২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটবলের সাবেক নায়ক রংবাজ মঞ্জু

  • টি ইসলাম তারিক

যারা আগে নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখতেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে রংবাজ ছবির কথা। বাংলাদেশে প্রথম এ্যাকশনধর্মী ছবি এটি। আর ছবিটির নায়ক ছিলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। চালচলন আর ঝকমকে পোশাকের প্রথম বৈচিত্র্য ছিল ছবিটিতে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সিনেমার দর্শকদের মাঝে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল রংবাজ ছবিটি নিয়ে। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়ে নতুন গ্লামার নিয়ে ফুটবল মাঠে আগমনী বার্তা জানান একজন খেলোয়াড়। সুঠাম দেহের অধিকারী ঝাঁকড়া চুলের বাহারি সাজ, যিনি ফুটবল প্রিয় দর্শকদের মাঝে ঝড় তোলেন। নাম তার মঞ্জু। যার পুরো নাম শামসুল আলম মঞ্জু। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সমর্থকরা যাকে আদর করে ডাকতেন ‘নুরা পাগলা’।

বাবা আমজাদ আলী, মা রমেসা খাতুন। তিন ভাই এক বোন। বড় দুই ভাই মারা গেছেন। বিএফএফ শাহিন স্কুল, তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল, অতঃপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। স্কুল জীবন থেকেই ফুটবলে হাতেখড়ি। এই ফুটবলকে কেন্দ্র করে মার কাছে অনেক বকুনিও খেতে হয়েছে। ১৯৭০ সালে ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে খেলা শুরু করেন মঞ্জু । ১৯৭২ সালে যোগ দেন প্রথম বিভাগ দলের ধানম-িতে। যেটা বর্তমানে ধানম-ি শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবে রূপান্তরিত। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন নতুনভাবে আবির্ভূত হওয়া আবাহনী ক্রীড়াচক্রে। ওই সময়ই নিজেকে মেলে ধরেন নতুনভাবে। ১৯৭৫ সালে তিনি আবাহনী ছেড়ে দলবদল করে চলে আসেন সমর্থক পুষ্ট দল ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে।

মজার বিষয় হচ্ছে, দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সময় মঞ্জু ছিলেন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। একটি ম্যাচের দিন প্রচুর বৃষ্টি হয়। ওই ম্যাচে তার দলের ৯ জন খেলোয়াড় উপস্থিত ছিলেন। ক্লাব কর্মকর্তাদের কথায় সেদিন মঞ্জু খেলেছিলেন রক্ষণভাগে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দেন তিনি। সেই থেকে রক্ষণভাগ ও আক্রমণভাগ দুই পজিশনেই খেলতে থাকেন। তবে পরবর্তীতে আক্রমণভাগ থেকে রক্ষণভাগেই পাকাপোক্ত করে ফেলেন নিজেকে। সাবেক এই তারকা ফুটবলারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ অনেক কথপোকথন হয়। সাক্ষাতকারে তিনি অনেক অব্যক্ত কথা বলেন।

অনেকেই আপনাকে বলতো বিদ্রোহী, আপনি কি জানেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মঞ্জু হাসতে হাসতে বলেন, হ্যাঁ আমি জানি এবং তা উপভোগ করতাম। আমি সব সময় ছিলাম প্রতিবাদী। আমার বিদ্রোহ এবং প্রতিবাদ এসব ছিল খেলোয়াড়দের জন্যই। এ প্রসঙ্গে মঞ্জু একটা দারুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। বলেন, ‘আমাদের সময় জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়কে যাতায়াত ভাতা দেয়া হতো দুই টাকা, যখন ক্যাম্প চলত তখন সব খেলোয়াড়দের রাখা হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কক্ষে। ৩০ জনের জন্য বাথরুম দুইটা। বিষয়টা চিন্তা করেন। মনে হতো যেন জেলখানায় আছি। ১৯৭৬ সালে কিংস কাপ খেলে আসার পর সাফ জানিয়ে দিলাম আমি জাতীয় দল থেকে অবসরে যাচ্ছি। ১৯৭৮ সালে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে আসেন বেকেল হপ্ট। তিনি তখন লীগের বেশ কটি খেলা দেখেন। ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করেন এই লেফট ব্যাককে দলে রাখা হয়নি কেন? তারা বলেন তিনি অবসরে গেছেন। কোচ জিজ্ঞেস করেন ছেলের বয়স কত? উত্তরে ২২ বললে তিনি বলেন এই বয়সেতো তার জাতীয় দলেই খেলার কথা নয়, সে অবসর নিল কেন? পরবর্তীতে বেকলহপ্ট আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো বিষয়টা অবহিত হন। জানতে চান আমার চাহিদা। আমি পরিষ্কার বলে দিই, আমার একার চাহিদা নয় এটা একটা জাতীয় দলের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের চাহিদা। পরবর্তীতে আমি চাহিদার কথা জানালে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার হন এবং আমাকে আবার জাতীয় দলে সুযোগ করে দেন।’

