১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লোকসঙ্গীতে মুগ্ধ তিনরাত

  • মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‘আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকশন আইল রে, সবার মাথা খাইলো রে সাধের একতারা কান্দে রে...।’ বাঙালীয়ানার অস্তিত্ব কতটা সঙ্কটাপন্ন সে চিত্র ফুটে ওঠে এ গানে। বাংলা ও বাঙালীর প্রাণের টান, প্রাণের সুর যেই বাউল গান বহি-সংস্কৃতির প্রতাপে হারাতে বসেছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার দরুন অনেক গান হচ্ছে। সে সব গান সাময়িক আনন্দ দিলেও আনন্দের রেশ কতটা সময় বিস্তৃত তা নিয়ে সংশয় থাকে স্বয়ং শিল্পীর মনেই। যেখানে প্রাণ খুলে গাওয়া হয়, ‘যা দিয়েছ তুমি আমায় কী দেব তার প্রতিদান/ মন মজাইলা ওরে বাউলা গান...।’ সেখানে যন্ত্রের যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা শিল্পীর চিৎকারের সমন্বয়ে গাওয়া গানগুলো কতটা ‘গান’ হয়ে ওঠে তা নিয়ে সংশয়ে থাকাই স্বাভাবিক।

আবহমান বাংলার স্পন্দন যাকে বলা হয় মাটির গান, ভাটির গান, বাউল গান। বাউল হওয়ার অন্যতম শর্ত যেন ভোগ সুখ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। সংসারবিমুখ, জগদ্বিবাগী হওয়া। গানের টানে ছুটে বেড়ানো একূল-ওকূল। সেই গানপাগল মানুষদের আজন্ম ভালবাসা, কষ্টসাধ্য নির্মাণ হারাতে বসেছিল বাংলার মুখ থেকে। অন্তর থেকে।

এক সময় গান হয়েছে ব্যবসামুখী। যার দরুন বাউল গানের অবস্থা, নিজ ভূমে পরবাসী। কদরহীনতায় বাউলদের ঘুরতে হয়েছে পথে-প্রান্তরে।

দিন বদলের ধারা লেগেছে সবখানে। সংস্কৃতি অঙ্গনেও। এগিয়ে এসেছে মাছরাঙা টেলিভিশন ও সান ইভেন্ট।

তাদের আয়োজনে বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনব্যাপী ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট।’ দেশসেরা বাউলদের পাশাপাশি এসেছিলেন উপমহাদেশের নামকরা বাউলগণ। দেশের ফরিদা পারভীন, কাঙ্গালিনী সুফিয়া, মমতাজ, অর্ণব এ্যান্ড ফ্রেন্ডস। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ওপারের জগতখ্যাত পবন দাশ বাউল, ইন্ডিয়ান ওশান, অর্ক মুখার্জী, পাপন ও তার ব্যান্ড দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, সাইন জোহর, চীনের ইউনান আর্ট ট্রুপ, আয়ারল্যান্ডের নিয়াভনি, পাকিস্তানের আবিদা পারভীন। বাউল গানের পাশাপাশি ছিল আন্তর্জাতিক লোকজ নৃত্য। লাল-নীল আলোর ঝলকানির সঙ্গে একতারা-দোতারার টুংটাং আওয়াজ, ঢোল-তবলা ও বাঁশির মহনীয় সূরে আচ্ছন্ন করে রাখল তিনটা রাত। বাউল গান নিয়ে এতকিছু, সঙ্গে প্রযুক্তির মিশ্রণ না থাকলে চলে? দেশের তরুণদের বড় একটা অংশ যে বাউলভক্ত। আধুনিকতায় মগ্ন তরুণদের জন্য ছিল সেলফি উৎসব, ওয়াইফাই জোন। উপমহাদেশের নামকরা বাউল শিল্পী ও বাদক হয়ে সেলফি তোলার অনন্য সুযোগ হাতছাড়া করেন নাই অনেকেই।

প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলে মধ্য রাত পর্যন্ত। ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে মঞ্চের পেছনের বড় আকৃতির পর্দা ছিল এলইডি মনিটর। সেখানে গানের সঙ্গে সম্পর্কিত ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট প্রদর্শিত হচ্ছিল সর্বদা। মঞ্চের সামনে বিশাল জায়গাজুড়ে বসে পড়েছে হাজার হাজার দর্শক। পাশেই ভিআইপিদের জন্য বসে উপভোগের ব্যবস্থা। সেখানে দেশসেরা শিল্পী, চিত্রনায়ক, মডেল, খেলোয়াড়, মন্ত্রী প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিবর্গ। কে নেই? যাকে বলে চাঁদের হাট। এর পেছনেই কয়েক হাজার দর্শক ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘গান গিলছেন’ তাঁরা। প্রিয় গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন। প্রিয় শিল্পীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন। তার পেছনেই দাঁড়িয়ে জটলা পাকিয়েছে গানপাগল মানুষ। প্রিয় গানের সঙ্গে শুধু গলা মেলালে যাদের হয়ে ওঠে না। তাদের চাই নাচা। গোল হয়ে নাচছেন আর গাইছেন, ‘তোমার দিল কি দয়া হয় না, মরার কোকিলে, লাল পাহাড়ের দেশে যা, জাত গেলো জাত গেলো বলে...।’ গ্যালারিতে বসেছেন আয়েশ প্রিয় দর্শক-শ্রোতা। আরামপ্রিয় হলেও তারা কেউ কিন্তু খালি মুখে বসে নেই। গাইছেন, তালি দিচ্ছেন, সিটি বাজাচ্ছেন। দেখলে মনে হয়, দীর্ঘদিন পর বাঙালী ফিরে পেয়েছে তার স্বত্বা। প্রাণ ফিরে পেয়েছে ‘বাংলাদেশের ঢোল।’

বৃহস্পতিবার, ১২ নবেম্বর-২০১৫ ছিল অনুষ্ঠানের প্রথম দিন। এদিন পল্লবী ড্যান্স সেন্টারের নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফোক ফেস্ট। ফরিদা পারভিন, চন্দনা মজুমদার ও কিরোন চন্দ্র রায়, অর্ক মুখার্জী, রব ফকীর, শাফি মণ্ডল, লাবিক কামাল গৌরব ও শাইন জোহরদের গানে তন্ময় হয়ে বসে থাকে মুগ্ধ শ্রোতারা। অর্ক এসে ‘বাংলাদেশ ভালো আছো’ বলে দর্শকদের আপন করে নেন। পাপনের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় শেষ হয় প্রথম রাত।

দ্বিতীয় দিন শুক্রবার হওয়ায় বিকেল থেকেই জমতে শুরু করে বাউলপ্রিয় শ্রোতারা। সন্ধ্যায় দেখা যায়, সব প্রবেশ পথে লম্বা লাইন। রাত নয়টার দিকে মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসে, ইতোপূর্বেই আমাদের দর্শকসংখ্যা ৪০ হাজারে পৌঁছেছে। তুমুল করতালির মাধ্যমে উপস্থিতি জানান দেয় প্রায় অর্ধ লক্ষ্য দর্শক। তখনও বাইরে বিশাল লাইন।

দ্বিতীয় দিনে একের পর এক মঞ্চে আসেন বাউলিয়ানা, বাউল বাজন খ্যাপা, নাশিদ কামাল। তাদের পরিবেশনা শেষে মঞ্চে এলেন বাংলার লোকজ গানের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠস্বর আবদুল আলিমের বংশধরগণ। আজগর আলিম, জহির আলিম ও নুরজাহার আলিম। তারা মনে করিয়ে দেন, সর্বনাশা পদ্মা নদীর আবদুল আলিম ও বাংলা গানে তাঁর অবদানকে। আবদুল আলিম পুত্র গানের ফাঁকে বলেন, ‘দেশে জাতীয় কবি আছে, জাতীয় অধ্যাপক আছে, জাতীয় ফুল, ফল, পাখি আছে অথচ জাতীয় শিল্পী নেই।’ তিনি প্রয়াত পিতা আবদুল আলিমকে জাতীয় শিল্পী উপাধিতে ভূষিত করার আহ্বান জানান। এ সময় উপস্থিত দর্শক হর্ষধ্বনির মাধ্যমে প্রস্তাবের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। বারী সিদ্দিকির শ্রোতাপ্রিয় গানের সঙ্গে ছিল বাঁশির সূর। তিনি ফোক ফেস্ট এ তাঁর নতুন বাঁশির অভিষেক ঘটালেন।

