২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্জন সাকার উদ্ভট উবাচ আর ভুয়া সার্টিফিকেট

দুর্জন সাকার উদ্ভট উবাচ আর ভুয়া সার্টিফিকেট
  • আদালতের মন্তব্য- একটি মিথ্যা ঢাকতে শত মিথ্যা বলা হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপপূর্ণ নানা উদ্ভট মন্তব্য সৃষ্টি করে বার বার আলোচনায় এসেছেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। যুদ্ধকালীন সময়ে চট্টগ্রামের এই ত্রাস যুদ্ধাপরাধ বিচার ব্যবস্থা নিয়ে ষড়যন্ত্রও কম করেননি। এমনকি তার বিরুদ্ধে রায় দেয়ার আগের দিন ‘রায়ের খসড়া’ ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। বিতর্কিত, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আর হাস্যকর কাজকর্ম আর কথাবার্তা ট্রাইব্যুনাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখেননি সাকা চৌধুরী। সর্বশেষ আপীল বিভাগেও ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে তার পক্ষ থেকে। তাও আবার মৃত্যুদ-ের চূড়ান্ত রায়ের রিভিউ পর্যায়ে এসে।

রিভিউ আবেদনে সাকার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট। যে সার্টিফিকেটে সেশন ১৯৭১ দেখানো হয়েছে। তবে প্রশংসাপত্রে সেশন দেখানো হয়েছে ১৯৭০-৭১। এমনকি সার্টিফিকেটে ১৯৭০ লেখার মধ্যে ১৯ সংখ্যাটি বড়, আর ৭০ সংখ্যাটি খুব ছোট। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়া সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্রে পাঞ্জাবের বানানও ভিন্ন। বুধবার সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের শুনানিতে এসব জালিয়াতি উঠে এসেছে। শুনানিতে আদালত সাকার আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে ‘একটি মিথ্যা ঢাকতে শতটা মিথ্যা কথা বলছেন’ বলেও মন্তব্য করেছেন।

শুনানিতে সাকার আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, ‘আপনারা রিভিউ আবেদনে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন, তার মূল সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কিন্তু এ সার্টিফিকেট ট্রাইব্যুনালে বা আপীলের শুনানিকালে জমা দেননি কেন? লন্ডন ও ওয়াশিংটন থেকে সার্টিফিকেট এনে জমা দিয়েছেন, কিন্তু পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মূল সার্টিফিকেট এতদিন আনতে পারেননি কেন?’ আদালত আরও বলেন, ‘এখন যে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন, তাতে উল্লেখ রয়েছে গ্রেডিং সিস্টেমের। কিন্তু ওই সময় গ্রেডিং ছিল না এবং সেমিস্টারও ছিল না। অনার্স ছিল ইয়ারভিত্তিক।’

সাকার আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত আরও বলেন, ‘সার্টিফিকেট আনতে হলে ছাত্রকে সরাসরি আবেদন করে সার্টিফিকেট আনতে হয়। কিন্তু আপনারা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সার্টিফিকেট ওঠানোর জন্য যে আবেদন করেছেন, সে মর্মে কোন তথ্য দিতে পারেননি। সার্টিফিকেট আনতে হলে দূতাবাসের মাধ্যমে আনতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসের কোন সিল-স্বাক্ষর কিছু নেই। এছাড়া আপনাদের দেয়া সার্টিফিকেটটি ইস্যু করা হয় ২০১২ সালে, যেটা সত্যায়িত করা হয় ২০১৫ সালে। ওই সময়ে যদি ইস্যু করা হয়, তবে আপীলের সময় জমা দিতে পারেননি কেন?’

আদালত আরও বলেন, ‘পাকিস্তান থেকে সার্টিফিকেট এনে জমা দিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সংসদে এবং প্রেসিডেন্ট নিজেই বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা যদি কোন সনদ দেন, এমনকি ওই দেশের প্রেসিডেন্টও যদি সনদ দেন, তবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে।’ এ সময় ওই সার্টিফিকেটের আরেকটি অসংলগ্নতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত বলেন, ‘সার্টিফিকেটে ১৯৭১ হিসেবে যে সালটি লেখা হয়েছে, তার ১৯ বড় আকারে লেখা থাকলেও ৭১ সংখ্যাটি ছোট করে লেখা আছে। এতে করে এটি যে জাল সার্টিফিকেট, তা বোঝা যায়। এসব বিবেচনায় বোঝা যায়, সার্টিফিকেটটি ভুয়া।’ সাকার আইনজীবীর উদ্দেশ্যে আদালত আরও বলেন, ‘আপনারা একটি মিথ্যাকে ঢাকতে গিয়ে শত মিথ্যার জন্ম দিচ্ছেন। গঙ্গার জল বঙ্গোপসাগরে গড়াল।’

শুনানিতে এ সময় সাকা চৌধুরীর বরাত দিয়ে তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমি অভিযুক্ত, কিন্তু আমি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এটাই সত্য। কিন্তু আইনজীবীর দুর্বলতার কারণে ন্যায়বিচার বঞ্চিত হতে পারি না। আপনাদের সার্টিফিকেট নিয়ে সন্দেহ হলে দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করতে পারেন।’ এ সময় এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘সার্টিফিকেট নিয়ে জালিয়াতি করেছে। এখনও তাঁরা জাল সার্টিফিকেট নিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

রিভিউ খারিজের পর সার্টিফিকেটের বিষয়ে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া যে ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট আদালতে দাখিল করেছেন সেটা ২০১২ সালে ইস্যু করা। আদালত তা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। ২০১৩ সালে তিনি (সাকা চৌধুরী) যখন সাক্ষ্য দেন তখন এটা উল্লেখ করেননি। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানে আমাদের যিনি হাইকমিশনার আছেন তিনি সেখানে সত্যায়িতও করেননি। কাউন্টার সাইন করতে হয়, সেটা করা হয়নি। আইনের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কথা বলেছেন। আমিও একই সময়ে একই বিভাগের (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ছাত্র ছিলাম। ওই সময়ে সেমিস্টার পদ্ধতি ছিল না। ক্রেডিট ট্রান্সফারেরও সুযোগ ছিল না। এছাড়া সেশন হয় ১৯৭০-৭১। কিন্তু সার্টিফিকেটে দেখা যাচ্ছে সেশন শুধু ১৯৭০। এমনকি যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের জন্য ছাত্রকেই আবেদন করতে হয়। কিন্তু তিনি তো জেলে। তাহলে কিভাবে সার্টিফিকেট আসল?