২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজের আরও

স্মৃতি এবং ঢাকায় পাড়ি

(১৭ নবেম্বরের পর)

রাফিক ও টুলুর সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় ছিল না। তারা ছিল আমার পত্রবন্ধু ঢ়বহঢ়ধষ। তাদের সঙ্গে প্রায় রোজই দেখা হতো, আড্ডা চলত। টুলুরা থাকত সিদ্দিক বাজারে ঢাকা কলেজের পাশে। তার সঙ্গে রেললাইন ধরে প্রায়ই হাঁটতাম। মুকুল মেলার অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের কাহিনী শুনতাম। প্রগতিশীল ছাত্রদের স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার গল্পগুজব শুনতাম। তখন থেকেই টুলু ছিল সমসাময়িক কথাকাহিনীর চমৎকার গল্পকার। রাফিকের ফটোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ তখনই পরিস্ফুট ছিল।

১৯৫০ সালে মুরারীচাঁদ কলেজে প্রথম বর্ষেই আমি এক রাজনৈতিক পাতি নেতা বনে যাই। কোন ছাত্র সংগঠন না থাকায় কতিপয় সক্রিয় ছাত্র বসে আমাদের ছাত্রনেতাদের উপদেশে গঠন করলাম ‘সিলেট শিক্ষা কমিটি’ এবং আমি তার আহ্বায়ক নির্বাচিত হলাম। এই কথাটি আগেই বলেছি। এই নেতৃত্ব দুই দিকেই কাটল। আমার কিছু বন্ধু এতে আমার শত্রু হয়ে গেলেন। তাদের অভিযোগ ছিল যে, নেতা হিসেবে আমি আমার বুদ্ধিদাতাদের বেশ অবহেলা করেছি। আমার জন্য ছাত্র রাজনীতি তত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। লেখাপড়াটাই ছিল মুখ্য। তবে আমি বোধ হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে একটু বেশি স্বাধীন থাকি। যেমন সবাই বললেন যে, কলেজ ইউনিয়ন নির্বাচনে প্যানেল করা হোক, আমি সেটা মানলাম না। তাতে নির্বাচনে আমার ভরাডুবিও হয়। তবে জাতীয়ভাবে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করতে আমাকেই সব সময় বলা হতো। যেমন ১৯৫০ সালে ১৫ এবং ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে হলো একটি শিক্ষা সম্মেলন। সম্মেলনটি শুরু হয় জনসন রোডে অবস্থিত ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অবশ্য দু’দিনব্যাপী সম্মেলনটি ফজলুল হক হলের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, শিক্ষার মাধ্যম কি হবে, শিক্ষায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে সংগঠন করা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করা কি রকম হবে তাই ছিল আলোচনার বিষয়। সিলেট শিক্ষা কমিটি এই সম্মেলনে আমাকে নেতা করে একটি প্রতিনিধি দল পাঠাল। প্রতিনিধি দলে ঢাকায় অবস্থিত কতিপয় সিনিয়র ছাত্রও সদস্য মনোনীত হলেন। আমি সেই সম্মেলনে গেলাম এবং সেখানে অনেকের সঙ্গে পরিচয়ও হলো, যেমন মোহাম্মদ তোয়াহা, কে জি মুস্তাফা এবং অলি আহাদ প্রমুখ। আমার মনে হলো এই সম্মেলনে শিক্ষার মাধ্যম নিয়েই ব্যাপক আলোচনা হলো; কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তেমন চিন্তা-ভাবনার সন্ধান পাওয়া গেল না এবং এর কারণটি ছিল রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা।

পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৪৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরে সংবিধান বিষয়ক মূলনীতি কমিটি তাদের প্রথম খসড়া রিপোর্ট প্রদান করে। এটি অবশ্য নবেম্বর মাসেই প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু মূলনীতি কমিটি যে প্রতিবেদনটি দেয় তাতে পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অস্বীকৃত হয় এবং প্রদেশটি হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের মতো আরেকটি অংশ। এই প্রতিবেদন সারা পূর্ববাংলায় গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং প্রতিটি জেলায় এই প্রতিবেদনের সুপারিশ প্রতিরোধ করার জন্য কমিটি গঠিত হয়। সিলেটে অন্য কোন সংগঠন ছিল না বলে শিক্ষা কমিটির ওপরই এই দায়িত্ব বর্তে। ঢাকায় এ উপলক্ষে ৪ ও ৫ নবেম্বর বার লাইব্রেরি হলে একটি মহাসম্মেলন (গ্র্যান্ড এ্যাসেম্বলি) আহ্বান করা হয়। এই মহাসম্মেলনের আহ্বায়ক হন কেন্দ্রীয় ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশনের এ্যাকশন কমিটির আহ্বায়ক আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি এ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান (পরবর্তীকালে তিনি হন পূর্ব-পাকিস্তানের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে কিছুদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন)।

এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার ফলে আমার ঢাকার বেশকিছু ছাত্রনেতার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং কিছুদিনের মধ্যেই সেই পরিচয় বেশ কাজে লাগে। আগেই বলেছি যে, ১৯ জুলাই আমাদের আইএ, আইএসসি এবং আইকম পরীক্ষার ফল বেরুলো। জুলাই মাসের শেষের দিকে আমি ঢাকা গেলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলাম। সম্ভবত প্রথম যে কাজটি করতে হলো তা ছিল ইংরেজী বিভাগের প্রধানের সম্মতি গ্রহণ। তখন বিভাগ প্রধান ছিলেন বৃহত্তর লন্ডন এলাকার আত্মভোলা শিক্ষক অধ্যাপক জেমস স্টুয়ার্ট টার্নার। তিনি বিশেষ কোন প্রশ্ন না করে তার সম্মতিসূচক দস্তখত দিলেন। তারপর গেলাম সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটর রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. মফিজউদ্দিন আহমেদের কাছে। আমার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু নুরুল হোসেন খান। তিনি আমার ভর্তির দরখাস্ত সহজেই গ্রহণ করলেন আর আমার বন্ধুকে বললেন যে, সলিমুল্লাহ হলে সব ভাল ছাত্র ভিড় করে, তাই তার দরখাস্ত তিনি নেবেন, তবে সিট প্রদানের সিদ্ধান্ত পরে জানা যাবে। নুরুল যে নামকরা খেলোয়াড় সেই বিষয়টি তিনি কানে নিলেন না। এদিকে নুরুলকে নেবার জন্য ফজলুল হক হলে বেশ কয়েকজন তদ্বির করেন। নুরুল সলিমুল্লাহ হলে সিট পাবে বলে আমি বিশ্বাস করতাম এবং বস্তুত তাই হলো। কিন্তু নুরুল মফিজ সাহেবের সতর্কবাণী শুনে ইতোমধ্যে ফজলুল হক হলে জামাই আদরে ভর্তি হয়ে যায়। সলিমুল্লাহ হল তাই সেই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল গোল কিপারকে আর পেল না। মফিজ সাহেব আমাকে বললেন যে, আমি যেন আরবির অধ্যাপক আবদুর রহমান সাহেবের কাছে যাই। সেখানে গেলে তিনি আমাকে ১৩০ নম্বর কামরা পাব বলে জানালেন। সম্মান বিভাগের অধ্যক্ষের সুপারিশ এবং হাউস টিউটরের দস্তখতসহ আমি আমার ভর্তি ফর্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসে দাখিল করলাম এবং ১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম। খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম যে, ক্লাস শুরু হতে প্রায় সপ্তাহ তিনেক লাগবে। আমি তাই সিলেটে প্রত্যাবর্তন করলাম।

১৯৫১ সালের আগস্ট মাসের ২১ তারিখে আমি আবার সিলেট থেকে ঢাকায় এলাম এবং এবার সরাসরি সলিমুল্লাহ হলের ১৩০ নম্বর কামরায় উপস্থিত হলাম। সম্ভবত সেটা সকালের দিকেই ছিল এবং আমি কামরাতে পেলাম আমার এক বছরের সিনিয়র নুরুল মোমেনকে, যিনি ২য় বর্ষ রাজনীতির ছাত্র ছিলেন। দুই-এক দিনের মধ্যেই আমাদের কামরার ৩য় সদস্য হলেন আমারই সহপাঠী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত এবিএম মোশাররফ হোসেন। মোশাররফ ইসলামী ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন এবং পরবর্তীকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। আমরা তিনজনই এই কামরার অধিবাসী ছিলাম। তখন সচরাচর সাধারণ কামরাগুলোয় তিনজন ছাত্র থাকতেন। দুই-চারটি কামরায় অবশ্য চারজন ছাত্র থাকত। এছাড়া হলে ছিল কয়েকটি সিঙ্গেল এবং চারটি ডাবল কামরা। সিঙ্গেল কামরা সাধারণত পরীক্ষার্থীরা পেত অর্থাৎ ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের ছাত্ররা সেখানে থাকতেন। ডাবল কামরায়ও তেমনি পরীক্ষার্থী ছাত্ররাই থাকতেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ২য় বর্ষের ছাত্রদের দুই-চারজন এখানে জায়গা পেত। আমি ১ম বর্ষের শেষ দিকেই একটি ডাবল রুমে জায়গা পেলাম। অন্য যে ছাত্র এই ডাবল রুমে আসন পেলেন তিনি ছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র আবদুল মুঈদ। তিনি আর এই কামরায় এলেন না।

চলবে...