১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অটোরিক্সা মালিকরা বাড়তি জমা আদায় করছেন

রাজন ভট্টাচার্য ॥ চালকদের থেকে বাড়তি জমা আদায় করছেন অটোরিক্সা মালিকরা। সরকারী নিয়ম নীতির কোন তোয়াক্কাই করছেন না তারা। একদিনে ৯০০ টাকার পরিবর্তে সর্বোচ্চ নেয়া হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। নিয়ম ভেঙ্গে দুই শিফটে দেয়া হচ্ছে গাড়ি ভাড়া। এরকম অন্তত ২০টি গ্যারেজ চিহ্নিত করেছেন পরিবহন নেতারা। ইতোমধ্যে রাজধানীতে চলা দুই সহস্রাধিক গাড়ি থেকে বাড়তি জমা রাখার অভিযোগ মিলেছে। অটোরিক্সা মালিক ও চালকদের অনিয়ম চিহ্নিত করতে মন্ত্রণালয়ের গঠিত টাস্কফোর্সের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় পরিবহন মালিকদের নৈরাজ্য কমছে না। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার কথা।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এক নবেম্বর থেকে অটোরিক্সার জমা ও ভাড়া বৃদ্ধি করেছে সরকার। গাড়ি প্রতি জমা নির্ধারণ করা হয়। তেমনি চালকদের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক মালিক সরকার নির্ধারিত জমার হার মানছেন না। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত মালিকের বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। মালিকদের জমা নৈরাজ্য দেখভাল করতে ঢাকা মহানগর সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ২৪ সদস্যের তিনটি টিম গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বিআরটিএ’র কাছে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর ৮৪ নং ধোলাইপাড়ের গ্যারেজ মালিক হুমায়ুন। তিনি অন্তত ৪৫টি গাড়ি দুই শিফটে প্রতিদিন ভাড়া দিচ্ছেন। সরকারী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না মোটেই। সকালের শিফটে নিচ্ছেন ৯৪০টাকা আর বিকেলের শিফটে নিচ্ছেন ৬০০টাকা। একটি অটোরিক্সা থেকে প্রতিদিন বাড়তি নেয়া হচ্ছে ৬৪০টাকা। মীরহাজিরবাগের ৯৮ নম্বর বাড়িতে রয়েছে বাহাউদ্দিন মহাজনের গ্যারেজ। এখানে আছে ৬০টি গাড়ি। ৮০০ ও ৬৫০ করে দুই শিফটে প্রতিদিন গাড়ি প্রতি নেয়া হচ্ছে এক হাজার ৪৫০টাকা। একই এলাকার নতুন রাস্তা সংলগ্ন ৩৩/ক/১ নম্বর বাড়িতে আলামিন মাস্টারের গ্যারেজে আছে ৪২টি অটোরিক্সা। ৮০০ ও ৭০০ টাকা করে দুই শিফটে একটি গাড়ি থেকে আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৫০০টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর ১০১ বড়বাড়ির ১ নং গেট এলাকায় আজম মহাজনের গ্যারেজে রয়েছে ২৫টি গাড়ি। সকাল সন্ধ্যায় প্রতিটি গাড়ি থেকে আদায় করা হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। সকালের শিফটে নেয়া হচ্ছে এক হাজার ১৫০টাকা আর বিকেলের শিফটে নেয়া হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা। বড়বাড়ির এক নম্বর গেটের মতিন হোসেনের গ্যারেজ থেকে ৩৫টি অটোরিক্সা নিয়মিত চলাচল করে। ৮০০ ও ৬৫০টাকায় দুই শিফটে প্রতিটি গাড়ির ভাড়া দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ৯০০ টাকার পরিবর্তে গাড়িপ্রতি নেয়া হচ্ছে এক হাজার ৪৫০টাকা।

২১/বি, পশ্চিম ধোলাইপাড়ের তোফাজ্জেল মহাজনের বিরুদ্ধে অটোরিক্সাপ্রতি বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ মিলেছে। তাঁর তত্ত্বাবধানে চলছে ১০২টি গাড়ি। এরমধ্যে সকালের শিফটে নেয়া হচ্ছে ৮৫০টাকা ও রাতের শিফটে আদায় করা হচ্ছে ৭০০ টাকা। এক হাজার ৫৫০টাকা প্রতিদিন গাড়ি প্রতি নেয়া হলেও গ্যারেজ মালিক এটা অন্যায় তা মানতে নারাজ।

১০/১, মীরহাজিরবাগের জাহাঙ্গীরের গ্যারেজ থেকে ৩৮টি অটোরিক্সা চলাচল করছে। ৮০০ ও ৬৫০ টাকা মিলিয়ে সকাল সন্ধ্যায় গাড়িপ্রতি আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৪৫০টাকা। অথচ বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই। চালকরা গ্যারেজ মালিকের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে। একই এলাকার আবু হাজীর গলিতে আছে হাবিব মিয়ার গ্যারেজ। তাঁর পরিচালনায় ৪০টি গাড়ির প্রতিটি থেকে সকালের শিফটে নেয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা ও বিকেলে নেয়া হচ্ছে ৫৮০ টাকা পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনি এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। গাড়ির অর্ধেক মালিকানাও তাঁর নেই। অন্যের গাড়ি নিজের নামে চালাচ্ছেন। নেপথ্যে থেকে অনেক মালিক তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।

