১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীন-তাইওয়ান ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠক

  • এনামুল হক

চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউ গত ৭ নবেম্বর সিঙ্গাপুরে এক বৈঠকে মিলিত হন। ১৯৪৯ সালে চীনে গৃহযুদ্ধ অবসানের পর থেকে ৬৬ বছরের মধ্যে দু’পক্ষের এটাই প্রথম শীর্ষ বৈঠক। এ যে এক ঐতিহাসিক বৈঠক সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। ২০১৩ সালে বালিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনে দু’পক্ষের প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে এই শীর্ষ বৈঠকের বীজ বপন করা হয়। তারপর থেকে বেশ কয়েকবার উভয়ের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে যার চূড়ান্ত পরিণতি এই শীর্ষ বৈঠক। জানা গেছে শীর্ষ বৈঠকের মূল উদ্যোগটা এসেছে চীনের দিক থেকে।

বর্তমান পটভূমিতে শীর্ষ বৈঠকটি দু’পক্ষের জন্যই রাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা তাইওয়ানের সঙ্গে মূল চীনের শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রাথমিক অথচ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বৈঠক এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো যখন চীন এ অঞ্চলের অভিন্ন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে জোরেশোরে এগিয়ে চলেছে। তবে একই সঙ্গে আবার কিছু কিছু পর্যবেক্ষক এমনও আশঙ্কা করছেন যে এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে চীনের স্ট্যাটেজিক প্রভাব বাইরের দিকে ছড়িয়ে দেয়ার উচ্চাভিলাষেরও পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মতে চীনের কূটনীতিতে এক নতুন চেহারা ও ভাব এসেছে। নিজেদের সীমান্তকে ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে চীনা নেতাদের এমন আগ্রহ আগে আর কখনও দেখা যায়নি।

অন্যদিকে তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈঠকটা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন সেখানে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের আর দু’মাসের মতো সময় বাকি এবং যে নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির (ডিপিপি) জয়লাভের সমূহ সম্ভাবনা আছে। এই দলটি মূলচীন থেকে স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন থাকার পক্ষপাতী এবং ক্ষমতায় এলে তারা যে শীর্ষ বৈঠকে সূচিত প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে চাইবে না তা বলাই বাহুল্য।

স্বাভাবিকভাবেই চীন-তাইওয়ান পুনরেকত্রীকরণের ব্যাপারে এই শীর্ষ বৈঠকের গুরুত্বকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তথাপি চীন এক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে কোন ফল অর্জন করতে চাইছে বলে মনে হয় না। কারণ তেমন কিছু করতে গেলে সঙ্কট সৃষ্টি হবে এটা চীনও জানে। সেজন্য চীন তাইওয়ানী ভোটারদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেই বরং বেশি উৎসাহী। তাইওয়ান সরকারও এ ব্যাপারে সতর্ক থেকেছে। তাই মা ইং-জিউ বৈঠকে বলেছেন যে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এখনও বিশাল এবং সেজন্যই তিনি স্ট্যাটাসকো বজায় রাখতে আগ্রহী।

চীন-তাইওয়ান পুনরেত্রীকরণ শেষ পর্যন্ত যদি ঘটে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র যে তার তাইওয়ান নীতি পুনঃপরীক্ষা করে দেখবে তাতে সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে চীন-মার্কিন সম্পর্কেরও এক নতুন রূপান্তর ঘটে যেতে পারে। কারণ তখন সংযুক্ত চীন আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হবে। অন্যদিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য হবে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।

শীর্ষ বৈঠকটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কাজেই তার পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা যায় যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে কথা বলেছেন। উভয় নেতা এক চীনের কথা বললেও তাদের সুরে ভিন্নতা ছিল। প্রেসিডেন্ট জিং সুস্পষ্টভাবে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন যে, তাইওয়ান প্রশ্নে তাদের ভূমিকা বদলেছে। অতীতের মতো বৈরিতা এখন দু’পক্ষের মধ্যে নেই। এখন কোন শত্রুতা নেই, বিরোধ নেই।

প্রেসিডেন্ট মা’র বক্তব্য থেকে জানা যায় প্রেসিডেন্ট জিং বলেছেন চীনের সামরিক শক্তি মোতায়েনের টার্গেট তাইওয়ান নয়। এর অর্থ দাঁড়ায় দুই চীন পুনরেকত্রীকরণে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা না করার বিষয়টি শীর্ষ বৈঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে। ওদিকে চীনের পিপলস ডেইলী পত্রিকার এক নিবন্ধে তাইওয়ানের স্বাধীনতাকামী শক্তিগুলোকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে চীনের শক্তি প্রয়োগের কোন অভিপ্রায়ের কথা বলা হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিং আরও বলেছেন, তাইওয়ান যে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহে অংশ নিতে চায় চীন তা জানে তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা এক চীন নীতির বিরুদ্ধে না যাচ্ছে ততক্ষণ বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সে ধরনের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষতি না করে এই বিষয়টির সমন্বয় করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চীন এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে তাইওয়ানের নয়া নেতৃত্ব বিশেষ করে স্বাধীনতাকামীরা ক্ষমতায় এলে তারা এক চীন নীতি থেকে সরে এসে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করতে পারে। এ জাতীয় কোন ঘোষণা এলে চীন যে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এই সূক্ষ্ম আভাসও শীর্ষ বৈঠকে জানিয়ে দেয়া হয়।

সূত্র: দি ইকোনমিস্ট