২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দ্রুত রায় কার্যকর দাবি সর্বস্তরের মানুষের

  • প্রজন্ম চত্বরে উল্লাস

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সর্বস্তরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব মহলেই রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানানো হয়েছে। বিশিষ্টজনরা বলছেন, ঘাতকদের দ্রুত ফাঁসি দেয়া হলে দেশে অস্থিরতা থামবে। অন্যথায় রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াতসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী নাশকতা চালাতে পারে। এদিকে দুই মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসিকে কেন্দ্র করে কেউ যেন নাশকতা চালাতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানানো হয়েছে। রায়ের পর গণজাগরণ মঞ্চ, প্রগতিশীল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, ঢাকা মহনগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয়।

দ- দ্রুত কার্যকর করুন- ইমরান ॥ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ হওয়ায় তাদের দ- কার্যকরে সরকার আর কালক্ষেপণ করবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার পর পর দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় বহালের খবর এলে উল্লাসে ফেটে পড়েন মঞ্চের কর্মীরা। তারা ভি চিহ্ন দেখিয়ে রায়কে স্বাগত জানান। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। কেউ কেউ কেঁদে ফেলেন। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ দ- কার্যকর করার আন্দোলন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত যেসব সতীর্থকে হারাতে হয়েছে তাদের কথাও স্মরণ করেন তারা।

রিভিউকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান নেয় গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে একের পর এক সেøাগান দিতে থাকেন। রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার বলেন, রিভিউ খারিজের ফলে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর দ- কার্যকরে আর আইনী বাধা নেই। নিয়ম অনুযায়ী তারা এখন কেবল নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে সরকার দ- কার্যকর করবে।

ডাঃ ইমরান বলেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। আপীল বিভাগ ও রিভিউতে রায় প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ায় দেশের মানুষের মধ্যে একটা হতাশা ছিল। রিভিউ নিষ্পত্তি হওয়ায় সে হতাশা কেটে গেল। রিভিউ খারিজের খবরে মঞ্চের নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ঘুরে পুনরায় শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। রায়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র বিচার বিভাগের ‘তৎপরতার নজির’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রায় কার্যকরে আর কোন আইনগত বাধা নেই। আমরা প্রত্যাশা করছি, যেহেতু পরোয়ানা জারি হয়ে আছে, তাই যত শীঘ্র সম্ভব দ- কার্যকর করা হবে।

রায় কার্যকর রুখতে পারবে না- কামরুল ॥ কোন দেশী-বিদেশী শক্তি সাকা-মুজাহিদের এই ফাঁসির রায় কার্যকর রুখতে পারবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম- সাধারণ সম্পাদক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। বুধবার আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুজাহিদ-সাকার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আনন্দ মিছিলের পূর্বে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। কোন দেশী-বিদেশী শক্তি চাপ সৃষ্টি করে রায় কার্যকরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। এ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, এই রায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের পাশাপশি ১৬ কোটি মানুষ শান্তি পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে রায়কে স্বাগত জানাই। এখন শুধু রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছি। রায় প্রকাশের পর পরই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা আলাদা আলাদা আনন্দ মিছিল বের করে।

মানুষ ন্যায়বিচার পেয়েছেন- মেনন ॥ এদিকে বেসরকারী বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায়ের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের মানুষ আজ ন্যায়বিচার পেলেন। তিনি বলেন, এই দুই যুদ্ধাপরাধী মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছেন, ফাঁসির রায়ের মধ্য দিয়ে তারা তার জবাব পেয়েছেন।

সিপিবির সন্তোষ ॥ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন দেশের সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেয়ায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সন্তোষ প্রকাশ করেছে। পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এক বিবৃতিতে এই রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে সিপিবির নেতৃবৃন্দ বলেন, একাত্তরে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরী মানবতার বিরুদ্ধে যে জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেছিল, তাতে তাদের মৃত্যুদ- হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই রায় ন্যায়বিচারের পক্ষে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। এই রায়ে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও সন্তোষ প্রকাশ করছি।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় যাতে রাষ্ট্রপতি লাঘব বা মওকুফ করতে না পারেন, তার জন্য সংবিধান সংশোধনের গণদাবি দ্রুতই সরকারকে মেনে নিতে হবে। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে, আদালত কর্তৃক ঘোষিত যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াত-শিবিরকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।

বিশিষ্টজনরা যা বললেন ॥ রায়ের পর সংবাদ মাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক বলেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের যে সম্ভাবনা তৈরি হলো তাতে দেরিতে হলেও দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হলো। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন ভাষাসংগ্রামী কামাল লোহানী। তিনি বলেন, এ রায়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং আমাদের সংগঠন উদীচী আনন্দিত। আমরা মনে করি এ রায়ে শহীদ পরিবারসহ সমগ্র জাতি একটা কালো অধ্যায় থেকে মুক্তি পেল। তবে সার্বিক বিবেচনায় অনতিবিলম্বে রায় কার্যকর করতে হবে।

লোকগবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, এই রায়ে গোটা জাতি আনন্দিত। তারা যে অসংখ্য মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা ও নির্যাতন করেছে এ জন্য এই রায় তাদের প্রাপ্য ছিল। বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, একাত্তরে যাদের পরিবার- পরিজনকে হত্যা করেছে কিংবা অসহায়ত্বের শিকার হয়েছে সেসব পরিবারের উত্তরাধিকাররা খুশি হবে এ রায়ে। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু যে বিচার কাজ শুরু করেছিলেন তা এখন সমাপ্তির পথে। সে কারণে জাতিগতভাবে আমরাও আনন্দিত। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা তো এটাই প্রত্যাশা করেছিলাম। সেটাই হলো। এখন আমাদের দাবি হলো-এ রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্তুষ্টি ॥ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ বহাল থাকায় আনন্দ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন অনেকেই। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের এ আদেশের খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পরার পর পরই উল্লাসের ঝড় ওঠে ফেসবুকে। অনেকে মিষ্টি ও বিরানির ছবি সংযুক্ত করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ফেসবুক ভরে গেছে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে। রায়ের পর অনেকে পোস্ট করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে লেখা ছড়া-অন্তমিল। সাকা-মুজাহিদের হাসিযুক্ত কার্টুন সংযুক্ত করে লেখা ‘মায়ের বক্ষ ঝাঁঝরা করিয়া হাসিয়াছো অট্টহাসি, এবার হাসিবে বাঙালী জাতি দেখিয়া তোমার হাসি’ ব্যানারটি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। শেয়ার দিচ্ছেন হাজার হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী।

নির্বাচিত সংবাদ