২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লন্ডনে বেগম জিয়ার ‘মিশন ইমপসিবল’

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

লন্ডনের একটি বাংলা কাগজে খবর বেরিয়েছিল, বেগম খালেদা জিয়া ১৬ নবেম্বর সোমবার দেশে ফিরে যাচ্ছেন। পরের দিন ১৭ নবেম্বর মঙ্গলবার লন্ডন বিএনপি’র এক হাফ নেতাকে বেগম জিয়া দেশে ফিরে গেলেন কিনা জিজ্ঞাসা করতেই হেসে বললেন, ম্যাডাম এখনই কি করে দেশে ফিরবেন? নরেন্দ্র মোদি লন্ডনে আছেন না? তার জবাব শুনে একটু অপ্রস্তুত হলাম। কথাটা মনে ছিল না যে, ইতোপূর্বেই খবর রটেছিল, বেগম জিয়া লন্ডনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা সাক্ষাতকারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

খবরটা প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারণ, বাংলাদেশের একটি প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী কেন বিদেশে চিকিৎসার জন্য এসে একজন বিদেশী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের গোপন চেষ্টা চালাবেন? তাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কি রাজি হবেন? আর রাজি না হলে বিএনপি নেত্রীর মর্যাদা কি রক্ষা পাবে? অবশ্য অতীতের রেকর্ড বলে স্বার্থ ও ক্ষমতার জন্য বিএনপি’র নেতানেত্রীরা নিজেদের ব্যক্তিগত ও দলীয় মানমর্যাদাকে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না।

বেগম জিয়ার প্রয়াত স্বামী জেনারেল জিয়াউর রহমানও এই নজিরটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। জেনারেল জিয়া তখন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জনতা পার্টি সরকারের মোরারজী দেশাই। সম্ভবত: কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে দু’জনেই লন্ডনে এসেছিলেন। ভারতের বিরুদ্ধে তখন বাংলাদেশে চালানো হচ্ছে ঢালাও প্রচারণা। কিন্তু তলে তলে জিয়াউর রহমান ভারত সরকারের অনুকম্পা লাভের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কমনওয়েলথ বৈঠকের বাইরে মোরারজী দেশাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটু ব্যক্তিগত সাক্ষাতের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু মোরারজী দেশাই সময় দিতে পারছিলেন না।

এ সময় এক সকালে দেখা গেল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেই হোটেলে মোরারজী দেশাইয়ের রুমের বাইরে বারান্দায় বসে আছেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিনি নাছোড়বান্দা হয়ে প্রোটকল ভেঙে তার হোটেলে ছুটে গিয়ে তার রুমের সামনে অন্য দর্শনপ্রার্থীদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন।

‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার রিপোর্টারের চোখে ব্যাপারটি ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওই বারান্দায় অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বসা জিয়াউর রহমানের একটি ছবি তিনি তুলে নেন। পরদিন ‘গার্ডিয়ানে’ এই মর্মে খবর বের হয় যে, ‘প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের ফৌজি প্রেসিডেন্টের ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা।’ খবরে বলা হয়, কোন দেশের রাষ্ট্রপতি অপর দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যান না। প্রটোকল হলো, প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রপতির কাছে আসবেন। এই প্রটোকল অনুযায়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রীরই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তার কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করেছেন তার উল্টোটা। গরজ বড় বালাই। নিজের সম্মান, রাষ্ট্রের মর্যাদা, প্রটোকল ইত্যাদি কোন কিছুই জিয়াউর রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হোটেলে অনাহুতভাবে ছুটে যেতে বাধা দিতে পারেনি। কারণ, তার ক্ষমতা দখল করাটা ছিল অবৈধ। এই অবৈধ কাজটা ভারত যাতে বৈধতা দেয়, তা পাওয়ার জন্য জিয়াউর রহমানের দিগম্বর হয়ে নাচতেও আপত্তি ছিল না।