মঞ্জু মানেই ফরওয়ার্ড লাইনে খেলোয়াড়দের একটা ভিতি কাজ করত। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মাঠে রাফ ট্যাকলিং করে খেলতাম যেন প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা ভীত হন। কারণ আমার কাজ হলো খেলোয়াড় আটকানো সেটা যে কোন উপায়েই হোক। মাঠে আমার গতিবিধি ছিল অনেকটা রংবাজি স্টাইলে। সেই থেকে আমার নাম হয়ে যায় রংবাজ মঞ্জু। আপনার বড় ভাই নান্নুর সঙ্গে আপনার প্রায় ঝগড়া হতো যেটা আমরা পত্রিকায় পড়তাম। এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে মঞ্জু উচ্চস্বরে হাসি দিয়ে বলেন, নান্নু আমার বড় ভাই। কিন্তু আমার সঙ্গে তুই-তোকারি সম্পর্ক ছিল। আমি তাকে ছোট ভাইজান বলে সম্বোধন করতাম। তার সঙ্গে আমার অনেক মজার ঘটনা আছে। একটা ঘটনা বলি। ১৯৭৫ সালে আমি মারদেকা কাপ ফুটবল খেলার জন্য খেলতে মালয়েশিয়া যাই। সেবার ছোট ভাইজান ইনজুরির কারনে যেতে পারেননি। তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছোট ভাইজানের একটা সাক্ষাতকার বের হয়। সেখানে সে আমার সম্পর্কে নানান কথা বলেন। পরে আমি দেশে এসে পাল্টা সাক্ষাতকারে তাকে ইচ্ছামতো ঝেড়ে দিই। পরে আব্বা দুজনকে ডেকে বলে দেন আজ থেকে তোমরা দুজন পত্রিকায় কেউ কারও সম্পর্কে ভাল মন্দ কিছুই বলবে না।

আপনি যখন আবাহনীতে তখন দল পরিচালনা করতে শেখ কামাল। তার সঙ্গে আপনার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল কিন্তু হুট করে আবাহনী ছেড়ে মোহামেডানে যোগ দিলেন কেন? এই প্রশ্নে মঞ্জু মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, আসলে শেখ কামালের শুধু আমার সঙ্গেই না সব খেলোয়াড়দের সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক ছিল। ১৯৭৪ সালে আবাহনীর সঙ্গে নান্নু এবং সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তিন বছরের জন্য চুক্তি করে। প্রতি বছর বিশ হাজার করে তিন বছরে ষাট হাজার। আমি ১৯৭৫ সালে বললাম আমাকে প্রতিবছর ত্রিশ হাজার করে তিন বছরে নব্বই হাজার দিতে হবে। এতে কামাল ভাই রাজি হননি। পরে মোহামেডান আমার কথায় রাজি হলে সেবার আমি মোহামেডানে যোগ দিই। ক্লাব ফুটবলে আপনার সেরা খেলা কোনটা? প্রশ্ন শেষ না হতেই মঞ্জু জানান, ১৯৭৫ সালে আবাহনীকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাটটা। ওই ম্যাচে একটা জিদ কাজ করেছিল। তবে ৪-০ গোলে জিতবো ভাবিনি। তাছাড়া আবাহনীর হয়ে ওয়াপদার বিরুদ্ধে ১-০ গোলে জয় সেটাও স্মরণীয় ম্যাচ। জাতীয় দলের হয়ে কুয়েতে বাহরাইনের বিরুদ্ধে খেলাটিও স্মরণীয় বলা যায়।

ক্লাব ফুটবলে আপনার সেরা মুহূর্ত কোনটা? প্রশ্নটি শোনার পর একসময়ের সেরা জাঁদরেল ডিফেন্ডার কিছুটা আবেগি হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, অবশ্যই সেটা ১৯৭৮ সালের মোহামেডান-আবাহনীর ম্যাচ। টান টান উত্তেজনার ওই ম্যাচটাকে ঘিরে কি উন্মাদনাই ছিল। পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই সেরা দলের দুই অধিনায়ক দুই সহদর। মোহামেডানের মঞ্জু আর আবাহনীর নান্নু। খেলা শুরুর প্রারম্ভে যখন দুই ভাই করমর্দন করেন তখন পুরো গ্যালারির সমর্থকরা দাঁড়িয়ে যে সম্মান প্রদর্শন করেন সেই মুহূর্তটা আজও বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে। ১৯৭৫ সালে জাতীয় যুব দলের অধিনায়ক হয়ে খেলেন মঞ্জু এবং ওই বছরই জাতীয় দলে খেলেন। ১৯৮২ সালে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে খেলে অবসর নেন।

