১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টলাবাসী ক্ষণ গুনছেন কলঙ্কমুক্তির

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির ॥ বাঙালীর প্রাণের স্বাধীনতার চরম বিরোধিতাকারী, মুক্তিকামীদের গণহত্যা, পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর অন্যতম নায়ক চট্টগ্রামের রাউজানের সাকা চৌধুরীর সকল ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, লবিস্ট নিয়োগ করে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহতকরণের অপপ্রয়াস সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির আদেশ বহাল রাখার বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনটিও বুধবার সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে নাকচ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পরেও স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এই নরঘাতক এ সাকা এক ধরনের জয়মাল্য নিয়েই এদেশ দাবড়ে বেড়িয়েছেন। হয়েছিলেন মন্ত্রীও। স্বাধীনতাবিরোধী সকল শক্তির প্রধান এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে দিনের পর দিন প্রকাশ করে গেছেন চরম দাম্ভিকতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন সায়াহ্নে এসে নিজের বিচার নিজেই প্রত্যক্ষ করলেন। আর কোন পথ তার জন্য খোলা নেই। যেটি আছে তা হলো রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষা প্রার্থনা। কিন্তু ক্ষমা পাওয়ার লেশমাত্র সম্ভাবনাও যে নেই তা আগেভাগেই দেশের ১৬ কোটি মানুষ নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারেন। তার চোখের সামনে এখন ঝুলছে ফাঁসির রশি। অপেক্ষা শুধু ঠিক কখন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে আর গলায় গলায় অপরাধ আর অপরাধে পূর্ণ দেহটি কখন নিথর হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের রাউজানের বাসিন্দা সাকাচৌ। বুধবার আপীল বিভাগ তার রিভিউ আবেদনটি খারিজ করে দেয়ার সংবাদটি প্রচার হওয়ার পর থেকে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নেমে আসে স্বস্তি। চাঁটগাইয়ারা অপেক্ষা করছেন সাকার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার ক্ষণ থেকে কলঙ্কমুক্ত হওয়ার দিনটির জন্য। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের পরিপূর্ণ লিস্ট যদি হয়ে থাকে বা ভবিষ্যতে করা হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় সাকাচৌই থাকবেন এর শীর্ষে। নিজ বাড়ি রাউজান এবং আশপাশ উপজেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে হেন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। এরপরও দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সার্কাসের ক্লাউনের মতো স্বাধীন দেশে তিনি রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছেন, যে পতাকার বিরোধিতা করেছেন সেই পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে ঘুরে বেড়িযেছেন। যা মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, মুক্তিকামী অযুত মানুষকে শুধু নীরবেই কাঁদিয়েছে। কারণ, প্রশাসনযন্ত্র সাকাকে শেল্টার দিয়ে পুরো বাঙালী জাতিকে উপহাসই করেছে শুধু। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে দাম্ভিক সাকার দম্ভ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল।

সাকা কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি তার শেষ পরিণতি এমনটি হবে। নিজ ও নিজ পরিবারের বিভিন্ন সদস্য ও সাঙ্গোপাঙ্গদের অপকর্ম, কুকর্মসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের মূর্ত প্রতীক সাকাচৌ বিচার চলাকালেও বিচারকসহ বাঁকা ঠোঁটে যাকে ইচ্ছা তাকেই টার্গেট করে কটূক্তি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। বুধবার আপীল বিভাগ তার রিভিউ আবেদন নাকচ করে দেয়ার পর এখন নিশ্চয় তার হুঁশে পরিবর্তন ঘটতে পারে। চিন্তা ভাবনায় অতীতের চিত্র ভেসে উঠতে পারে। গণহারে মানুষ হত্যা, গুম, অমানবিক পৈশাচিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মের চিত্র এখন থেকে তার মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকবে। বছরের পর বছর ভেবেছিলেন পার পেয়ে গেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। হওয়ার কোন সুযোগ আর নেই। শেষ সুযোগ অর্থাৎ প্রাণভিক্ষার কথা আইনে যা আছে তা একটি প্রক্রিয়া মাত্র। এ প্রক্রিয়ার অবসানের সঙ্গে সঙ্গেই কালো যমটুপি পরে সাকাকে দাঁড়াতে হবে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর সেই পাঠাতনে। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে রেখে প্রাণদ-নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ রয়েছে। ফাঁসির রশি তার গলায় যখন ঝুলানো হবে তখন হয়ত তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাবেন পাপ যে বাপকেও ছাড়ে না। পরকালে সৃষ্টিকর্তার বিচারের আগেই দুনিয়ার আদালতে চরমভাবে ঘৃণিত হয়ে ফাঁসির রশিকে আলিঙ্গন করে তার নিজ দেহটি হয়ে যাবে নিথর।

