১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তচিন্তার ঝুঁকি ও করণীয়

রাখাল চন্দ্র মিত্র

মুক্তচিন্তা একটি স্বাধীন চিন্তন পদ্ধতি। কারও কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত, মতাদর্শ ও মতবাদ, বিশ^াস অবিশ^াস নির্দ্বিধায় গ্রহণ করার পরিবর্তে সংশয়াত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তার যথার্থতা ও যৌক্তিকতা বিচার বিশ্লেষণ করার পরীক্ষাধর্মী চিন্তন পদ্ধতিই মুক্তচিন্তা। মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষ মাত্রই মুক্তমনা। নির্দ্বিধায়, নির্বিচারে, নিঃসংশয়ে, প্রশ্নহীনভাবে কোন কিছুকে ধনংড়ষঁঃব (চূড়ান্ত) বা ঈড়হংঃধহঃ (ধ্রুবক) রূপে মেনে না নিয়ে অধিকতর যুক্তিগ্রাহ্য বিকল্পের সন্ধান করাই মুক্তচিন্তার মর্মকথা। মুক্তচিন্তা মানুষকে দ্বিমত হতে, দ্বিতীয় বিদ্যায় আস্থা রাখতে, প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে, উত্তর খুঁজতে, যুক্তিহীনতার প্রতিবাদ করতে এবং সমস্ত কিছু অনায়াসে মান্য না করতে শেখায়।

আর একটি কথা মুক্তচিন্তা অনপেক্ষ নয়। আপেক্ষিক। বদ্ধচিন্তার বিপরীতে মুক্তচিন্তার অবস্থান। বদ্ধ জলাশয় যেমন দূষিত বদ্ধচিন্তা তেমনি নির্বোধ (ঝঃঁঢ়রফ)। মুক্তচিন্তা সৃষ্টিশীলতা প্রগতিশীলতা এবং গতিময়তার ধারক ও বাহক। বদ্ধচিন্তা অনুৎপাদক, প্রতিক্রিয়াশীল এবং গতিহীন-স্থবির। বদ্ধচিন্তা ভবিষ্যত দেখে না। পড়ে থাকে সুদূর অতীতে। এক পা এগোনো নয় দুপা পেছানোই তার ধর্ম। মুক্তচিন্তা মানেই সভ্যতার বিকাশ। বদ্ধচিন্তা মানেই সভ্যতার বিনাশ। মুক্তচিন্তা ও গবেষণার ফলে নতুন নতুন তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছে। মানুষের জীবনে নানাবিধ সমস্যা ও প্রশ্নের সমাধান সাপেক্ষে বিশ^ যে আজ এতদূর অগ্রসর হয়েছে তাও এই মুক্তচিন্তার ফসল। সঙ্গে সঙ্গে মানব জীবনের বর্তমান জটিলতা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে মুক্তচিন্তার সাহায্যে। যত পজেটিভই হোক না কেন মুক্তচিন্তা কখনই ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। আজও নেই। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাই তার প্রমাণ। মুক্তচিন্তা চর্চার ফলে সক্রেটিসকে হেমলক পান করতে হয়েছে। যীশু খ্রীস্টকে শূলে চড়তে হয়েছে। গ্যালিলিওকে কারারুদ্ধ হতে এবং জিওনার্দো ব্রুনোকে পুড়ে মরতে হয়েছে। বলাবাহুল্য এসবই ধর্মীয় বদ্ধ চিন্তাচর্চার ফল। এক ধরনের বদ্ধ ধর্মচিন্তা মানুষের সকল সুকুমারবৃত্তি নষ্ট করে দিচ্ছে। সহিষ্ণুতার বদলে অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। মানুষের জীবন ও সভ্যতা অকার্যকর এবং অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে। বিশ^ব্যাপী রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রত্যক্ষ ফল এটি। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়।

অন্ধকার দূর করতে যেমন আলোর প্রজ¦লন জরুরী, বদ্ধচিন্তার মোকাবেলায়ও তেমনি মুক্তচিন্তা চর্চার ব্যাপক প্রসার প্রয়োজন। আলোর রশ্মি জ¦ালিয়েই কেবল অন্ধকার দূর করা সম্ভব। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাত তুলে যারা খুনখারাবীতে লিপ্ত তাদের কঠোরভাবে বিচারের আওতায় আনা উচিত। মুক্তচিন্তা চর্চাকারীদের সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খুনী অপরাধীদের আসকারা দেয়ার প্রয়োজন নেই।

তত্ত্বগতভাবে মুক্তচিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বদ্ধচিন্তা অর্থাৎ উড়মসধ ড়ৎ গুঃয। বদ্ধচিন্তার অধিকারী মানুষরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ এর সমর্থক ও পৃষ্ঠোপোষক। বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিরুদ্ধে আঘাত আসছে এই ধর্মান্ধ, ধর্মব্যবসায়ী, ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের পক্ষ থেকে। সকল মুক্তচিন্তক ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে এদের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সকল প্রকার ধর্মান্ধতা এবং অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে প্রকৃত ধার্মিকদের সোচ্চার হতে হবে। সকল অপপ্রচার ও অপতৎপরতার বিষয়ে জনগণকে শিক্ষিত, দীক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে। অনুভূতিতে আঘাত, ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার ধুয়া তুলে এদেরকে কোন রকমের ছাড় দেয়া যাবে না। অসুন্দরের বিরুদ্ধে সুন্দরের, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর এবং বদ্ধচিন্তার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার লড়াইটা জারি রাখতে হবে যুগপৎভাবে মাঠপর্যায়ে এবং মনোজগতেও।

সবুজবাগ, পটুয়াখালী থেকে