২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুতিনের যোগ্য উত্তরসূরি

  • মুসান্না সাজ্জিল

রাশিয়ার পরাক্রান্ত প্রেসিডেন্ট পুতিনের উত্তরসূরি হিসেবে পর্যবেক্ষকরা যাকে পয়লা নম্বরে স্থান দেয়ার পক্ষপাতী তিনি হলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই শোয়িগু। অর্থাৎ রাশিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা তারই সবচেয়ে বেশি। আনুগত্য, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এই তিনটি গুণের সমাবেশ তাকে মুষ্টিমেয় যে ক’জনকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হচ্ছে তাদের অন্যতম একজনে পরিণত করেছে। বলা হয় যে, যে কোন জরুরী পরিস্থিতি সামাল দিতে তার জুড়ি মেলা ভার।

পুতিনের বিশ্বস্ত এই প্রতিরক্ষামন্ত্রীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে প্রতিটি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালের শেষ দিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে পুতিনের সঙ্গে তার অংশীদারিত্ব ডালপালা মেলে বিস্তার লাভ করেছে। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী পুতিনের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায় সার্গেই শোয়িগুর গুরুত্বও বেড়ে গেছে। ন্যাটোর আকাশসীমার প্রান্ত বরাবর ক্রিমিয়া ও পূর্ব ইউক্রেন এবং বর্তমানে সিরিয়ায় রাশিয়া বেশ সার্থকভাবেই তার পেশীশক্তি প্রদর্শন করে চলেছে। এক্ষেত্রে শোয়িগুর নেতৃত্বে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী যে সক্ষমতা, সংগঠনগত ও লজিস্টিকগত দক্ষতা ও কুশলীপনা দেখাতে পেরেছে আগে আর কখনো দেখা যায়নি।

তবে শোয়িগু রাশিয়ার বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই পরিচয়টাই তার একমাত্র পরিচয় নয়। ৬০ বছর বয়স্ক এই মানুষটি পুতিনের চেয়ে তিন বছর ছোট হলে কি হবে তিনিই হলেন সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে নিয়োজিত রুশ সরকারের সদস্য যার কার্যকাল সেই ১৯৯০ সাল থেকে অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনেরও আগ থেকে শুরু। তখনও পুতিন রাশিয়ার দৃশ্যপটে অজ্ঞাত অপরিচিত ছিলেন। শোয়িগু জরুরী পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ে স্বীয় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। রুশ আমলাতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বিচরণ করলেও তিনি উল্লেখযোগ্য কোন শত্রু তৈরি করেননি। অথচ ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা দুটোই করায়ত্ত করেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে রুশ শাসকশ্রেণীর মধ্যে তার মতো আর কেউ নেই। তার উত্থানের কাহিনী একান্তই নজিরবিহীন।

শোয়িগু পুতিনের সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রাক্তন কেজিবি সদস্যদের ক্ষুদ্র কোটারির কেউ নন। তথাপি তিনি অন্দরমহলের এক বিশ্বস্ত ব্যক্তি। পুতিনের সহযোগীদের মধ্যে প্রভাব প্রতিপত্তির দিক দিয়ে তার স্থান দ্বিতীয়। তার আগে রয়েছেন চিফ অব স্টাফ সার্গেই আইভানভ। ইউক্রেন বা সিরিয়ায় অভিযান চালানোর মতো বড় ধরনের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন যখন আসে তখন শোয়িগু অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ান।

শোয়িগু দক্ষিণ সাইবেরিয়ার অখ্যাত স্বল্প পরিচিত প্রজাতন্ত্র তুভায় বেড়ে উঠেছিলেন। খেলাধুলায় প্রবল উৎসাহী ছিলেন। পেশায় হয়ে দাঁড়ান ইঞ্জিনিয়ার। বেশকিছু সফল নির্মাণকাজ শেষ করার পর ক্রেমলিনের ও পার্টির সুনজরে পড়েন। তাকে ১৯৯০ সালে মস্কোয় ডেকে এনে উদ্ধারকর্মীদের এক নতুন সংস্থা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। কালক্রমে সেটা অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ একটি সংগঠনে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ওটাকে জরুরী পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যেরও পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের আগস্টে অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় এবং পরবর্তীকালে ১৯৯৩-এর শাসনতান্ত্রিক সঙ্কটকালে তিনি ইয়েলৎসিনের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিলেন।

ওসেশিয়া, তাজিকিস্তান ও চেচনিয়া বিরোধে শোয়িগু মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার উপস্থিতি সবার জন্য আশ্বস্তকর মনে হতো। ১৯৯৯ সালে ইয়েলৎসিন পুতিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেয়ার সময় শোয়িগুকে ‘ইউনিটি’ নামে এক নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব দেন। এটাই পরবর্তীকালে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টিতে পরিণত হয় যা কিনা এখনকার শাসক দল। ইয়েলৎসিনের ভাষায় শোয়িগু হলেন ‘আমাদের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক।’

পুতিন ক্ষমতা গ্রহণ করার পর তার স্ট্র্যাটেজিস্টর এই অজ্ঞাতকুলশীল নতুন নেতাকে জনগণের কাছে এক উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির করার চেষ্টা চালান। পাদপ্রদীপের আলোটা তখন ছিল শোয়িগুর ওপর। তিনি সেটা পুতিনের অনুকূলে ছেড়ে দেন এবং নিজেই পুতিনের একজন অনুগ্রহভাজনে পরিণত হন। ২০০০ সালে তিনি পুতিনকে একটা কালো রঙের ল্যাব্রাডর কুকুর উপহার দেন যেটা তার অতি প্রিয় কুকুরে পরিণত হয়। শখের বিষয় হোক আর আগ্রহের বিষয় হোক, অনেক ব্যাপারেই পুতিন ও শোয়িগুর মধ্যে মিল লক্ষ্য করা যায়।

আগের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি সাডিয়ুকভ পুতিনের বিরাগভাজনে পরিণত হলে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব শোয়িগুর হাতে দেয়া হয়। তিনি অল্প দিনের মধ্যে সেনাবাহিনীতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করে মনোবল ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। সোভিয়েত পরবর্তী গোটা অধ্যায়ে রুশ সেনাবাহিনী যে সুনাম হারিয়ে ফেলেছিল তা পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়। পুতিন ক্রিমিয়া দখলের সিদ্ধান্ত নিলে শোয়িগু তার সহকারী ওলেগ বেলাভেন্টসেভকে এই অভিযান তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। ক্রিমিয়া অভিযানের মধ্য দিয়ে এক নতুন রুশ সেনাবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে এবং শোয়িগু সেই সেনাবাহিনীর প্রতীক হয়ে দাঁড়ান। পুতিনের পর কে আসবে বা কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে সেই প্রশ্নটি রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তাড়া করে ফিরছে। পুতিনের কোন বিকল্প নেই এই বাস্তবতাই ক্ষমতার ওপর তার বজ্রমুষ্টি থাকার একটা বড় কারণ। তবে উত্তরসূরিদের শর্টলিস্ট করা হলে শোয়িগু সম্ভবত তাতে থাকবেন। কারণ তিনিই হলেন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও জনপ্রিয় রাজনীতিক। স্ক্যান্ডাল নিয়ে পরিহার করে চলেছেন এবং অপেক্ষাকৃত নিঙ্কলুষ হিসেবে তার পরিচিতি আছে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ তার নেই এ কথা তিনি বরাবরই বলে এসেছেন। এটাও তার অনুকূলে যাওয়ার মতো বিষয়।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট