২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওয়ানডে ছাড়লেন টেস্টের রাজা

  • মোঃ নুরুজ্জামান

২০০০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় ইউনুস খানের। ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ২৬৫ ম্যাচে ৩১ গড়ে মোট ৭,২৪৯ রান সংগ্রহ করেছেন। সেঞ্চুরি ৭ ও হাফ সেঞ্চুরি ৪৮টি। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৪৪- কলম্বোতে ২০০৪ সালে, হংকংয়ের বিপক্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্টের দূরন্ত ব্যাটসম্যানের ওয়ানডে নিয়ে কম নাটক হয়নি। বড় নাটক হয় বিশ্বকাপের ঠিক আগে। যখন তিনি ওয়ানডেতে সুযোগ না পেলে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের হুমকি দেন! অবশ্য সুযোগ পেয়েও বিশ্বকাপে একদমই সুবিধা করতে পারেননি। তাই আবার বাদ পড়েন। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচ খেলে আচমকাই ওয়ানডেকে বিদায় জানালেন পাকিস্তানী তারকা।

ওয়ানডে অবসর প্রসঙ্গে ইউনুস বলেন, ‘ওয়ানডে থেকে অবসরের ঘোষণা দিতে পেরে আমি আনন্দিত। কারণ মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারছি! আমি আমার পরিবার, আত্মীয় এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি সত্যি সন্তুষ্ট। আল্লাহর কাছে শুকুরিয়া যে দীর্ঘদিন পাকিস্তানের সেবা করতে পেরেছি। আগেই টি২০ ছেড়েছি। মনে হয়েছে ওয়ানডে ছাড়ার এটাই সঠিক সময়। এতে করে পরিবারকে সময় দিতে পারব। টেস্টে আরও বেশি করে মনোযোগী হতে পারব।’ দেশের প্রতি ভালবাসার কথা জানিয়ে ইউনুস বলেন, ‘ক্রিকেট আমার প্যাশন। ছোটবেলা থেকে এখনও এটিকে সমানভাবে ভালবাসি। ভালবাসি বলেই চালিয়ে যাচ্ছি (টেস্টে)। ১৫ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সবসময় পাকিস্তানের সাফল্যের জন্য খেলেছি। দলের জয়ে ভূমিকার রাখার আনন্দটা উপভোগ করেছি।’

সাবেক সতীর্থ, নির্বাচক ও বোর্ড কর্তাদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। বলেন, ‘দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাকিস্তানের বিখ্যাত সব ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলেছি, সেসব স্মৃতি ভোলার নয়। তাদের সঙ্গে খেলাটা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। সুযোগ দেয়ার জন্য নির্বাচক এবং বোর্ড (পিসিবি) কর্তাদের ধন্যবাদ জানাই। আশা করছি এ সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’ পাকিস্তান ক্রিকেটের সম্ভাবনা নিয়ে ইউনুস জানান, ‘তরুণরা উঠে আসছে। দলে একাধিক নবীন ক্রিকেটার আসলেই ভাল খেলছে। তরুণ প্রজন্মই একদিন আমাদের শিখরে তুলে নেব, যেভাবে ১৯৯২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।’ ইউনুসের প্রশংসা করে বর্তমান কোচ ওয়াকার ইউনুস বলেন, ‘ইউনুস পাকিস্তান ইতিহাসেরই অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান। অবশ্যই আমি ওর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। সাদা পোশাকে এখনও সে আমাদের অন্যতম স্তম্ভ। ওয়ানডে ছাড়ায় পরিবারকে যেমন সময় দিতে পারবে, তেমনি টেস্ট সাফল্যে আরও অবদান রাখতে পারবে।’

