২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২শ’ একর বনভূমি ॥ রোহিঙ্গাদের দখলে

  • কক্সবাজারে বাতিল হয়নি জাতীয় পরিচয়পত্র

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ আরাকান বিদ্রোহী গ্রুপ আরএসও অর্থায়নে মাদ্রাসা-এতিমখানার নামে রোহিঙ্গা জঙ্গীদের দখলে অন্তত ২শ’ একর সরকারী বনভূমি আজ পর্যন্ত দখলমুক্ত করা হয়নি। বনজসম্পদ দখল ও পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করে আরাকান বিদ্রোহী গ্রুপ আরএসও জঙ্গীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে রোহিঙ্গা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে জামায়াতের সঙ্গে কানেকশন রেখে নাশকতা পরিকল্পনার ছক তৈরি করে চলছে। ওসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময় আরএসও জঙ্গী ও জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মীরা সরকারবিরোধী কর্মকা- পরিচালনার বৈঠকও করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার পাহাড় ও সমুদ্র চরাঞ্চল এলাকায় আরএসও অর্থায়নে গড়ে উঠেছে প্রায় ১০টি মাদ্রাসা-এতিমখানা ও রোহিঙ্গা বস্তি। এসব স্থাপনা তৈরি করতে আরএসও ক্যাডাররা অবৈধ দখলে নিয়েছে অন্তত ২শ’ একর বন বিভাগের জমি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে বনজসম্পদ দখলে নিয়ে পরবর্তীতে এক শ্রেণীর স্থানীয় নেতাকে টাকার লোভে ফেলে জঙ্গী সৃষ্টির লক্ষ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আবাসন। ওসব এলাকার বনবিভাগের রেঞ্জ ও বিটকর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এগুলো কয়েক বছর আগের স্থাপনা। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষার দোহাই দিয়ে স্থাপনা শুরু করে জঙ্গীরা। একাধিক দালান-কোটা গড়ে তোলার পর জঙ্গীদের অপকর্মের বিষয়াদি ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয়দের কাউকে চাকরি দেয়া হয় না ওই প্রতিষ্ঠানে।