ভারত-বিরোধিতা, ভারত-বিদ্বেষ প্রচার জন্মাবধি বিএনপির রাজনৈতিক ইমানের (চড়ষরঃরপধষ ভধরঃয) অঙ্গ। কিন্তু ক্ষমতার জন্য এই ইমান বিসর্জন দিয়ে বিএনপি যে তলে তলে দিল্লীর সেবাদাসত্ব বরণে রাজি, তার প্রমাণ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা জিয়াউর রহমানই দিয়ে গেছেন। এখন সেই প্রমাণ তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও দেখাচ্ছেন। দিল্লীতে এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই ঢাকায় বিএনপি শিবিরে আনন্দে নর্তন-কুর্দন শুরু হয়ে যায় এবং তারা মিষ্টি বিতরণও করে। শুরু হয় নির্লজ্জ মোদি-ভজনা। কখনও তারেক রহমান লন্ডনে বসে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কাকাবাবু (টহপষব) ডেকে চিঠি লেখেন। কখনও ঢাকায় মিথ্যা খবর প্রচার করা হয় যে, নরেন্দ্র মোদি বেগম জিয়াকে চিঠি লিখেছেন। মোদির ঢাকা সফরের সময় বেগম খালেদা জিয়া রীতিমতো দেনদরবার করে তার সঙ্গে একটু সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।

কিন্তু ভবী তাতে ভোলেনি। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদি যতই বিতর্কিত হয়ে থাকুন, দিল্লীতে ক্ষমতায় বসে তিনি কিছুটা প্রাগমেটিজমের পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্কের গুরুত্ব তিনি বুঝেছেন এবং ভারতের নিরাপত্তার জন্যই বাংলাদেশে যে হাসিনা সরকারের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক ও ভারতের প্রতি মিত্র মনোভাবাপন্ন সরকারের ক্ষমতায় থাকা উচিত এই সত্যটাও উপলব্ধি করেছেন। তাই বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর দিকে তিনি মৈত্রীর হাত বাড়াননি। বাড়িয়েছেন হাসিনা সরকারের দিকে। বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা দুই দেশের কিছু জটিল সমস্যাও দ্রুততার সঙ্গে তিনি দূর করার লক্ষ্যে একাধিক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেছেন।

কথায় বলে, ‘গরম দুধে বিড়াল বেজার।’ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে বিএনপি নেত্রী খুশি হতে পারেননি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ যতই উপকৃত হোক, তাতে বিএনপির লাভ কি? বিএনপি চায় দেশের ক্ষতি হলেও এই সম্পর্ক ক্ষুণœ করে যদি হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে তাড়ানো যায় তাহলেই তাদের পোয়াবারো। ফলে মুখে বিএনপি যতই ভারত-বিরোধিতার ভাব দেখাক, তলে তলে মোদি-ভজনা অব্যাহত রয়েছে।

লন্ডনে কথাটা ফাঁস হতে দেরি হয়নি। দেশে এত সন্ত্রাস, ব্লগার হত্যা, আরও বুদ্ধিজীবী হত্যার হিটলিস্ট প্রকাশ, শিয়াদের মহরমের মিছিলে বোমাবাজি, দেশে আইএসের আবির্ভাব নিয়ে বিতর্কÑ এই জটিল সমস্যার সময়ে দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী দেশে না ফিরে বিদেশে অবসর জীবন দীর্ঘায়িত করেন কিভাবে? এই সকল প্রশ্নের জবাব বিএনপি সূত্র থেকেই হঠাৎ জানা গেছে।

এই সূত্রই প্রকাশ করেছে, বেগম খালেদা জিয়ার এবার লন্ডন সফরের পেছনে অনেকগুলো উদ্দেশ্য ছিল। (ক) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো (খ) বিদেশে পলাতক সন্তান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলন (গ) দল পুনর্গঠন সম্পর্কে পুত্র তারেক এবং তার বন্ধুদের পরামর্শ গ্রহণ (ঘ) দেশে সন্ত্রাসীরা যে তৎপর হবে এবং দেশী-বিদেশী নাগরিক হত্যা করে বড় রকমের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে তা আগে জেনে তার সাফল্য লাভের জন্য বিদেশে বসে অপেক্ষা করা এবং এই রাজনৈতিক চক্রান্তে তিনি এবং তার দল যে জড়িত নেই এটা দেশ-বিদেশের মানুষকে দেখানো।

