২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে বসেছে

  • খালেদা ও তারেকের আগের মতো মনোযোগ নেই

শরীফুল ইসলাম ॥ সর্বস্তরে বিএনপির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থেমে গেছে। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ২ মাসেরও বেশি সময় ধরে লন্ডন অবস্থান করায় দল পুনর্গঠনের বিষয়ে তার নির্দেশ দলের অন্য নেতারা আমলে না নেয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে খালেদা জিয়া ও লন্ডন প্রবাসী তার ছেলে তারেক রহমানেরও এখন দল পুনর্গঠনের দিকে আগের মতো মনোযোগ নেই। এ কারণে দলীয় হাইকমান্ডের দল পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে।

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার নির্দেশে ৯ আগস্ট সারাদেশের ৭৫ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবরে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে চিঠি দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সকল জেলা ও এর আওতাভুক্ত সকল স্তরে কমিটি পুনর্গঠনের তাগিদ দেয়া হয়। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগে দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে দলের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে সিনিয়র নেতাদের নির্দেশ দিয়ে যান। তার ইচ্ছে ছিল তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ হয়ে গেলে দেশে ফিরে ডিসেম্বরের মধ্যেই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল করে জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করবেন। তবে প্রথম দিকে সারাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে চললেও এখন সে প্রক্রিয়া থেমে গেছে। এ কারণে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ পাওয়ার ৩ মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র ১টি জেলা, ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে প্রায় ৫০টি উপজেলা, ৩২৪টি পৌরসভার মধ্যে প্রায় ৩০টি পৌরসভা এবং প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়নের মধ্যে এখন পর্যন্ত হাজারখানেক ইউনিয়ন কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলকে গতিশীল করার ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বিএনপি হাইকমান্ড। মূলত বড় ধরনের ২টি আন্দোলন করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিএনপির সর্বস্তরে স্থবিরতা বিরাজ করায় এ পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু দলীয় হাইকমান্ডের এ পরিকল্পনা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। তবে দলের নেতারা দল পুনর্গঠনের কাজ থেমে যাওয়ার বিষয়টিকে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ বৈরী পরিবেশকে দায়ী করছে। আর অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে অবস্থান করায় এবং কবে দেশে ফিরে আসবেন সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু না বলায় দলীয় নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে সর্বস্তরে দল পুনর্গঠন কাজ থামিয়ে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, দল পুনর্গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কয়েক বছর পর রাজনৈতিক দলকে পুনর্গঠন করে নেতৃত্বে গতিশীলতা আনতে হয়। কিন্তু বিএনপি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দল পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে পারছে না। অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা। কেউ কেউ কারাগারে। আবার অনেকেই মামলা-গ্রেফতারের ভয়ে দলীয় কর্মকা- থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখছেন। এ রকম বৈরী পরিবেশে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সত্যিই কঠিন কাজ।

এদিকে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ না হওয়ায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে ৩ বছরের জায়গায় সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করার পর ৬ বছর অতিক্রান্ত হলেও পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল করতে পারছে না বিএনপি। এখন তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যেভাবে থেমে গেছে তাতে কবে বিএনপি পরবর্তী কাউন্সিল করতে পারবে তাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। অবশ্য ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের আগে সকল সাংগঠনিক জেলা ও এর ইউনিট কমিটিগুলো গঠনের জন্য ৬ মাস সময় দেয়া হলেও অধিকাংশ কমিটিই করা সম্ভব হয়নি। পরে কেন্দ্র থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত করে জাতীয় কাউন্সিলের জন্য প্রতিনিধি ঠিক করা হয়। এবার দল পুনর্গঠনের অবস্থা ওই সময়ের চেয়েও খারাপ।

বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। কাউন্সিলের দিন খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন ও তার ছেলে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। আর কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব রেখে দলের ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই বছর ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। ২০১২ সালের শেষ দিকে আবার জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। কাউন্সিল করার জন্য তখন ভেন্যুও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলকে সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে শুরু করে সারাদেশের সকল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্ধ-কোন্দল বেড়ে যাওয়ায় ওই যাত্রায় আর জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি হাইকমান্ড। এরপর বেশ ক’দফা চেষ্টা চালিয়েও জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি। এক পর্যায়ে দলটি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাউন্সিলের পরিবর্তে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে নতুন উদ্যমে আবার তৃণমূলের সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন করে জাতীয় কাউন্সিল কারার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির মাধ্যমে সরকার বিরোধী আন্দোলনের একটি আমেজ সৃষ্টি করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল নেয়া হয়। এ জন্য সাংগঠনিক জেলাগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। অন্য নেতাদের প্রতি আস্থা না থাকায় জেলা নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে বৈঠক করে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় নেতারা পুনর্গঠিত জেলা কমিটির নেতাদের অসহযোগিতা করতে থাকেন। তাই নতুন করে জেলা পর্যায়ে কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ডজন খানেক জেলা কমিটি গঠনের পর এ প্রক্রিয়ায় কমিটি পুনর্গঠনের কাজ স্থগিত করেন খালেদা জিয়া।

এদিকে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল করতে না পারলে নতুন করে জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে কাউকে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে যোগ্যতা সম্পন্ন বিএনপির অনেক নেতা হতাশ হয়ে পড়ছেন। ভেতরে ভেতরে সুযোগবঞ্চিত বিএনপি নেতাদের ক্ষোভও বাড়ছে। তবে জাতীয় কাউন্সিল করার জন্য অনুকূল পরিবেশ না পেলে ২০১৬ সালের প্রথম ভাগে বিএনপি হাইকমান্ড সরাসরি জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করতে পারে। কমিটি পুনর্গঠন করা হলে বিএনপির বর্তমান ৩৮৬ সদস্যের নির্বাহী কমিটি থেকে ১০০ জনের বেশি নেতা বাদ পড়তে পারেন। তবে যাদের রাখা হবে তাদের মধ্য থেকে অনেকেরই পদ-পদবী রদবদল হবে। আর নতুন কমিটিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিশ্বস্ত শতাধিক নেতাকে সুবিধাজনক অবস্থানে স্থান দেয়া হবে।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু জনকণ্ঠকে বলেন, সর্বস্তরে বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের কাজ চলছে। তবে নেতাকর্মীদের নামে মামলাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে দল পুনর্গঠনের কাজ এখনও শেষ করা যায়নি। তবে তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে সুবিধাজনক সময়ে আমরা দলের জাতীয় কাউন্সিল করব।