২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মৃতিপটে শেখ কামাল

  • কাজী সেলিম

১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্ত করার কঠিন ও দৃঢ় সংগ্রামের একজন ছাত্র হিসেবে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার আসামি হিসেবে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। উল্লেখ্য, তখনকার মাদারীপুর মহকুমা ছাত্রলীগের সংগ্রামী নেতা ও বর্তমান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ছিলেন প্রধান আসামি। মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারিখগুলোতে আমরা, অর্থাৎ আমি ও আমার অগ্রজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী সবুর (ফরহাদ)সহ মাদারীপুর, কালকিনী ও গোপালপুরের প্রায় ৩০/৪০ জন ছাত্র-জনতা নিয়মিত কাঠগড়ায় হাজির হতাম। সেবারও হাজিরা শেষে অসুস্থ মাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হবে। তখন ঢাকা যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল মাদারীপুর অথবা ঠরকী বন্দর থেকে লঞ্চ, না হয় বরিশাল হয়ে স্টিমারযোগে। যাত্রার পরিকল্পনা অনুযায়ী মাকেসহ আমি হাতে কিছু সময় নিয়ে ভুরঘাটা হতে বাসযোগে বরিশাল রওয়ানা করলাম। উদ্দেশ্য বরিশাল থেকে ঢাকাগামী স্টিমার যেন ধরতে পারি। বরিশাল হতে স্টিমার সন্ধ্যায় ছেড়ে পরদিন ঢাকায় প্রায় ৯টার সময় পৌঁছত।

ঘাটে পৌঁছে দেখলাম, ঢাকাগামী গাজী নামক স্টিমারটি ঢাকা যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই মাকে নিয়ে ক্যাবিনে বসলাম। প্রায় আধ ঘণ্টার মধ্যেই স্টিমার গাজী ঢাকার উদ্দেশ্য বরিশাল ত্যাগ করল। আমি তখন ক্যাবিনের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বেলার দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। গাঙচিলগুলো স্টিমারের পিছনে পিছনে উড়ে যেন আমাদের সঙ্গী হতে চায়। কীর্তনখোলা নদীতে নৌকা, লঞ্চ, স্টিমারগুলো যেন যার যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। রাজনীতিসহ নানা বিষয় নিয়ে ভাবছি। এই বিচ্ছিন্ন চিন্তা-ভাবনার মধ্যে এক যাত্রী জানালেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালও এই স্টিমারে করে ঢাকায় যাচ্ছেন। শোনার পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করার ইচ্ছা জাগল। মাকে বললাম, আমি বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র কামাল ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত করতে তার কেবিনে যাচ্ছি। কামাল ভাইয়ের কেবিনের দরজায় শব্দ করলে তিনি দরজা খুললেন। আমার পরিচয় জানার পর হাসিমুখে ভিতরে গিয়ে বসতে বললেন। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, চা-বিস্কুট কিছু খাব কিনা। তাঁর সফরসঙ্গী এক বন্ধু মিলে দুজন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথায় পড়াশোনা করছি, নিয়মিত খেলাধুলা করি কিনা ইত্যাদি। আমি বললাম আমি ফুটবল ও ক্রিকেট দুটিই পছন্দ করি এবং খেলি। তিনি শুনে আনন্দিত হলেন। তাঁর বরিশাল যাওয়া প্রসঙ্গে জানালেন, তার ফুফুর (মরহুম আব্দুর রব সেরনিয়াবাত) বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

কামাল ভাই ছিলেন অত্যন্ত সৌম্য শান্ত চেহারা। হাল্কা পাতলা লম্বা শরীর, একটি সাধারণ শার্ট পরিহিত মোটা গোপের নিচে সৌজন্য মিশ্রিত স্মিত হাসি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরিহিত দেশ ও জাতির গৌরব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠপুত্রই নন, মনে হচ্ছিল আমি যেন একজন জুনিয়র বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সামনাসামনি বসে গল্প করছি। তাঁর কথাবার্তায় ছিল বেশ বিচক্ষণতা, বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ^ল ভবিষ্যত, যেন এক সম্ভাবনাময় ভদ্রমার্জিত সামাজিকতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর আমার ভগ্নিপতি ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম আবিদুর রেজা খানের এ্যালিফ্যান্ট রোডের বাসভবনে এসেছিলেন সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেই মুহূর্তে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করার। কথা প্রসঙ্গে কামাল ভাইকে সেই স্মরণীয় মুহূর্তটির কথা জানালে তিনি বঙ্গবন্ধুর মতোই সহাস্যে আনন্দ প্রকাশ করলেন।