বিদেশে বসে বিদেশের সরকারগুলোর মধ্যে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে মনোভাব গড়ে তোলাও ছিল তার এবারের লন্ডন সফরের একটি বড় লক্ষ্য। এ জন্য তারেক রহমানের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তৎপরতার অভাব ছিল না। এরপর নাকি দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়েও বেগম জিয়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরের কথা জেনে। মোদির সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার জন্য বিভিন্ন চ্যানেলে তারেক রহমান জোর প্রচেষ্টা চালান। বাজারে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল স্বয়ং মোদির সঙ্গে না হোক, তার শক্তিশালী পার্শ¦চরদের সঙ্গে বেগম জিয়ার একটা বৈঠক হবেই। সেই আসাতেই সম্ভবত: তার স্বদেশ ফেরার তারিখ বার বার পেছাচ্ছেন।

সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়ার কাছে এখনও দিল্লী দূর অস্ত। প্রধানমন্ত্রী মোদি তাকে সাক্ষাতের কোন সময় দিতে পারেননি। এমনকি তার সঙ্গে প্রভাবশালী কোন অমাত্যও নয়। ল-নের বিএনপির যে হাফ নেতা আমাকে সব সময় তার দলের খবরাখবর দেন তিনি বললেন, এবার লন্ডনে তার নেত্রী দীর্ঘকাল অবস্থান করলেও এই সফরের কোন উদ্দেশ্যই তিনি সফল করতে পারেননি। একমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পারিবারিক মিলন ছাড়া তার সব ক’টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ। এটাকে বলা যায়, লন্ডনে বেগম খালেদা জিয়ার ‘মিশন ইমপসিবল।’

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বছর দুই আগে ঢাকায় হেফাজতি অভ্যুত্থানের খবর আগে জেনে বেগম জিয়া তার সাফল্য সম্পর্কে খুবই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। হাসিনা সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার জন্য। হাসিনা সরকার ২৪ ঘণ্টায় সে অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়েছেন। এবারেও খালেদা জিয়া হয়ত আগেভাগেই জেনেছিলেন, দেশে বিদেশী নাগরিক হত্যা করা হবে। ব্লগার হত্যায় বিভীষিকা ছড়ানো হবে। শিয়াদের মহরম মিছিলে বোমা হামলা হবে।

এটা আমার অনুমান, তিনি হয়ত আশা করেছিলেন, বিদেশী হত্যায় বিদেশী-বিশেষ করে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো হাসিনা সরকারের ওপর বেজায় চটে যাবে। হাসিনা সরকার তাদের সমর্থন হারাবে। ব্লগার ও পুস্তক প্রকাশক হত্যায় দেশে আতঙ্ক ও অস্থিরতা দেখা দেবে। বাংলাদেশ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হবে। সবচাইতে বড় কথা, বাংলাদেশে কোন প্রকার শান্তি ও স্বস্তি নেই এবং সংখ্যালঘু হিন্দুরা স্বস্তিতে নেই এটা মোদি সরকারকে বুঝিয়ে হাসিনা সরকারের ওপর থেকে তারা যাতে সমর্থন প্রত্যাহার করেন তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

বেগম জিয়ার লন্ডন সফরের এতগুলো উদ্দেশ্যের একটিও সফল হয়নি। বিদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ফলে আমেরিকা ও ব্রিটেন যে একটু শোরগোল তুলতে চেয়েছিল, হাসিনা সরকারের সাহসী মনোভাব ও তৎপরতায় তা অঙ্কুরেই বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। বিদেশী হত্যাকাণ্ড বা শিয়া মিছিলে বোমাবাজি দ্বারাও একথা প্রমাণ করা যায়নি, এটা আইএসের চক্রান্ত বা বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে। বরং এই অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা যে বিএনপির দোসর জামায়াতী এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের এটা এখন দেশের মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

শেষ চেষ্টা লন্ডনে এসে মোদি-ভজনা। তা কাজ দেয়নি। এখন মাতা-পুত্র কী করবেন? মাতা কি দেশে ফিরে যাবেন? আর পুত্র লন্ডনে বসে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার জন্য তার অসৎ ঐতিহাসিক গবেষণায় মন দেবেন? আবারও কোন চক্রান্তের জাল বুনতে শুরু করবেন? আমার ধারণা, আগামী কিছুদিনের মধ্যে দেশের মানুষ এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানতে পারবে।

লন্ডন, ১৭ নবেম্বর, মঙ্গলবার ২০১৫