রাত তখন প্রায় দশটা। স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। তিল পরিমাণ জায়গা নেই। স্টেডিয়ামের আলোতে হাল্কা কুয়াশা মায়াবী পরিবেশের অবতারণা। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করায় দর্শকের মনে কিছুটা ক্লান্তি ভর করেছে। প্রশান্তি খুঁজতে কেউ লাইন ধরেছে টি-স্টলের সামনে। এমন সময় ঘোষণা আসে, মঞ্চে আসছে অর্ণব এ্যান্ড ফ্রেন্ডস। মুহূর্তেই চিত্র পাল্টে যায়। নতুন উদ্যমে হই-হুল্লোড়। অর্ণব একের পর এক গাইছেন জনপ্রিয় সব গান। তিনি শুধু গান শুরুই করছেন, শেষ করছে দর্শক। গাইলেন, গাওয়ালেন, জয় করলেন অবস্থা। সোনা দিয়া বাঁধিয়াছি ঘর, লাল পাহাড়ির দেশে যা, জাত গেলো জাত গেলো বলি...। গেয়েই ক্ষান্ত হলেন না তিনি, বাজালেন বারী সিদ্দিকি ও মমতাজের সঙ্গে।

মাদকতা কাটতে না কাটতে মঞ্চে এলেন পবন দাশ বাউল। বেশ কিছু অপরিচিত গানের পাশাপাশি গাইলেন, তোমার দিল কি দোয়া হয় না। এরপরে মঞ্চে বাউল সম্রাজ্ঞী মমতাজ। বসে থাকা দর্শক উঠতে বাধ্য হলো। নাচে গানে মাতিয়ে তোলা পরিবেশনায় অর্ণবের সঙ্গে গাইলেন ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি।’ ইয়ান্নান আর্ট ট্রৃপের পরিবেশনার মাধ্যমে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান যখন শেষ হয় তখন রাজধানীর অধিকাংশ মানুষই গভীর ঘুমে।

সংস্কৃতির বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেরাজ হোসাইন, তানজির তুহিনসহ শতাধিক বন্ধুর সঙ্গে ফোক ফেস্টিভ্যালে এসেছে মৌসুমি মোশারফ মৌ। ক্ল্যাসিক্যাল গানের রাজকীয় আয়োজনে মুগ্ধ মৌ জানান, ‘আধুনিক গান শুনলেও বাউল গান যতটা প্রাণে তৃপ্তি আনে অন্য গান তা পারে না। বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। আমাদের আত্মার গানের এতবড় মিলনমেলা সত্যি ভাললাগার।’

অনুষ্ঠানের শেষ দিন বাংলাদেশী ফোক নৃত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। ইসলামুদ্দিন, জলের গান, পার্বতী বাউল, ইন্ডিয়ান ওশান, কাঙালি সুফিয়া, দ্য মাঙ্গানিয়ারস ফ্রম হামিরার উপস্থাপনা ছিল চমক জাগানিয়া। মুগ্ধতা ছড়িয়েছে আবিদা পারভীন। একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক রবিউল করিম মৃদুল মাটির গানের টানে ছুটে এসেছেন প্রতিদিন। অনুষ্ঠান সম্পর্কে মৃদুল বলেন, ‘চমৎকার আয়োজন, ক্ল্যাসিক্যাল ধারার বড় শিল্পীদের এক মঞ্চে দেখা ও তাদের গান শোনা নিঃসন্দেহে বড় ব্যাপার। দূর-দূরান্ত থেকে শ্রোতাদের উপচেপড়া উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাউল গানের সেই সোনালী দিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা ইয়ো ইয়ো জেনারেশন ও যে এভাবে বাউল গানকে ভালবাসতে পারে এই অনুষ্ঠান না হলে তা অজানাই থেকে যেত। তরুণদের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের আরও সময় দিলে ভাল হতো।’ অর্ক মুখার্জীর বাংলা গান নিয়ে বিস্তর গবেষণা ভাললাগার পাশাপাশি পাপনের পরিবেশনা মুগ্ধ করেছে লেখক রবিউল করিম মৃদুলের মতো তিন দিনে আগত লক্ষাধিক দর্শকের। বাংলা গান বিস্তারে এ ধরনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন গানপাগল মানুষ।

কারণ আমাদের ‘আর কিছু চায় মনে গান ছাড়া?’