বাংলাদেশ ফুটবলের ফরওয়ার্ড নিয়ে কথা বললে তিনি কাজী সালাহউদ্দিন আর এনায়েতের কথা বলেন। তার মতে, জনপ্রিয়তার দিক থেকে সালাহউদ্দিন অনেক এগিয়ে। কারণ একটাই দীর্ঘদিন আবাহনীর মতো একটা জনপ্রিয় ক্লাবে খেলা। এনায়েত অল্পসময়ে খেলেছেন বিভিন্ন ক্লাবে। এনায়েত যদি মোহামেডানে ১৯৭২ সালে যোগ দিতেন তবে দুজনের জনপ্রিয়তার স্কেল নির্ধারণ করা কঠিন হতো বলে মনে করেন দেশ সেরা সাবেক ডিফেন্ডার মঞ্জু। খেলা ছেড়ে দেয়ার পর ১৯৮৬ সালে মঞ্জু রহমতগঞ্জের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর একই ক্লাবে কোচ কাম ম্যানেজার। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় যুব দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে চলে যান পরিবারসহ আমেরিকায়। মঞ্জু পুরো খেলোয়াড়ি জীবনটা দারুণভাবে উপভোগ করেছেন। কোন কষ্ট তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তবে ২০০৪ সালে তার ছোট ভাই নান্নু মারা যাওয়ার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। তৎক্ষণাৎ দেশে আসতে না পারার বিষয়টা তাকে আজও পিড়া দেয়।

মঞ্জু ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান। ২০০৯ সালে পান জাতীয় পুরস্কার। তার সহদর মনোয়ার হোসেন নান্নু ১৯৭৪ সালে ক্রীড়ালেখক সমিতির বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান। এবং ১৯৯৮ সালে পান জাতীয় পুরস্কার। বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য সাবেক খেলোয়াড়দের কিছু করণীয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন, সবাই চাই দেশের ভাল। তেমনি ফুটবল খেলোয়াড়রাও চায় দেশের ফুটবল এগিয়ে যাক। কিন্তু চাইলেই তো হবে না। সব কিছুর মূলে অর্থ। আমার পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে আমি ঢাকার বাইরে বড় জায়গা নিয়ে একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স তৈরি করতাম। যেখানে ফুটবল হকি ক্রিকেটসহ খেলাধুলার যাবতীয় কিছু থাকবে। এটা থেকে যেমন উপার্জন হবে তেমনি দেশের খেলাধুলার মান উন্নয়নেও সহায়ক হবে। আজ দেশের বিত্তবানদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসার প্রয়োজন বলে মনে করি।

মোহামেডান আবাহনী এবং রহমতগঞ্জ এই তিন ক্লাবের হয়ে খেলা খুব উপভোগ করেছেন মঞ্জু। তবে তার প্রিয় ক্লাব মোহামেডান। ১৯৭৮ সালে তার অধিনায়কত্বে মোহামেডান অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি যোগ দেন রহমতগঞ্জে । সেখানে ১৯৮৩ পর্যন্ত খেলেন। আবার ’৮৪ সালে ফিরে আসেন তার প্রিয় দল মোহামেডানে। মোহামেডানের হয়েই খেলা শেষ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটা হয়নি। অবশেষে ১৯৮৫ সালে ওয়ারির হয়ে এই কৃতী ফুটবলার তার বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের যবনিকা ঘটান। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন যতদিন বাঁচবেন বাংলাদেশ ফুটবল আর সমর্থকদের ভালবাসা নিয়েই বাঁচতে চান মঞ্জু ।

মাঠের মঞ্জু আর মাঠের বাইরের মঞ্জুর মধ্যে বিস্তর তফাৎ। মাঠে তিনি রংবাজ হলেও মাঠের বাইরে কিন্তু তিনি খুব বন্ধুসুলভ। কথা বার্তায়, চলনে বলনে একেবারে সাবলীল। গুছিয়ে কথা বলতে পারদর্শী। একজন ভাল মানুষের যা গুণাবলী আছে তা তার মধ্যে উপস্থিত। বর্তমানে তিনি শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের পরিচালকদের একজন। তবে পরিবার নিয়ে আমেরিকাতেই বসবাস করেন। স্ত্রী, দুই ছেলে, ছেলের বউ আর তিন নাতি নাতনী নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। মাঝে মাঝে মাতৃভূমি আর সমর্থকদের টানেই চলে আসেন লাল-সবুজের এই দেশে।

বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনে অনেক খেলোয়াড়ের জন্ম হবে কিন্তু শামসুল আলম মঞ্জু তথা সমর্থকদের ভালবাসার নুরা পাগলার মতো খেলোয়াড়ের দেখা মিলবে কিনা সন্দেহ। ঝাঁকড়া চুল আর দুই নম্বর জার্সি গায়ে চেপে কখনোই হয়ত বা তাকে আর মাঠে খেলোয়াড় হিসেবে দেখা যাবে না। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের ফুটবল প্রিয় লাখো সমর্থকদের মনে যে স্থান দখল করে নিয়েছেন তা কখনোই হারিয়ে যাওয়ার নয়। স্মৃতির মনিকোঠায় চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।

নির্বাচিত সংবাদ