এ ক্ষেত্রে নতুন করে বলতেই হয়, শাবাশ বাংলাদেশ, পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে চারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী চক্রের কাছে এদেশ মাথা নোয়ায়নি, আগামীতেও নোয়াবে না-এ বিশ্বাসই প্রোথিত হয়ে আছে স্বাধীনতার সপক্ষের বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে। এ নরঘাতক সাকাকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন স্বৈরাচার এরশাদ। পরে মন্ত্রীর মর্যাদায় বেগম খালেদা জিয়া বানিয়েছিলেন আইন ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা। এখন দাবি উঠতে শুরু করেছে এ নরঘাতককে দিয়ে যারা জাতীয় পতাকা এবং পবিত্র সংসদকে অবমাননা করেছিল তাদের বিচার।

আপীলের রায়ে ফাঁসির দ- বহাল থাকার পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের (হুকা) চৌধুরী বেশ দম্ভের সঙ্গে বলেছিলেন, আমার বাবা শেষ পর্যন্ত ঠিকই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেরিয়ে যাবেন। হুকা চৌধুরীর এহেন বক্তব্যের পর সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের রায় কেমন হয় তা নিয়ে জনমনে এক ধরনের উৎকণ্ঠার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ধাপেও দ- বহাল থাকায় দূর হয়েছে সেই উৎকণ্ঠা। সাকার ফাঁসি হবে এ নিয়ে এখন আর কোন সংশয় নেই।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যত আসামি বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন সাকা চৌধুরী। স্বাধীনতা বিরোধী এই ঘাতকের কোন অনুতাপ ছিল না একাত্তরের অপরাধের জন্য। বরং সব সময়ই স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে দম্ভ করেছেন। শুধু তাই নয়, তার পিতা ফকা চৌধুরী একজন রাজাকার ছিলেন বিধায় তিনি গর্ব করতেন। কোন একদিন এ নরঘাতকের বিচার হবে এমন বিশ্বাস তার মোটেই ছিল না। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিচারকদের উদ্দেশ্য করে সাকা চৌধুরী উচ্চারণ করেছিলেন নানা অশ্রাব্য ভাষা। সেই রাজাকারের দ- বহাল থাকায় অবসান হয়েছে সকল অনিশ্চয়তার।

মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পরও স্বাধীন বাংলাদেশে সাকা চৌধুরী যে ভাষায় দম্ভোক্তি করে চলেছিলেন তাতেই পরিষ্কার যে, তরুণ বয়সে দোর্দ- প্রতাপশালী এই সাকা চৌধুরী কী-না করেছিলেন। তার হত্যাযজ্ঞের করুণ সাক্ষী হয়ে আছে রাউজানের ঊনসত্তরপাড়া, জগৎমল্লা পাড়া, সুলতানপুর ও চট্টগ্রাম নগরীর গুডস হিল। মুক্তিযুদ্ধে রাউজানেই সবচেয়ে বেশি হয়েছে সাকা বাহিনীর তা-ব। সেই তৎপরতা ছিল অত্যন্ত নারকীয়। সাকা বাহিনী হত্যা করে বিশিষ্ট দানবীর ও শিক্ষানুরাগী, কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে। প্রার্থনারত এই সমাজ সেবককে টেনে এনে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর প্রধান অপরাধ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর নৃসংশ হত্যাযজ্ঞের পর ড. আনিসুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে সপরিবারে কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে এনে আশ্রয় দেয়া।

নূতন চন্দ্র সিংহের পুত্র প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিমের কাছে জানিয়েছিলেন তার বাবাকে রক্ষার চেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের ভূমিকার কথা। তিনি জানান, আবদুল্লাহ আল নোমান (যিনি বর্তমানে একজন বিএনপি নেতা) বাবাকে বলেছিলেন, দাদা আপনি দেশ ছেড়ে চলে যান। আমরা সীমান্ত অতিক্রমের সব ব্যবস্থা করে দেব। যদি চলে না যান তাহলে সাকা চৌধুরীর লোকেরা আপনাকে হত্যা করবে। কিন্তু বাবা বলেছিলেন, আমি আমার জন্মভূমি এদেশ ও এ গ্রাম ছেড়ে যাব না। শেষ পর্যন্ত সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতেই বাবাকে হত্যা করা হয়।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা ছিল সাকা বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব। সেখানে জগৎমল্লপাড়া এবং ঊনসত্তরপাড়ায় রয়েছে একাত্তরের এ বাহিনীর হাতে নৃসংশভাবে নিহতদের নামের তালিকা সংবলিত স্মৃতিসৌধ। আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সাকা চৌধুরী এমনকি তার পিতা ফকা চৌধুরীর নির্বাচনী খেলায় সব সময় পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল সংখ্যালঘুরা। প্রতিবারই নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে চলত ভয়ভীতি। বলা হতো, আপনাদের ভোট আমি পেয়ে গেছি, ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আর দরকার নেই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে রাউজানের নির্যাতিত সেই মানুষগুলো আকুতি জানিয়ে বলেছিল, ১৯৭১সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও রাউজান এখনও স্বাধীন হয়নি। সাকা চৌধুরীর ক্যাডাররা এখনও রাউজানকে নানা কৌশলে কব্জা করে রেখেছে। আপনারা এ পিশাচের বিচারের ব্যবস্থা করে রাউজানকে স্বাধীন করুন। সেই চূড়ান্ত রায় হয়ে গেছে। এখন শুধু রায কার্যকর দেখার প্রতীক্ষা।