কামাল ভাইয়ের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টা দুই আলোচনা ও কথোপকথনে তার ওপর আমার গভীর শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হয়। গল্পের মাঝে চা-বিস্কুট শেষ করে, সন্ধ্যা পেরিয়ে প্রায় রাত ৯টা। বললাম কামাল ভাই, এবার আমি কেবিনে যাই, আমার মা অপেক্ষা করছেন রাতের খাবারের জন্য। তিনি শুনে বললেন, আমি তোমার মার জন্য খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করি, তুমি বরং আমাদের সঙ্গে খাবার খেয়ে যাও। উত্তরে জানালাম, বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে মাছ, মাংস ও ভাত আনা হয়েছে। বরং আপনাদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমরা দুজন রাতের খাবারের অর্ডার এরই মধ্যে দিয়েছি। তুমি তা হলে তোমার মার সঙ্গে রাতের খাবার শেষ কর এবং তোমার মাকে আমার সালাম জানাবে ও দোয়া করতে বলো। ঢাকায় দেখা করতে ভুলবে না।

’৭১-এর ২৬ মার্চ, পাকহানাদার বাহিনী সমগ্র দেশে নজিরবিহীন গণহত্যা শুরু করলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেই। আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘর প্রধান হেডকোয়াটার্সে যখন বিভিন্ন জেলার প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, ঠিক সেই সময়ে একদিন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে তাঁর এডিসি হিসেবে এসেছিলেন কামাল ভাই। কামাল ভাইয়ের পরনে ছিল সামরিক খাকি পোশাক ও মাথায় টুপি, চেহারার মধ্যে ছিল একজন বাঙালী তরুণ টগবগে সামরিক অফিসারের উদ্দীপ্ত ও সংকল্পে অঙ্গীকারবদ্ধ বীর যোদ্ধার উপস্থিতি। প্রধান সেনাপতির সঙ্গে শেখ কামালের উপস্থিতি যেন সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা প্রেরণা ও শক্তি সঞ্চার করেছিল। সেদিন কর্নেল ওসমানীর পিছনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের মুহুর্মুহু করতালির জবাবে শেখ কামাল তাঁর দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উঁচিয়ে অভিবাদন জানালেন।

১৯৬৯-এর গাজী স্টিমারের সাক্ষাত ও পরিচিত শেখ কামাল এবং মেলাঘরে আগত শেখ কামাল ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চেহারা ও আকৃতির। সেদিন তাঁকে দেখেছিলাম একজন শান্ত, সাধারণ কামাল ভাইকে। কিন্তু মেলাঘরে প্রত্যক্ষ করেছিলাম শেখ কামালকে একজন লড়াকু মাতৃভূমির মুক্তি সংগ্রামে নিবেদিত বাঙালী সামরিক যোদ্ধা অফিসার হিসেবে। ওই সমাবেশে শত শত মুক্তিযোদ্ধার মাঝে তার নৈকট্য লাভের সুযোগ হয়নি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত হলে কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আর সাক্ষাত করার সৌভাগ্য হয়নি। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পথে লাখ লাখ জনতার মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারী বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী সুউচ্চ ট্রাকটির ওপর বঙ্গবন্ধুর পিছনে সেদিন দেখেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একজন অনুগত, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালকে সামরিক পোশাক পরিহিত দ-ায়মান।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একজন গর্বিত অফিসার হিসেবে পদত্যাগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষ করা ও স্বাধীন দেশের খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিকচর্চা যথা সঙ্গীত ও নাটককে স্থায়ীভাবে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে একজন দক্ষ জনপ্রিয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গন ও তাঁর সৃষ্ট দেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠন, ‘আবাহনী’ ক্রীড়াচক্রের ময়দানে এবং তারই প্রিয় নাট্য সংগঠন ‘স্পন্দন’ শিল্পীগোষ্ঠীর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কামাল ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত আবাহনী ক্রীড়াচক্র যেমন আজ দেশের যুব সমাজকে খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের একজন দক্ষ ও খ্যাতনামা খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করছে, তেমনি একটি শক্তিশালী ফুটবল এবং ক্রিকেট সংগঠন হিসেবে দেশ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের গর্বিত খেলোয়াড়দের ক্রীড়া নৈপুণ্য ও ভাবমূর্তিকে অক্ষুণœ রেখেছে। দেশের সঙ্গীত ও নাটককে স্বাধীন এবং আধুনিকতার মাধ্যমে রূপান্তরিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে ছাত্র, যুব সংস্কৃতিমনাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’। কামাল ভাই একজন দক্ষ এবং মোহনীয় সেতার বাদক হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। একজন দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাও ছিলেন কামাল ভাই।

নির্বাচিত সংবাদ