২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী দমনে সহযোগিতা চেয়েছে ভারত

  • ঢাকায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা মোকাবেলায় বাংলাদেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে ভারত। সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশের নাগরিকদের সচেতন করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে উভয় দেশ। এছাড়া আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবেলায় দুই দেশ একযোগে কাজ করবে। বাংলাদেশীদের জন্য ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া উভয় দেশ নিজ নিজ দেশের কারাবন্দী নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এসব আলোচনা হয়।

দুই দিনব্যাপী এ বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র সচিব মোজাম্মেল হক খান নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র সচিব ছাড়াও পুলিশ প্রধান একেএম শহীদুল হক, বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদসহ ১৮ জন অংশ নেন। অপরদিকে, ভারতের পক্ষে ছিলেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজিব মেহর্ষীসহ ১৫ জন।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র সচিব মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে তারা আলোচনা করেছেন। সীমান্তে হত্যা বন্ধে নাগরিকদেরও সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে দুই দেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে।

স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, আমাদের তরফ থেকে কতিপয় বিষয় আলোচনা হয়েছে। তা হলো- সীমান্তে যেন ফায়ারিং কম ঘটে। এটি যেন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। আমাদের টার্গেট সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের এই দাবিতে একমত পোষণ করে আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে জানিয়েছে।

তিনি বলেন, দুই দেশের সীমান্তে যেন উত্তেজনার সৃষ্টি না হয়, এজন্য অবশ্য দুই দেশের নাগরিকদের আমাদের সচেতন করতে হবে। তারা যেন নিজ নিজ দেশের সীমান্ত ক্রস না করে। আন্তর্জাতিক নিয়ম শৃঙ্খলা যেন মেনে চলে। তাহলে আমার মনে হয়, বিএসএফ এবং বিজিবির দায়িত্ব পালন করতে সহজ হবে। এ ধরনের কিলিং ইনসিডেন্স আমাদের দেশে ঘটবে না।

বাংলাদেশে ভারতের কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তৎপরতা নেই জানিয়ে সচিব বলেন, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোন আস্তানা বাংলাদেশে নেই, তৎপরতা নেই তা আমরা তাদের জানিয়েছি। তারপরও আমি বলব- এগুলো ছদ্মপরিচয়ে থাকে। এ বিষয়ে আমরা সচেতন আছি। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কোন তথ্য পেলে আমাদের জানাবে।

বৈঠকে দুই দেশের কাছে যেসব সন্ত্রাসী, দাগী অপরাধী আছে তাদের নিজ নিজ দেশে দ্রুত ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, নির্দিষ্ট কারও সম্পর্কে আলোচনা হয়নি। উভয় দেশের কারাবন্দী নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আইএস, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদের দমনে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে আইএস গোষ্ঠীর কোন তৎপরতা নেই।

দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা সহজীকরণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ভারতীয় পক্ষ ভিসা সহজীকরণের আশ্বাস দিয়েছে।

বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ দমনের বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী আইএসের তৎপরতার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেন উভয় দেশের কর্মকর্তারা। জঙ্গী তৎপরতা রুখতে স্থল সীমান্তের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলকারী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারেও আলোচনা হয়।

দুই দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিকদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। বৈঠকে বিলুপ্ত ছিটমহলে ভারতীয় নাগরিকদের ফেলে যাওয়া জমি বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয়কে কিনে নেয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। তবে এ বিষয়ে বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি বাংলাদেশ। ভারতের প্রস্তাব খতিয়ে দেখার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের অমীমাংসিত সীমানা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ঐকমত্য হয় দুই দেশ।

বৈঠকে মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাদক বিষয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। আমরা জানি, বাংলাদেশ কখনই মাদক উৎপাদক দেশ না। কিন্তু তারপরও ট্রাফিকিং হয়। আমরা এ ব্যাপারে ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ভারত ফেন্সিডিল তৈরি করে। এটা তাদের জন্য একটি ড্রাগ। কিন্তু আমরা মনে করি এটি একটি মাদক। ভারত কর্তৃপক্ষ এ উদ্বেগের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে আরও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে।

বৈঠকে সমুদ্রসীমায় অবৈধ ট্রলার চলাচলের ব্যাপারে উদ্বেগ জানানোর প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, সমুদ্রসীমায় যাতে বিদেশী ট্রলার আসতে না পারে, আমাদের সমুদ্র যেন ট্রাফিকিংয়ের রুট না হয়- সে ব্যাপারেও আমরা ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমানায় ঢুকে যায়, সেগুলো আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি। তারা আমাদের কথা স্বীকার করেছে এবং তারা সতর্ক অবস্থায় থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরাই অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয় কি নাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গত এক বছরে ভারতের নাগরিকরাও এ নিয়ম অমান্য করেছেন। মাদক চোরাচালানের সময় আটজন মারা গেছেন। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীÑ বিজিবির গুলিতে কারও মৃত্যু হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করেননি স্বরাষ্ট্র সচিব।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে বেসামরিক বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রাণহানি নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় গত সাত মাসেই অন্তত ২৮ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও বহুবার সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। বিএসএফের হাতে প্রাণহানি বন্ধে এই বাহিনীকে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র দেয়ার কথাও এক সময় বলা হয়েছিল ভারতের পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র সচিব মঙ্গলবারের বৈঠককে অতীতের চেয়ে সফল দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীনতার পরে এটি ছিল ১৭তম বৈঠক। অতীতের অন্যান্য বৈঠক থেকে এটি সফল ও সন্তোষজনক।