২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা...

ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা...
  • সেই পতাকাবাহী যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম ফাঁসি

মোরসালিন মিজান ॥ স্বাধীনতা- সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন,/ স্বাধীনতা- সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।/ ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা...। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন। তারুণ্যের কবি খুব আবেগী, ততোধিক বলিষ্ঠ উচ্চারণে জাতীয় পতাকা অর্জনের ইতিহাস বর্ণনা করেছিলেন। অথচ বাঙালীর শৌর্য-বীর্যের প্রতীক এই জাতীয় পতাকা উঠেছিল যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে! সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাণের পতাকা! অনেকদিন এই কলঙ্ক লেগেছিল জাতীয় পতাকার গায়ে। বুধবার এই দুই হায়েনার পূর্বের ফাঁসির রায় সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখে। এর ফলে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুধু নয়, জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করা সম্ভব হলো।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই পতাকা বাঙালীর গৌরবের ইতিহাসকে ধারন করে। উর্ধে তুলে ধরে। অথচ সেই পতাকা নির্মম-নিষ্ঠুর আক্রমণের শিকার হয়েছিল। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয়েছিল বাঙালীর রক্তেভেজা জাতীয় পতাকা। বঙ্গবন্ধুর সরকারের নির্দেশে পতাকার মাপ, রঙ ও তার ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান। সেখানেও মুখ্য হয়ে ওঠেছিল তিরিশ লক্ষ্য প্রাণ বলিদানের ইতিহাস। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাটি লাল সবুজের মিশেলে তৈরি। সবুজ আয়তক্ষেত্রের মধ্যে লাল বৃত্ত। সবুজ রঙ বাংলাদেশের প্রিয় প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য নির্দেশ করে। একইসঙ্গে রঙটি তারুণ্যের প্রতীক। আর বৃত্তের লাল রঙে দৃশ্যমান হয় একসাগর রক্ত। স্বাধীনতার উদীয়মান সূর্য হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয় পতাকার লাল বৃত্তটিকে। এই পতাকাকে কোনদিন স্বীকার করেনি স্বাধীনতা বিরোধীরা। এর পরও এদের গাড়িতেই তুলে দেয়া হয় পতাকা। যাদের সঙ্গে যুদ্ধে লড়ে পতাকা, সেই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ছিলেন সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। গাড়িতে-বাড়িতে পতাকা পেয়েছিল দুই বাংলাদেশ বিরোধী।

নিকট অতীত বলে, ২০০১ সালে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের সঙ্গে কোয়ালিশন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া সে কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। শিশুটিও যে মুখগুলো যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জানে, অভিশপ্ত সেসব মুখ থেকে সরকারের মন্ত্রী নির্বাচন করেন চারদলীয় জোট নেত্রী। গোটা জাতিকে হতভম্ব করে দিয়ে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য করা হয় জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে। একাত্তরের আরেক খুনী রাজাকার পুত্র ও বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা নির্বাচিত হয়। শপথ গ্রহণের পর তিনজনের গাড়িতেই ওঠে যায় জাতীয় পতাকা। সে কী করুণ দৃশ্য! কী যে অন্যায়! অপমান! নয় মাস বাঙালী নিধনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা হায়েনাদের বাড়িতে সকাল বিকাল পতাকা উড়ে। এদের পতাকাবাহী গাড়ি দেখে স্যালুট ঠুকতে বাধ্য হন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এভাবে নিষ্ঠুর অবমাননার স্বীকার হয় জাতীয় পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে চলে সাকা মুজাহিদরা। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায়- এ-যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী,/স্বাধীনতা-একি তবে নষ্ট জন্ম?/এ-কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?/জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন...। দেশমাতা এই বেদনায় গুমড়ে কাঁদছিল। বার বার আঁচলে চোখ মুচছিল। আর তার পর বুধবারের রায়। এদিন সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল রাখার চূড়ান্ত আদেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত। এখন রায় কার্যকরের অপেক্ষা। সব ঠিক থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই রশিতে ঝুলিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হবে পতাকা অবমাননাকারী দুই হায়েনার। আর তা হলে জাতীয় পতাকা ব্যবহারকারী কোন যুদ্ধাপরাধীর প্রথম ফাঁসি দেখবে জাতি। এ কারণে আলাদা কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করে আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম।

এ প্রসঙ্গে ঘাতক দালাল নির্র্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, জাতীয় পতাকা বাঙালীর আত্মপরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের যে অর্জন, জাতীয় পতাকায় তা বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়। সেই পতাকাকে সাকা মুজাহিদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয়েছিল। সেদিনের কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। দুই অবমাননাকারীর ফাঁসির মধ্য দিয়ে পতাকা সেই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবে বলে মনে করেন তিনি। একই প্রসঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, জাতির জনককে হত্যার পর বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মন্ত্রী হয়েছিলেন সাকা মুজাহিদ। বিএনপি সরকার মন্ত্রী করলেও বাংলার জনগণ এদের ক্ষমা করেনি। খুনী, ধর্ষক ও অগ্নিসংযোগকারী হিসেবেই বিচার হয়েছে। নিজামীর গাড়িতেও পতাকা উড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই ঘাতকের রায়ও দ্রুত কার্যকর করার মধ্য দিয়ে ঘুরে দায় মুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ। একই বিষয়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় পতাকা বিপুল শক্তির উৎস। এই পতাকা অপমানিত হলে আমাদের নয়ন জলে ভাসে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সেদিকে সকলকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।