মাহাবুব অটোপার্টস গ্যারেজের দায়িত্বে আছেন রফিক। ৩০টি গাড়ির প্রতিটি থেকে সকাল সন্ধ্যায় আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিদিন গাড়িপ্রতি বাড়তি জমা নেয়া হচ্ছে ৮০০টাকা। বড়বাড়ির এক নং গেটে জিলানীর গেরেজ থেকে ৫০টি গাড়ির প্রতিটি থেকে সকাল-সন্ধ্যা হিসেবে আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা। মীরহাজিরবাগের বাউফল ভিলায় রয়েছে অটোরিক্সার আরেকটি গ্যারেজ। গ্যারেজ মালিক আলম মহাজন। এখানে রয়েছে ৪০টি গাড়ি। যার সবকটি রাজধানীতে চলাচল করে। সকালের শিফটে গাড়ি প্রতি আদায় করা হচ্ছে ৯০০ টাকা। একই গাড়ির বিকেলের শিফট থেকে নেয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ এক নবেম্বর থেকে একটি গাড়ি থেকে দিনে ৯০০ টাকার বেশি আদায় করা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২৪০, মীরহাজীরবাগের আলমগীর মিস্ত্রির গ্যারেজে আছে ২৪টি অটোরিক্সা। এসব গাড়ির প্রতিটি থেকেই বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। ভোর ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে ৮০০টাকা। ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে ৫৮০ টাকা। মীরহাজীরবাগের (নাহার মার্কেটের গলি) ছোট হুমায়ুনের গ্যারেজ থেকে ৭৫টি অটোরিক্সা রাজধানীতে চলাচল করে। গাড়ি জমার সরকারী নিয়ম নীতির কোন কিছুই তোয়াক্কা করছেন না মালিক। ইচ্ছেমতো চালকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক জমা আদায় করছেন। অনেক সময় চালকরা প্রতিবাদ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। উল্টো চালকদের গাড়ি না দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। জানা গেছে, এই গ্যারেজ থেকে সকালে চলা গাড়ি থেকে আদায় হয় ৮০০টাকা ও বিকেলে একই গাড়ি থেকে জমা নেয়া হয় ৬৫০টাকা।

ওই এলাকার জয়নাল মহাজনের গ্যারেজ থেকে ১০২টি গাড়ি চলছে নিয়মিতই। প্রতিটি গাড়ি থেকে সকালে জমা নেয়া হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা ও একই গাড়ি থেকে বিকেলে নেয়া হচ্ছে ৮৫০টাকা পর্যন্ত। গাড়িপ্রতি দিনে এক হাজার টাকা অতিরিক্ত নেয়া হচ্ছে। একই এলাকার সাবান ফ্যাক্টরির গলিতে রয়েছে আমিন মহাজনের গ্যারেজ। এখান থেকে প্রতিদিন শতাধিক গাড়ি রাজধানীতে চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ি থেকে বাড়তি জমা আদায়ের অভিযোগ মিলেছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জমা নেয়া হচ্ছে ৯৫০ টাকা ও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে ৮৫০টাকা। গাড়িপ্রতি বাড়তি নেয়া হচ্ছে ৯০০ টাকা। একই এলাকার সাবান ফ্যাক্টরির গলিতে রয়েছে মান্নান মুন্সির গ্যারেজ। এখান থেকে প্রতিদিন চলে ৫০টি অটোরিক্সা। সকালে এক হাজার ২০টাকা ও বিকেলে নেয়া হচ্ছে ৮২০টাকা। প্রতিদিন একটি গাড়ি থেকে ৯৪০টাকা বাড়তি আদায় হচ্ছে।

একই এলাকার যুক্তিবাদীর গলিতে হাসান মহাজনের গ্যারেজে ৫০টি গাড়ি রয়েছে। দুই শিফট মিলিয়ে এসব গাড়ি থেকে নেয়া হচ্ছে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। গাড়ি প্রতি এক হাজার ১০০ টাকা বাড়তি নেয়া হলেও চালকদের কারও প্রতিবাদ করার সাহস নেই। মীরহাজীরবাগের ওয়াসা রোডে রয়েছে সালাউদ্দিন মহাজনের গ্যারেজ। সকাল-সন্ধ্যা মিলিয়ে এই গ্যারেজের ৩০টি গাড়ি থেকে এক হাজার ৫০ টাকা আদায়ের অভিযোগ মিলেছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা সকলে মিলে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এরি ধারাবাহিকতায় অটোরিক্সার জমা ও ভাড়া নতুন করে নির্ধারণের পর বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করতে সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। যেখানে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আমি প্রতিনিধিত্ব করছি। তিনি জানান, গ্যারেজ মালিকদের বিরুদ্ধে বাড়তি জমা রাখার অভিযোগ অনেক বেশি। আমরা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে তা পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা মনে করি, মালিকরা সরকার নির্ধারিত জমা নিলে চালকরা মিটারে চলতে উৎসাহী হবেন। তিনি জানান, আমাদের পর্যবেক্ষণ অভিযোগ গ্যারেজ মালিকদের নাম ঠিকানা উল্লেখ করে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো অভিযোগের প্রেক্ষিতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিআরটিএ সচিব শওকত আলী জনকণ্ঠকে বলেন, প্রথমত আমাদের জনবল সঙ্কটের সমস্যা তো আছেই। তবে পরিবহন সেক্টরে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিন চারটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। যে কোন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।