২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক টুকরো কাগজ মুহূর্তে হয়ে ওঠে প্রজাপতি হাতি ঘোড়া পঙ্খিরাজ...

এক টুকরো কাগজ মুহূর্তে হয়ে ওঠে প্রজাপতি হাতি ঘোড়া পঙ্খিরাজ...
  • ‘অরিগামি’ শিল্প রপ্ত করেছে প্রমা

মামুন-অর-রশিদ ॥ রঙিন কিংবা সাদা কাগজের ভাঁজে ভাঁজে যে শিল্প গড়ে উঠতে পারে তা অনেকের ধারণা না থাকলেও সেই কাগজের ভাঁজে শিল্প গড়ে তোলার কৌশল রপ্ত করেছে রাজশাহীর মেয়ে ফারিহা নওশিন আক্তার প্রমা। কাগজে হাত ছুঁলেই যেন হয়ে উঠে একেকটি শিল্পকর্ম। যেন হাতের জাদু। শুধু জানা দরকার ভাঁজ দেয়ার কৌশল। আর এ কৌশলই রপ্ত করেছে রাজশাহী নগরীর তালাইমারী এলাকার মেয়ে প্রমা।

তার কুশলী ভাঁজের কারুকাজে এক টুকরা কাগজ মুহূর্তে হয়ে উঠছে প্রজাপতি, হাতি, ঘোড়া আরও কত কি। অথচ কোন কাটাকুটি নেই। নেই আঠার কারবার। শুধু এক টুকরো কাগজ আঙুলের জাদুতে হয়ে উঠছে দিব্যি হাতি, ঘোড়া, পঙ্খিরাজ, মুখোশ, ড্রাগন, ফুল, ফল, পুতুল, ফিনিক্স ইত্যাদি। কারও হাতে এমন কাগজের উপহার তুলে দিলে তিনি আকাশ থেকে পড়েন। শুধুই কাগজের জাদুকরি ভাঁজ। আর কিছুই নেই! প্রমার হাতে করা শৈল্পিক এই কাজের নাম অরিগ্যামি। এরই মধ্যে প্রমা অন্তত দেড় শতাধিক ‘অরিগ্যামি’ তৈরি করেছে।

আমাদের দেশে অনেকদিন আগে থেকে কাগজের নৌকা ও উড়োজাহাজ বানিয়ে আসছে শিশুরা। তবে এর নাম যে অরিগামি তা হয়তো জানত না। অথচ এই কাগজের ভাঁজ রপ্ত করে প্রমা এখন হয়ে উঠেছে দেশের একজন অরিগামি শিল্পী। তবে বাণিজ্যিকভাবে এখনও সে এগুলো করছে না। পড়াশোনার মাঝে অবসর পেলেই কাগজের ভাঁজে সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠে প্রমা।

প্রমা রাজশাহী নগরীর অগ্রণী বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে। বাবা এএনএম ফরিদ আক্তার, মা নাসরিন আক্তার ও ছোট ভাই ফাহিম নাকিব। প্রমাদের বাসায় গিয়ে কথা হয় তার অরিগামি-চর্চা নিয়ে। তার বসার ঘরের টেবিলজুড়ে সাজিয়ে রাখা কাগজের হাতি, ঘোড়া, প্রজাপতি, ফুল ও পাখিতে ভরা। সবই কাগজ ভাঁজ করে তৈরি।

প্রমা জানায়, তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবার হাত ধরে তার অরিগামি-চর্চা শুরু। অরিগামি করার জন্য কাগজের ভাঁজগুলো বাবা তাকে শিখিয়েছেন। প্রমা বলে, বাবা তখন তৈরি করে দিতেন কাগজের পাখি, নৌকা ইত্যাদি। তখন ভাল লাগত! বাবার সংগ্রহে থাকা বেশ কিছু অরিগামির বই দেখে দেখে মডেলগুলো নিজেই তৈরি করা শুরু করে প্রমা। পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেটে বিভিন্ন দেশের অরিগামি-শিল্পীদের কাজের ভিডিও দেখে ধাপে ধাপে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কৌশল রপ্ত করে ফেলে প্রমা। এখন তার তৈরি করা দেড় শতাধিক অরিগামি মডেল রয়েছে। প্রমা জানায়, তার সবচেয়ে পছন্দের মডেলগুলো হলো অরিগামি ঘোড়া, পঙ্খিরাজ ঘোড়া, জাহাজ, পরী, ইত্যাদি। এছাড়া প্রমা বিভিন্ন রকমের পশু-পাখি, প্রজাপতি, বাক্স, বল, নৌকা, ফুল, ব্যাঙ, মাছ, গয়না এবং পৌরাণিক জীব তৈরি করতে পারে এক নিমেষেই কাগজে ভাঁজ দিয়ে। আরও চর্চা করে ভবিষ্যতে একটি প্রদর্শনী করারও ইচ্ছে রয়েছে তার।

