ্রিক বিষয় পরবর্তী সময়ে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলেও নিশ্চিত করে গেছেন। সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় হেলিকপ্টারের সিমিউলেটর ট্রেনিং করা হবে। সে কারণে প্রতিনিধি দলটি শাহজালালের চারপাশের অবস্থা দেখতে এসেছে। এর সঙ্গে অন্য কোন কিছুর সম্পর্ক নেই। খবর পেয়ে শাহজালালে পৌঁছেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরীসহ সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারাও বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।

জানা গেছে, কিছুদিন ধরে নাশকতার আশঙ্কায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সবক’টি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে র‌্যাব ও বিজিবির ডগ স্কোয়াড। বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এছাড়া যাত্রীদের তল্লাশির ক্ষেত্রেও আরও বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পুলিশ বলছে নাশকতার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই কড়াকড়ি অবস্থা চলছে। বিমানবন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক হত্যা এবং আশুরা সমাবেশে হামলার প্রেক্ষাপটে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

এ সম্পর্কে এপিবিএন এএসপি আলমগীর হোসাইন শিমুল বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। এপিবিএন থেকে বাছাই করা চৌকস সদস্যদের নিয়ে গড়ে তোলা ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) সার্বক্ষণিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নজরদারি করছে। ইচ্ছে করলেই যে কেউ কোন অপরাধ বা নাশকতা করার সুযোগ পাবে না।