২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিসে পুলিশের ব্যাপক অভিযান, নারী জঙ্গীসহ নিহত ২

প্যারিসে পুলিশের ব্যাপক অভিযান, নারী জঙ্গীসহ নিহত ২
  • এবার জার্মান চ্যান্সেলরকে হত্যার ছক আইএসের

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ প্যারিসে গত শুক্রবারের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত প্রধান সন্দেহ ভাজনকে ধরতে বুধবার ভোরে শহরটির উত্তরের সেন্ট ডেনিস এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এ সময় দুই জঙ্গী নিহত এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। নিহত জঙ্গীদের মধ্যে একজন নারী রয়েছে। অভিযানের সময় ওই নারীকে ধরতে গেলে তিনি তার শরীরে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেন। এ সময় ফরাসী পুলিশের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানে ব্যবহৃত ডিজেল নামে একটি কুকুর মারা যায়। জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে হত্যার ছক জানতে পেরে বুধবার একটি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করেছে জার্মান সরকার। পাশাপাশি বোমা হামলার হুমকির মুখে এয়ার ফ্রান্সের দুটি বিমানের দিক পরিবর্তন করেছে কর্তৃপক্ষ। খবর বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা ও ডেইলি মেইলের।

স্থানীয় সময় বুধবার ভোর চারটায় সেন্ট ডেনিসে অভিযান শুরু হয়ে একটানা চলে ৭ ঘণ্টা। এ সময় অন্তত ৭ জনকে আটক করে পুলিশ। জঙ্গীদের সঙ্গে পুলিশের প্রচ- গোলাগুলি হয়। ওই আত্মঘাতী নারী গত শুক্রবারের ওই সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয়া এক আইএস জঙ্গীর স্ত্রী বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। শুক্রবারের জঙ্গী হামলায় জড়িত নবম এক ব্যক্তির তথ্য পাওয়ার পর বুধবার তাকে ধরতে এই অভিযান চালায় ফরাসী পুলিশ। পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয়। পুরো এলাকার পাহারায় রয়েছে পুলিশ। ফরাসী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাত ঘণ্টা ধরে চলা এই অভিযান শেষ হয়েছে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল মরোক্কান বংশোদ্ভূত বেলজীয় নাগরিক আবদেল হামিদ আবাউদকে ধরা। মনে করা হচ্ছিল শুক্রবারের হামলার মাস্টারমাইন্ড আবাউদ হয়ত সেন্ট ডেনিসের কোন ফ্লাটে লুকিয়ে রয়েছেন। তবে এই অভিযানে আবাউদ নিহত হয়েছেন কিনা তা পরিষ্কার নয়।

বুধবারের অভিযানের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন সেন্ট ডেনিস এলাকায় চালানো সন্ত্রাসবিরোধী এ অভিযানে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া যে এ্যাপার্টমেন্টে এই অভিযান চালানো হয়েছে, সেখানে এখনও অজ্ঞাত ব্যক্তিরা লুকিয়ে আছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওই এ্যাপার্টমেন্ট থেকে এক নারীকে শরীরে বোমা বেঁধে নিজেকে উড়িয়ে দিতে দেখা গেছে।

বুধবার সেন্ট ডেনিসের রুদিলা এলাকার চার পাশের রাস্তা বন্ধ করে এই অভিযান চালানো হয়। সশস্ত্র পুলিশের সঙ্গে অভিযানে যোগ দেয় ট্রাকভর্তি সৈন্য। অভিযানের সময় বিস্ফোরণ ও প্রচুর গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, আমি ক্রমাগত বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনেছি। মনে হচ্ছিল যেন আতসবাজি ফাটছে। অপর একজন জানান, তিনি গ্রেনেড এবং বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনেছেন। তিনি বলেন, জঙ্গীরা এক ঘণ্টা ধরে অবিরাম গুলি চালিয়েছে। গ্রেনেড ছুড়েছে। কালাশনিকভ ব্যবহার করেছে। এই শহরটিতে বিভিন্ন ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের লোক বাস করে।