অরিগামি ছাড়াও ২০০৮ সাল থেকে সে কাগজশিল্পের অন্যান্য শাখা নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রমা বলে, অরিগামি শিল্পের প্রধান উপকরণ হচ্ছে কাগজ। আমাদের দেশের সহজলভ্য কাগজগুলোর মধ্যে রয়েছে পোস্টার পেপার, ডিমাই পেপার, অফসেট পেপার, মডেল পেপার এবং পুরনো খবরের কাগজ ও টিস্যু পেপার। অরিগামির জন্য সাধারণত বিভিন্ন রঙের পোস্টার কাগজ, রঙিন ডিমাই কাগজ, কুইলিংয়ের জন্য কালার অফসেট কাগজ এবং কিরিগামি, মিক্সড মিডিয়া ও পেপার ম্যাশের জন্য যেকোন কাগজ ব্যবহার করা যায়।

প্রমা জানায়, তার কাগজশিল্প পছন্দের কারণ হচ্ছে, অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের তুলনায় কাগজ তুলনামূলক সহজলভ্য। শুধু পদ্ধতি জানা থাকলে কল্পনা করে কাগজ ভাঁজ দিয়েই মনের মতো করে কোন না কোন শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারে। এটি যতটা সহজ, ততটাই সুন্দর।

প্রমা জানায়, ‘বিদেশে এই শিল্পে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ পাওয়া যায়। আবার তৈরি করার পরে একধরনের তরল পদার্থ দিয়ে স্প্রে করলে অবিকল থেকে যায়। ভাঁজ ভেঙে যায় না। আমাদের এত সুযোগ নেই।

মূলত : অরিগামি কাগজ দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরির একটি কৌশল। এই কৌশলে ফুল-পাখি-লতা-পাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ এবং প্রাণীর অবয়ব তৈরি করা যায়। ছোটবেলায় তৈরি করা সবারই খুব পরিচিত কাগজের উড়োজাহাজ, কাগজের নৌকা, মাথার টুপি, টিয়া পাখির ঠোঁট, শাপলা ইত্যাদি সবই অরিগামির অংশ। শৈশবের অনুসঙ্গ হলেও অরিগামি যে শুধু শিশুদের বিষয় তা নয়। যদি শিল্প ভালবাসেন, সৃজনশীলতাকে ভালবাসেন তাহলে যে কোন বয়সেই এটি আপনাকে কাছে টানবে। অরিগামি আজ পৌঁছে গেছে শিল্পের পর্যায়ে। এটি হতে পারে আমাদের দেশের এটি একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত।

অরিগামির ইতিহাস ॥ ইন্টারনেট ঘেটে জানা যায়, অরিগামি এক প্রাচীন অবসর যাপনের মাধ্যম। কাগজ আর নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় বের হয়ে আসে সব বাস্তব জিনিসের কাগজি রূপ। অরিগামি শব্দটি দুটো জাপানী শব্দ ‘ওরি’ (ঙৎর) এবং ‘কামি’ (কধসর) থেকে উদ্ভূত। ‘ওরি’ অর্থ ভাঁজ করা এবং ‘কামি’ অর্থ কাগজ। পরবর্তীতে শব্দ দুটি একত্রে অরিগামি শব্দে রূপ নেয়। ওরিগামি শব্দটি জাপানীদের কাছ থেকে এলেও এই শিল্পটির সূচনা ঘটে চীনে দ্বিতীয় শতাব্দীতে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাত ঘুরে জাপানে চলে আসে অরিগামি। প্রতিবছর ১১ নবেম্বর জাপানে দিবসটি অরিগামি দিবস হিসেবে পালিত হলেও এখনও বাংলাদেশে এ দিবসের প্রচলন নেই বললেই চলে। ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকায় দিবসটি পালন হয়। তবে এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় প্রতিবছর ২৪ অক্টোবর থেকে যা চলে ১১ নবেম্বর পর্যন্ত।

জাপান ছাড়াও চীন, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনেও এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। অরিগামি হচ্ছে কাগজ না কেটে শুধু ভাঁজ করার মাধ্যমে কিছু তৈরি করা। কাগজ কেটে এবং আঠা ব্যবহার করে যা করা হয় তা হলো কিরিগামি। জাপানের আকিরা ইয়োশিজাওয়াকে আধুনিক অরিগামির জনক বলা হয়।

অরিগামির উপকরণ ॥ অরিগামি শিখতে গেলে কাগজ ছাড়া আর কিছুরই দরকার নেই। তবে একদম নিখুঁতভাবে বানাতে চাইলে একটা স্কেল আর কাঁচি বা ছুরির দরকার পড়তে পারে। কাগজ কি রকমের নিবেন সেটা নির্ভর করবে আপনি কি বানাতে যাচ্ছেন তার ওপর। কাগজের পুরুত্ব আর রং এই দুটাই মূলত দেখার বিষয়।