২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষক এখন ধান কাটে রিপারে, ছুটতে হয় না কামলার জন্য

কৃষক এখন ধান কাটে রিপারে, ছুটতে হয় না কামলার জন্য
  • কৃষিতে নীরব বিপ্লব

সমুদ্র হক ॥ ধান কাটার মৌসুমে এখন আর কামলা কিষানরা ছোটাছুটি করে না। দারিদ্র্য কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক নিজেরাই জমিতে আবাদ করে। তার ওপর কৃষিতে যন্ত্র প্রবেশে আবাদের প্রায় সকল কাজ যন্ত্রই করে দেয়। অঘ্রানে ধান কাটার এই সময়টায় উত্তরাঞ্চলে ফসলের মাঠে রিপার নামে ধান কাটার যন্ত্র প্রবেশ করেছে। সরকার এইসব যন্ত্র কেনার জন্য কৃষকদের জন্য ৩০ শতাংশ ছাড় দেয়ায় মধ্যম আয়ের কৃষকদের সাধ্যের মধ্যে এসেছে। নিজেদের জমির ধান কাটা ছাড়াও স্বল্প ভাড়ায় ক্ষুদ্র কৃষকদের জমির ধানও কেটে দিচ্ছে। এই যন্ত্র শুধু ধান কেটে জমির মধ্যে সাজিয়ে রাখে। পরে কৃষক তা কাঁধে করে বাড়ির উঠানে নিয়ে যায়।

বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার গ্রামে কৃষকদের এই রিপার যন্ত্রে মাঠের ধান কাটতে দেখা যায়। কৃষক আজমল বললেন, শহর থেকে এই যন্ত্র তিনি কিনে এনেছেন। রিপার যন্ত্রটি ভিয়েতনামের তৈরি। গত বছর এই দেশে আমদানি হয়ে এসেছে। সরকার কৃষকদের যন্ত্র কেনায় সাবসিডি দেয়ায় দাম পড়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। রিপার যন্ত্রে এক লিটার পেট্রোলে দুই বিঘা জামির ধান গম কাটা যায়। দুই বিঘা জমির ধান কাটতে সময় লাগে মাত্র এক ঘণ্টা।

একটা সময় ৬/৭ জন কামলায় দুই বিঘা জমির ধান কাটতে সময় লাগত পুরো দিন। এখন গৃহস্থ ও কৃষক নিজেই নিজেদের জমির ধান কেটে নিতে পারে। ক্ষুদ্র কৃষকের জমির ধান কেটে দিলে সে গৃহস্থ ও বড় কৃষকের কাটা ধান উঠানে তুলে দিয়ে আসে। এভাবে কামলার চাহিদা কমে গেছে। বছর কয়েক আগেই ধান মাড়াই কাটাই মৌসুমে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের কামলা কিষানদের দল বেঁধে বগুড়া নওগাঁ দিনাজপুর রাজশাহী নাটোরের দিকে যেতে দেখা যেত। এইসব অঞ্চলের বড় গৃহস্থরা অপেক্ষায় থাকত কখন আসবে কামলা কিষাণ! তাদের জন্য বহিরাঙ্গিনায় (স্থানীয় কথায় খুলি) খাঙ্কা বা বৈঠকখানায় থাকার ব্যবস্থা হতো। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাড়াই কাটাই শেষে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে ঘরে ফিরত। কিছু দিনের প্রবাসী হয়ে থাকা এইসব কামলা কিষানের দিন ফুড়িয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। কৃষিতে যন্ত্র শৈলী প্রবেশের পর এইসব ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের গতি হয়েছে। যাদের অনেকে ধানকাটার মৌসুমে কামলা কিষানের কাজ করত তারা নিজেদের পৈত্রিক ও ভাগিদারদের পাওয়া জমিতে আবাদ শুরু করেছে। নিজেদের জমির ধান নিজেরাই কাটছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে অন্যের জমির ধানকাটার সময় আর তাদের নেই। রিপার নামে যে যন্ত্র দেশে এসেছে তা সহজেই মেলে। প্রতিটি জেলায় ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আবার কৃষি যন্ত্রের ব্যবসায়ীরাও শো রুমে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করছে। ধান কাটার এই যন্ত্র এখন সেচ যন্ত্রের মতো সহজলভ্য। বর্তমানে যে যন্ত্রটি বেশি ব্যবহার হচ্ছে তার ইঞ্জিন ক্ষমতা ১শ’২৫ সিসি। কারিগরি কোন সমস্যা হলে তো যে কোন মোটর মেকানিক সারিয়ে দিতে পার। মেরামত করা কঠিন নয়। এই যন্ত্রের পার্টস সহজে মেলে। মাঠে ধান কেটে আঙিনায় আনার পর ধান মাড়াইয়ের জন্য কাঠের ট্রেডল যন্ত্র আছে। ঢোলের মতো ম্যানুয়াল এই যন্ত্রে হালে মোটর বসিয়ে অটোরান করা হচ্ছে। একজন ডিলার বললেন, একটি জায়েন্ট হারভেস্টারের দাম অনেক। এই হারভেস্টারে মাঠে ধান কেটে মাড়াই করে বস্তায় ভরে নেয়া যায়। এই হারভেস্টার কেনার সাধ্য সকলের নেই। আবার যন্ত্র কোন কারণে বিকল হলে তা সাড়তে ঢাকা থেকে লোক আনতে হয়। এইসব কারণে জায়েন্ট হারভেস্টার বর্তমানে সমবায়ী ভিত্তিতে কেনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বল্প দামে রিপার যন্ত্র মধ্যম সারির কৃষকের কেনার সাধ্যের মধ্যে রয়েছে। দুপচাঁচিয়ার কয়েক কৃষক জানালেন, বগুড়ার শেরপুরে এই যন্ত্র দেখে তারা কিনেছে। দিনে দিনে অন্য এলাকাতেও এই যন্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে। ফুড়িয়ে যাচ্ছে ধান কাটার কামলার সেই চেনা দৃশ্য- জমিতে সারিবদ্ধ বসে ছন্দের সুর তুলে কাঁচি দিয়ে ধান কাটছে কামলারা। কিছুদিনের প্রবাসী হয়ে মাড়াই কাটাই শেষে ফিরছে গ্রামে বৌ-বাচ্চাদের কাছে। এভাবে যারা আসত আজ তারা নিজেরাই নিজেদের জমির ধান কাটে। সেদিন দূরে নয় যেদিন এই রিপার যন্ত্র ওদের ঘরেও পৌঁছে যাবে।