একই দিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্যারিসমুখী এয়ার ফ্রান্সের দুটি বিমান বোমা হামলার হুমকির মুখে কয়েক ঘণ্টার জন্য গতিপথ পরিবর্তন করে অবতরণে বাধ্য হয়। মঙ্গলবার দুটি বিমানই নিরাপদে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবতরণ করে। প্রথমে ফ্লাইট ৬৫, এয়ারবাস এ-৩৮০ যুক্তরাষ্ট্রের লসএঞ্জেলেস থেকে প্যারিসে যাওয়ার সময় হুমকির মুখে দিক পরিবর্তন করে সল্টলেক সিটিতে অবতরণ করে। এ বিমানটিতে ৪৯৭ জন যাত্রী। অপর একটি ফ্লাইট ৫৫, বোয়িং ৭৭৭ ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে ডালাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্যারিসে যাওয়ার সময় একই কারণে কানাডায় নোভা স্কটিয়ার হালিফ্যাক্স বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ বিমানটিতে যাত্রী ছিল ২৬২ জন। এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে এয়ার ফ্রান্স জানায়, দুটি বিমানই ওড়ার পর হুমকি পায়। তারপরই বিমান দুটিকে অবতরণ করানো হয়। বিমানে বিস্ফোরকের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়েছে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ তিন মাসের জন্য জরুরী অবস্থা জারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার একটি বৈঠক আহ্বান করেছেন। এরপর সিদ্ধান্ত ভোটাভুটির জন্য দেশটির আইনপ্রণেতাদের হাতে তুলে দেয়া হবে। জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে হত্যার আইএস ছক নিয়ে হ্যানোভার স্টেডিয়ামের এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়। বুধবার খেলা শুরুর ৯১ মিনিট আগে বাতিল করে দেয়া হয় জার্মানি-হল্যান্ড প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি। জার্মানির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করে। অবশ্যম্ভাবী জঙ্গী হানার আশঙ্কা করেন। তিনি জানান, আইএস ইউরোপের আরও নানা জায়গায় হামলার ছক কষেছে। ফ্রান্সের পরেই জার্মানি আইএসের টার্গেট। ম্যাচ বাতিল বিষয়ে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেয়া খুব কঠিন ছিল। কিন্তু, বাতিল না করে কোন উপায় ছিল না। তিনি জানান, হ্যানোভারে জঙ্গী হানার ছক যে তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। অনেক সূত্র থেকে এই আভাস মেল। আর তাদের প্রধান টার্গেট ছিলে মেরকেল।

প্যারিসে হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত বেলজিয়ামের সালাহ আবদেসালামকে তিনবার ধরার সুযোগ পেয়েছিল ফরাসী পুলিশ। কিন্তু প্রতিবারই পুলিশ তাকে চলে যেতে দিয়েছে। সন্দেহভাজন হিসেবে আটক মোহম্মদ আমরির আইনজীবী জাভিয়ে কারেত্তি এ কথা জানিয়েছেন। প্যারিস হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আবদেসালাম অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। প্যারিস হামলার পর ওই রাতেই তাকে তিনবার ধরার সুযোগ পেয়েছিল ফরাসী পুলিশ। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়। যে গাড়িতে করে আবদেসালাম পালাচ্ছিলেন, সন্দেহভাজনদের ধরতে ব্যাপক অভিযান চালানোর সময় সেটি তিনবার থামিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু গাড়ির যাত্রীই যে পরে হামলার অন্যতম সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত হবে সে বিষয়ে পুলিশ কোন ধারণাই করতে পারেনি। বেলজীয় গণমাধ্যম আরটিবিএফকে এমন তথ্যই জানিয়েছেন কারেত্তি।

তিনি বলেন, হামলার দুই ঘণ্টা পর তার মক্কেল আমরিকে বন্ধু আবদেসালাম ফোন করে বলেন, তার নিজের গাড়িটি ভেঙ্গে গেছে, তাই আমরি তার গাড়িতে করে আবদেসালামকে ব্রাসেলসে দিয়ে আসতে পারবেন কিনা।

আবদেসালামের হামলার সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকতে পারে তা সন্দেহই করেননি আমরি। নিজে গাড়ি চালিয়ে বন্ধুকে ব্রাসেলসে পৌঁছে দিয়ে আসেন তিনি। এ সময় পথে তিনবার পুলিশ তার গাড়িটি থামালেও যাত্রী আবদেসালামকে চিহ্নিত করতে পারেনি। আমরি এখন পুলিশ হেফাজতে আছেন, আর আবদেসালাম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

প্যারিসে শুক্রবার রাতে চালানো ওই ভয়াবহ হামলায় ১২৯ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় চার শতাধিক। এদের মধ্যে প্রায় ৯০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।