২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিএমপির তিন কর্মকর্তা সাসপেন্ডের নেপথ্যে-

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে বায়েজিদ থানার ওসিসহ ৩ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্তের নেপথ্যে রয়েছে পুলিশ সদর দফতরের অনিয়ম ও দুর্নীতি। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে বায়েজিদ থানা পুলিশের পক্ষ থেকে। কারণ, পুলিশী অভিযানের বিপরীতে সুপার রিফাইনারি ও মেসার্স রিদোয়ান ট্রেডার্সের মধ্যে ৯ হাজার লিটার তেলের লেনদেনের চালান, নথিগত জটিলতা ও সরকারী ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি উদঘাটন হওয়া। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিক ও অভিযানে আটককৃত কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল গত আগস্ট মাসে।

এজাহারভুক্ত আসামিরা নিজেদের বাঁচাতে ও সরকারী রাজস্বফাঁকি দেয়ার মতো ফায়দা লুটতে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেই পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ দায়ের করে। অসম্পূর্ণ তদন্ত ও অসঙ্গতির মধ্য দিয়ে সদর দফতরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণেই তদন্ত রিপোর্ট পুলিশের বিরুদ্ধে গেছে। এরই জের ধরে গত সোমবার সিএমপির বায়েজিদ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই একরামুল হক ও অভিযানে থাকা এসআই সুজন বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় ঢাকা। এর উপ পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মির্জা জাহিদুল আলম কর্তৃক সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আহমেদ ও চেয়ারম্যান মিসেস লুৎফুন্নেসা আহমেদের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। গত ২৭ জুলাই দায়েরকৃত এ মামলায় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ওই প্রতিষ্ঠানের ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩২৫ লিটার কনডেন্সড-এর বিপরীতে উৎপাদিত ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৮ দশমিক ৭৫ লিটার পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনে গরমিল দেখানো হয়েছে। সে অনুযায়ী রাজস্ব বোর্ডের মূল ভিত্তি ও ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে গড়মূল্য অনুযায়ী ১ কোটি ১২ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৮ দশমিক ২৯ টাকার উৎপাদিত পণ্যের ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বাবদ ১৬ লাখ ৮৬ হাজার ২৯০ দশমিক ৭৪ টাকা সরকারী রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তোলা হয়েছে। দ-বিধির ৪২০/৪০৬ এবং ১০৯ ধারায় বায়েজিদ থানাকে একটি মামলা দায়েরের অনুরোধ জানান দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানাধীন হাটহাজারী রোডস্থ জালালাবাদ এলাকার সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের গোপনে বিক্রিকৃত ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩২৫ লিটার কনডেন্সডের ৫ শতাংশ অপচয় হিসেবে অর্থাৎ ১৬ হাজার ৭৬৬ দশমিক ২৫ লিটার বাদ দিলে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৮ দশমিক ৭৫ লিটার পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন হওয়ার কথা।

অভিযোগ রয়েছে, সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের মালিক পক্ষ যেখানে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ১৭ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকির ও উৎপাদন গোপনীয়তার কারণে এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে যে তদন্ত করা হয়েছে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যেখানে সুপার রিফাইনারি প্রাইভেটের বিরুদ্ধে দুদক নিজেই মামলা দায়ের করেছে সেখানে বায়েজিদ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের অবকাশ থাকে না। এছাড়াও সাময়িক বরখাস্তকৃত ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তা গত ৪ আগস্টের অভিযানের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এই তিন কর্মকর্তাকে সামরিক বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে খোদ বায়েজিদ থানা পুলিশের পক্ষ থেকে।

এ ব্যাপারে সিএমপির এক উর্ধতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেখানে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সরকারী ভ্যাট আত্মসাতের তথ্য প্রমাণ রয়েছে সেখানে উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি অভিযুক্তকে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল। এছাড়াও অভিযানের ভিত্তিতেই ভাউজারসহ চালক আটক ও চালকের তথ্য মতে, জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে মামলা দায়ের করা পুলিশেরই কাজ। এক্ষেত্রে পুনঃ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে দুদকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

বায়েজিদ থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ আগস্ট দুপুর ১২টায় হাটহাজারীর সুপার রিফাইনারি পাইভেট লিমিটেড থেকে মিরসরাইয়ের রিদোয়ান ট্রেডার্সের নিকট (পদ্মা লেখা ভাউজার নং-যশোর-ট-২২৮) চালান নং-৯৯১৬১ অনুযায়ী ৯ হাজার লিটার কনডেন্সড সুপার অয়েল (কেএসও) পাঠানোর গোপন সংবাদ পায় পুলিশ। সে অনুযায়ী দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের সময় অক্সিজেন মোড়ের চেকপোস্ট অতিক্রমকালে পদ্মা অয়েল কোম্পানি নাম লেখা লাল রঙের তেলবাহী ভাউজারকে থামানো হয়। ভাউজারের চালক জাকের ভাউজারটি মিরসরাইয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে ও চালানপত্র দেখায়। কিন্তু উৎপাদিত তেলজাতীয় পদার্থ সরকারী তেল বিপণন কোম্পানিকে না দিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরের কাগজপত্র রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে চালক কোন উত্তর দিতে পারেননি। থানায় ভাউজারসহ জাকেরকে নিয়ে যাওয়া হয়।

পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে জাকের জানিয়েছে, সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আহমেদ, চেয়ারম্যান মিসেস লুৎফুন্নেসা আহমেদ, পরিচালক সাজির আহমেদ ও আসলাম হায়দার, প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানোজর সুব্রত দেব, ভ্যাট ম্যানেজার মহিন উদ্দিন, সুপার গ্রুপ অব কোম্পানির ম্যানেজার দিদারুল আলম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুন উল ইসলাম যোগসাজশ করে তেলজাতীয় পদার্থ দীর্ঘদিন ধরে মিরসরাইয়ের মেসার্স রিদোয়ান ট্রেডার্সের ঠিকানা ব্যবহার করে অন্যত্র পাচার করে আসছে। চালকের এমন তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে উপরোক্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এসআই সুজন বিশ্বাস। থানা সূত্রে আরও জানা গেছে, সেলিম আহমেদ, মিসেস লুৎফুন্নেসা আহমেদ ও সাজির আহমেদের বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানায় ভ্যাট আত্মসাত ও সরকারী রাজস্ব ফাঁকির অপরাধে দুদকের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।