১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশেষ সুবিধার পরও খেলাপী ঋণ কমেনি

  • তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে দুই হাজার ১৯২ কোটি টাকা;###;খেলাপী ঋণ ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা

রহিম শেখ ॥ সহজ শর্তে পুনর্তফসিলীসহ নানান সুবিধা দেয়ার পরও ব্যাংক খাতের খেলাপী ঋণ কমানো যায়নি। তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে দুই হাজার ১৯২ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে খেলাপী ঋণ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকায়। যা বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপী ঋণের পরিমাণ দুই হাজার ১৯২ কোটি টাকা বা দশমিক ২২ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপীতে পরিণত হওয়া ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপীতে পরিণত হওয়া ৫২ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর আগে ব্যাপক পুনর্তফসিলের সুযোগে গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ অনেক কমেছিল। গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর খেলাপী ঋণ ৭ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা কমে ৫০ হাজার ১৫৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। যা ছিল মোট ঋণের ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বরাবরই সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপী ঋণ কিছুটা বেড়ে থাকে। কারণ এই প্রান্তিকে ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর তেমন তোড়জোড় থাকে না। তবে সূত্রগুলো বলছে, পুনর্তসফিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা ঋণগুলো আবার খেলাপী হতে শুরু করেছে। ঋণখেলাপীদের ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাই এর জন্য দায়ী। পাশাপাশি চলমান ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতার জন্য অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা নতুন করে খেলাপী হয়ে পড়েছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে চালু করতে না পারা কারখানার মালিকরাও খেলাপী হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৪ সালের প্রথম দিকের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিশেষ নীতিমালার আওতায় ৫০০ কোটি টাকা ও এর বেশি অঙ্কের খেলাপীদের ঋণ পুনর্গঠনে ছাড় দেয়া হয়। এ সুবিধা পেতে ১৫টি শিল্প গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে। এর মধ্যে ১১টি গ্রুপের ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন বিবেচনায় নেয়া হয়। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। যদিও এই ঋণের মধ্যেও কিছু নিয়মিত ঋণ ছিল। তবে তা চার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। এর আগে একই কারণে ব্যাংকিং খাতে ১২ হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণ পুনর্তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়েছে। এতসব সুবিধার পরও এ খাতে খেলাপী ঋণ কমছে না। মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ মিশন প্রধান রডরিগো কুবেরো বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপী ঋণের হার খুব বেশি। এ ঋণের কারণে গোটা ব্যাংক খাতই চাপে রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাত, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ব্যবস্থা দুর্বল বলেও মন্তব্য করে আইএমএফ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপী ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে খেলাপী ঋণ বাড়ছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপী ঋণের ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ রাষ্ট্র মালিকানাধীন পাঁচটি ব্যাংকের বিতরণ করা। আর ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ খেলাপী ঋণ সৃষ্টি হয়েছে ১০টি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ থেকে। গত মার্চ প্রান্তিকে যেখানে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিল বাড়তির দিকে ছিল, সেখানে পরের তিন মাস বা জুন প্রান্তিক শেষে কিভাবে কমল সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধতনদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, খেলাপী ঋণের আদায় বেশি হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে। আর ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণ কমাতে পারাটা বাংলাদেশ ব্যাংকের সফলতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, এই খেলাপী ঋণের কারণেই ঋণের সুদের হার কমছে না। খেলাপী ঋণ যখন কমে যাবে তখন সুদের হারও এমনিতেই কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপী হয়েছে ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণ ছিল ৫২ হাজার ৫১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। যা ওই সময় পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল। জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর আগের মার্চ প্রান্তিকে খেলাপী ঋণ ডবল ডিজিটের ওপরে ছিল। গত মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৪ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিল।