২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টাইগারদের সাফল্যে মোড়ানো বছর

  • বিউটি পারভীন

এ বছর বিশ্বকাপ থেকেই জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম ম্যাচেই আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে গুঁড়িয়ে দিয়ে শুরু করা বাংলাদেশ দল প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। এরপর টানা চারটি সিরিজ জিতেছে টাইগাররা ঘরের মাটিতে। বছর শেষ হতে যে এখনও বাকি দেড় মাস। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সূচীতে বছরের বাকি সময়টা আপাতত ফাঁকাই। তাই জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিরিজের শেষ টি২০ ম্যাচই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বছরের সর্বশেষ। হার দিয়ে শেষ হলেও বছরটি শেষ পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশ দলের জন্য। এ রকম সোনালী সময় নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে আর কখনও পার করেনি টাইগাররা। মোট ১৯ ওয়ানডে খেলে ১৩টিতেই জিতে বছরের সাফল্যে দ্বিতীয় সেরা দল বাংলাদেশ। পরাজয় মাত্র একটি এবং অন্যটি পরিত্যক্ত হয়েছে। ৫ টেস্ট খেলে মাত্র ১ পরাজয় এবং বাকি চারটিতেই জয়। আর ৫ টি২০ খেলে তিনটিতে হার ও দুটিতে জয়। সবমিলিয়ে নিজেদের সেরা একটা সফল বছর শেষ করেছে বাংলাদেশ।

এ বছরই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা দেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু। এরপর পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষে টানা তিন সিরিজে জয়, ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে সাতে উঠে আসা, টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়েও নিজেদের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠা, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নিশ্চিত করা। সবমিলিয়ে অনেকগুলো অর্জন বাংলাদেশের এ বছর। আর এর সবই এসেছে প্রধান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহের অধীনে। তবে তিনি খেলোয়াড়দেরই কৃতিত্ব দিয়েছেন সবকিছু ভালভাবে অনুধাবন করতে পারার কারণে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,‘আমি মনে করি টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বিতর্কহীনভাবেই এটা বাংলাদেশের সেরা বছর। আমি খেলোয়াড়দের উন্নতিতে দারুণ সন্তুষ্ট। টানা ৫ সিরিজ জয় সহজ কথা নয়। কারণ দুয়েকটা খারাপ সিরিজ যেতেই পারে। কিন্তু আমরা ধারাবাহিকভাবেই ভাল খেলেছি।’ শুধু তাই নয়, বছরটা জিম্বাবুইয়ের কাছে টি২০ হার দিয়ে শুরু হলেও টানা ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরা তাদের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ওয়ানডেতে এবছর বাংলাদেশের সফলতার হার ৭২.২২ ভাগ, ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার পর এ বছরের দ্বিতীয় সফল দল। অস্ট্রেলিয়া ১৯ ম্যাচে ১৫ জয় পেয়েছে। সফলতার হারের দিক থেকে হিসেব কষলে এটিই বাংলাদেশের সেরা সময়।

এর আগে অবশ্য ২০০৯ সালেই সবচেয়ে সফল সময় পার করেছিল বাংলাদেশ। সেবার ১৯ ওয়ানডে খেলে ১৪ জয় পেয়েছিল। তবে সেবার বাংলাদেশের অধিকাংশ জয়ই ছিল জিম্বাবুয়ে এবং খর্ব শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। কিন্তু এ বছর বাংলাদেশের শিকারের তালিকায় ছিল ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তিরা। টেস্টেও সময়টি খারাপ কাটেনি বাংলাদেশের। ৫টি ম্যাচ খেলে কেবল ১টিতেই হার, বাকি চারটিতে ড্র। টি২০ ক্রিকেটেও বাংলাদেশের পারফর্মেন্স আশা জাগানিয়া। অতীত রেকর্ড বিবেচনা করলে ৫ ম্যাচে ২টি জয়, তার মধ্যে একটি পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে প্রথমবার জয় তুলে নেয়া। সেই ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ থেকে উনত্রিশ বছর সাত মাস ধরে ওয়ানডে ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে এসে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্যই মিলেছে বাংলাদেশের। পাকিস্তানকে ১৯৯৯ সালের পর দ্বিতীয়বারের মত হারিয়েছে। ১৬ বছর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আবার জয় পায়। প্রথমবারের মত সিরিজে হারানোর সঙ্গে পাকিদের হোয়াইটওয়াশও করেছে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকেও প্রথমবারের মত সিরিজে হারিয়েছে। এ বছর একটি সিরিজেও হারেনি মাশরাফিবাহিনী। এমনকি দেশের মাটিতে ১২ ম্যাচ খেলে মাত্র ২টি ম্যাচ হেরেছে!