সূত্র জানায়, ইতোপূর্বে গোয়েন্দা সংস্থা ৪৩৮ রোহিঙ্গার নামে কৌশলে জাতীয় পরিচয়পত্র হাতিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে উচ্চ পর্যায়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র বহনকারী ওই ৪৩৮ রোহিঙ্গা এবং তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ রোহিঙ্গাবান্ধব ৫১ জনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে রোহিঙ্গা জঙ্গীদের। অথচ রোহিঙ্গাদের ভোটার ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দেয়ার পেছনে সহযোগী রোহিঙ্গাবান্ধব ওই ৫১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উচ্চ মহল থেকে ইতোপূর্বে নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট দফতরে পৌঁছানো হয়েছে। এদিকে বিশাল সম্পদ দখল মুক্ত করতে কক্সবাজার বনবিভাগ কোন ধরনের উদ্যোগ না নেয়ায় ওসব স্থানে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে আরএসও ক্যাডাররা তাদের অপতৎপরতা। পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছে চুপচাপ। এতে সাধারণ জনগণের কাছে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। তবে পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সর্দার শরিফুল ইসলাম বলেন, যেহেতু জায়গাটুকু বনবিভাগের, সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে পরিবেশ অধিদফতরকে অবহিত করা হলে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সংস্থা ইতোপূর্বে আরএসও রোহিঙ্গা জঙ্গীদের তালিকা উচ্চ মহলে প্রেরণ করেছে। এদের মধ্যে কিছু কিছু আরএসও জঙ্গী ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছিল। তবে ধান্ধাবাজ কিছু নেতার তদ্বির ও পুলিশের দুর্বল রিপোর্টের কারণে তারা সহজে বেরিয়ে গেছে জেল হাজত থেকে। একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াত-বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সরকার বিরোধী অপকর্মে লিপ্ত ভয়ঙ্কর জঙ্গী ছলাহুল, মৌলভী আবু ছালেহ, মৌলভী মোঃ আনিসসহ বহু রোহিঙ্গা জঙ্গী জড়িত রয়েছে। ধরা পড়ার ভয়ে কতিপয় নেতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অসৎ কর্মকর্তাদের বশে রাখে জঙ্গীরা। সরকারবিরোধী আন্দোলনে নাশকতার ছক তৈরি করে জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীরা সহজে ব্যবহার করে থাকে ডাকু প্রকৃতির ওসব রোহিঙ্গাদের। আফগান ও পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার আয়ুব, আবু ছালেহ, থোয়াইঙ্গাকাটার আরএসও জঙ্গী মৌলানা আনিস, রোমালিয়ারছড়ায় বসবাসকারী মৌলভী শফিক, টেকপাড়ার ইসমাইল, আবু আবদুল্লাহ, মৌলভী আবদুর রহমান, মাস্টার এনাম, আবু সিদ্দিক, রামুতে বসবাসকারী মৌলভী মোয়াজ্জেম হোছাইন ও হাফেজ নায়েমসহ বহু রোহিঙ্গা জঙ্গী জামায়াত-শিবিরকে মদদ জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধাগ্রস্ত করতে জামায়াত-শিবির আরএসও ক্যাডারদের সঙ্গে আরএসও অর্থায়নে পরিচালিত একাধিক মাদ্রাসায় গোপনে মতবিনিময় করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রে প্রকাশ, শহরতলীর লিংকরোড মুহুরিপাড়া, জুমনগর, খুনিয়াপালং, দারিয়ারদীঘির থোয়াইঙ্গাকাটা, শহরের কলাতলী, মরিচ্যা, টেকনাফের শাপলাপুর এলাকায় পাহাড় কেটে এবং সৈকতের ঝাউবন নিধন করে আরএসও ক্যাডাররা নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি করে চলছে। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কক্সবাজার বনবিভাগের একজন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এর আগে গড়ে ওঠা ওসব স্থাপনা উচ্ছেদ কল্পে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের চাপের মুখে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। সূত্র মতে, আরাকানভিত্তিক কিছু জঙ্গী সংগঠন সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের তাদের দলে যুক্ত করে আরও মজবুত করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে আরএসও কমান্ডার ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলভী আবু ছালেহ। এ জন্য জামায়াতে আরাকান, আরএসও, আরইএফ, এআরএনও, এআরইউসহ বিভিন্ন আরাকান বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে একত্রিত করার ব্যবস্থা নিয়েছে প্রথম সারির এ জঙ্গী। এ কাজে অর্থ দিচ্ছে রোহিঙ্গা নেতা ইব্রাহিম আতিক। আরএসও জঙ্গীরা জামায়াতীদের সহযোগিতায় অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের বস্তি তৈরি করে লেদা, শাপলাপুর, শহরের বিভিন্ন ভাড়া বাসায় ও কুতুপালং শিবিরের পাশে বসবাসের সুযোগ করে দিচ্ছে।

জানা যায়, ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলভী আবু ছালেহ আরএসও’র এক পক্ষের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সৌদি ও তুরস্ক থেকে রোহিঙ্গাদের নামে অঢেল টাকা এনে নিজে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে এ রোহিঙ্গা জঙ্গীর রয়েছে কয়েক শ’ কোটি টাকার জমি-জমা ও দালান কোঠা। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর সহযোগিতায় সৌদি আরবে সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে এ জঙ্গীর। পাশাপাশি আরএসও জঙ্গী থোয়াইঙ্গাকাটার মৌলানা মোঃ আনিসের সঙ্গে রয়েছে জামায়াত নেতাদের গভীর সখ্য। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের সহযোগিতায় ১৯৮০ সালে কক্সবাজারে রাবেতা আল আলম ইসলামী হাসপাতালে জামায়াতের মদদে আরএসও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করা হয়। ড. মোঃ ইউনুচ রোহিঙ্গা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) নামে প্রথমে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর পরামর্শে এ সংগঠনটি আরএসও নাম ধারণ করে। ২০১২ সালের জুলাই মাসে উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যে আরএসও’র সঙ্গে আল-কায়দাসহ আরও কয়েকটি জঙ্গী গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে মর্মে বলা ।

তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ইসলামিক রাষ্ট্রে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাওয়ার রিউমারও রয়েছে এলাকায়। নিজেদের কৌশলপত্র নির্ধারণ, মানচিত্র, পতাকা তৈরিসহ নিজস্ব সংবিধানও রয়েছে আরএসও জঙ্গীদের। বর্তমানে বাংলাদেশে আরএসও’র এক অংশের সমন্বয় করে থাকে ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলভী আবু ছালেহ ও তার অন্যতম সহযোগী রোহিঙ্গা জঙ্গী মৌলানা আনিস। লন্ডনে বসে আরএসও প্রধান জঙ্গী নুরুল ইসলাম সংগঠনের অর্থ সংগ্রহের মূল কাজটি করে থাকে বলে তথ্য মিলেছে।