ওয়ানডের তুলনায় টেস্টেই বেশি সফল ইউনুস। ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানই সাক্ষী। টেস্টে পাকিস্তান ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯,১১৬ রানের মালিক ইউনুস। আবুধাবিতে সিরিজের প্রথম টেস্টে ৩৮ রানের পথে দুই গ্রেট জাভেদ মিয়াদাদ ও ইনজামাম উল হককে পেছনে ফেলে রেকর্ড গড়েনি তিনি। এরপর দুবাই টেস্টে খেলেন ৫৬ ও ১১৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। শারজায় ৩১ ও ১৪Ñ যার ওপর ভর করে ২-০ তে সিরিজ জেতে পাকিস্তান। ২৯ নবেম্বর ৩৮- এ পা দিতে যাওয়া ইউনুস টেস্টে এখনও দলের অন্যতম ত্রাতা হিসেবেই খেলে যাচ্ছেন। বয়স, পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে ওয়ানডে ছাড়ার সিদ্ধান্তটা হয়ত ঠিকই আছে। ৮,৮৩২ রান নিয়ে দুইয়ে নেমে গেছেন মিয়াদাদ। আবুধাবিতে টস জিতে ব্যাটিং নেন অধিনায়ক মিসবাহ-উল হক। দুই ওপেনার শান মাসুদ ও মোহাম্মদ হাফিজ আউট হওয়ার পর ক্রিজে আসেন ইউনুস। ১০১ টেস্টে যখন তার নামের পাশে ৮,৮১৪ রান। ব্যক্তিগত ১৬ রান করে প্রথমে ইনজামাম-উল হক (৮,৮২৯) ও পরে ১৯ রান করে মিয়াদাদককে পেছনে ফেলেন।

বয়স ৩৯Ñএর কোঠায় পড়লেও টেস্টে ব্যাট হাতে দুরন্ত ছুটে চলেছেন ইউনুস। গত এক বছরে হাকিয়েছেন ৯টি সেঞ্চুরি, এ সময়ে টেস্টে তার গড় ৮০’র ওপরে। স্বভাবতই ইউনুসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় মেতেছেন অধিনায়ক। সাদা পোশাকের নেতা মিসবাহ-উল হক যেমন বলেন,‘ড্রেসিং রুমে ওর মতো একজন গ্রেট ব্যাটসম্যানকে পেয়ে আমরা গর্বিত। সেঞ্চুরি সংখ্যা, রানসহ আরও অনেক রেকর্ডই এখন ইউনুসের দখলে। মানুষ হিসেবেও সে চমৎকার। তরুণরা ওকে আদর্শ মানে। সুযোগ পেলে সেও তরুণদের অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। ইউনুস ব্যাট হাতে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক। যে রান করতে ভালবাসে, দলকে জেতাতে চায়।’ উল্লেখ্য ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রানের মালিক হয়েছিলেন মিয়াদাদ। গত ২২ বছর সেটি অক্ষত ছিল। কাছাকাছি গিয়েও পারেননি ইনজামাম (২০০৭)। অবশেষে জীবন্ত কিংবদন্তিকে পেছনে ফেলে পাহাড় চুড়ায় ইউনুস।

তবে বিনয়ী ইউনুস সম্মানে, জনপ্রিয়তায় মিয়াদাদকেই এগিয়ে রাখেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট রানের মালিক হওয়াটা দারুণ এক অনুভূতির। তবে কিছুতেই নিজেকে মিয়াদাদের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। তিনি সত্যিকারের কিংবদন্তি।’ বলেন ইউনুস। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কিছুতেই মিয়াদাদ-ইনজামামদের সমকক্ষ নই। তারা পাকিস্তান ক্রিকেটের স্বপ্নপুরুষ, আমার নিজেরও আইডল। তাদের সঙ্গে নিজের তুলনা করাটা ধৃষ্ঠতার সামিল। কেবল সামর্থ্যরে সেরাটা দিয়ে ব্যাটিং করাই লক্ষ্য। ইনজামাম-মোহাম্মদ ইউসুফদের দেখেছি, তারা সবসময় দলের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন। জয়ে অবদান রাখতে পারলে আমিও গর্ববোধ করি।’ কেবল সর্বোচ্চ রানই নয়, পাকিস্তানের হয়ে আরও অনেক অর্জনে ইতোমধ্যে নিজেকে সামিল করেছেন ইউনুস। দেশটির হয়ে সবচেয়ে বেশি ৩১টি সেঞ্চুরির মালিক তিনিই। ২৫, ২৪ ও ২৩টি করে সেঞ্চুরি নিয়ে তার পেছনে যথাক্রমে গ্রেট ইনজামাম, মোহাম্মদ ইউসুফ ও মিয়াদাদ।

পঞ্চম পাকিস্তানী হিসেবে ১শ’র বেশি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ইউনুস খেলেছেন ১০৪ ম্যাচ। ১২৪, ১১৯, ১০৪ ও ১০৩ টেস্ট খেলা চার তারকা মিয়াদাদ, ইনজামাম, ওয়াসিম আকরম ও সেলিম মালিক অনেক আগেই সাবেক হয়ে গেছেন।