এবার বাংলাদেশে খেলতে আসে দক্ষিণ আফ্রিকা। বাংলাদেশ যে ওয়ানডেতে চমক দেখাচ্ছে তাতে ভয় ছিল প্রোটিয়াদের। কিন্তু পরপর দুই টি২০তে জিতে এমন এক ভাব তৈরি হয়েছিল, যেন ওয়ানডেতে অনায়াসেই জিতে যাবে। এবি ডি ভিলিয়ার্সতো টি২০ খেলার পর ওয়ানডেতে খেললেনই না। প্রথম ওয়ানডেতেও ৮ উইকেটে জিতল দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু এরপর প্রোটিয়ারা বুঝল বাংলাদেশ এখন আর ফেলনা দল নয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ানডেতে জিতে গেল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৭ উইকেটে ও তৃতীয় ওয়ানডেতে ৯ উইকেটে জিতে সিরিজই জিতে গেল বাংলাদেশ। এ বছর টানা তিন সিরিজ জিতে নিল। আর এবার জিম্বাবুইয়েকে ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে সাফল্যের ষোলকলা পূর্ণ করে বাংলাদেশ দল। হার-জিতের হিসেবে অবশ্য ২০০৯ সালটিকেই সেরা ধরা হয়। এ বছর ১৯ ম্যাচে ১৪ জয় পায় বাংলাদেশ। হার-জিতের হিসেবে এক ম্যাচ বেশি খেলায় ২.৮০০ ভাগ সাফল্য। আর ২০১৫ সালে সাফল্য ২.৬০০। তবে ২০০৯ সালে পূর্ণশক্তির দলগুলোর মধ্যে শুধু শ্রীলঙ্কাকেই হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। তবে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি পূর্ণশক্তির দল ছিল। আর সব জয়ই আসে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে। ২০১৫ সালে যেহেতু ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলকে হারানোর গৌরব যুক্ত হয়েছে, তাই এ বছরটিকেই সেরা ধরা হচ্ছে।

অন্য কোন বছরেই এত সাফল্য মিলেনি বাংলাদেশের। ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ ২৮ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। জয়ও ধরা দেয় ১৮টি। কিন্তু সঙ্গে হার ১০টি আছে। এরপর ২০১০ সালে ২৭ ম্যাচ খেলে ৯ জয়ের বিপরীতে হার ১৮টি। বাংলাদেশ ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ বছর ধরা হয় ২০০৩ সালকে। এ বছর ২১টি ম্যাচ খেলে একটিতেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। বছরে খেলা আর হার-জিতের হিসেবে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কোন জয় নেই বাংলাদেশের। ১৯৮৬ সালে ২ ম্যাচ, ১৯৮৮ সালে ৩ ম্যাচ, ১৯৯০ সালে ৪ ম্যাচ, ১৯৯৫ সালে ৩ ম্যাচ, ১৯৯৭ সালে ৭ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। জয়হীন থাকে। ১৯৯৮ সালে গিয়ে প্রথমবারের মতো জয়ের মুখ দেখে বাংলাদেশ। ৬ ম্যাচ খেলে ১টিতে জয় পায়। সেই জয়টি আসে তখনকার বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দল কেনিয়ার বিপক্ষে। ১৯৯৯ সালে গিয়ে ১২ ম্যাচ খেলে ২টিতে জয় পায় বাংলাদেশ। এরমধ্যে বিশ্বকাপেই দুটি জয় আসে। প্রথমবারের মত কোন টেস্ট খেলুড়ে দলকে হারায় বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে স্কটল্যান্ডকেও হারায় বাংলাদেশ। এরপর টানা চারবছর কোন জয় নেই। ২০০০ সালে ৪টি, ২০০১ সালে ৬টি, ২০০২ সালে ১৪টি ও ২০০৩ সালে ২১টি ম্যাচ খেলে একটিতেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ২০০৪ সালে আবার জয়ের দেখা পায়। সেই থেকে আর জয়হীন বছর কাটাতে হয়নি বাংলাদেশকে। ২০০৪ সালে ১৯ ম্যাচে ৩টিতে, ২০০৫ সালে ১৪ ম্যাচে ৪টিতে, ২০০৬ সালে ২৮ ম্যাচে ১৮টিতে, ২০০৭ সালে ২৩ ম্যাচে ৮টিতে, ২০০৮ সালে ২৬ ম্যাচে ৫টিতে, ২০০৯ সালে ১৯ ম্যাচে ১৪টিতে, ২০১০ সালে ২৭ ম্যাচে ৯টিতে, ২০১১ সালে ২০ ম্যাচে ৬টিতে, ২০১২ ও ২০১৩ সালে ৯ ম্যাচে ৫টিতে ও ২০১৪ সালে ১৮ ম্যাচে ৫টিতে জয় পায় বাংলাদেশ।