১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামায়াত নিষিদ্ধের আইনী প্রক্রিয়া শুরু, শেষ হবে মার্চেই

  • রাজধানীতে হরতালবিরোধী মিছিলপূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বলেছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধের আইনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলেই বিএনপির কোন প্রতিক্রিয়া নেই, নিশ্চুপ রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে একাধিক অনুষ্ঠানে নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।

দুপুরে ধানম-ির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট ইতোমধ্যে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। তাদের নিবন্ধনও বাতিল করেছে। এটি বর্তমানে আপীল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে আইনী প্রক্রিয়ায় এটির নিষ্পত্তি হবে এবং জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে। হানিফ বলেন, এ দেশের জনগণ চায় যুদ্ধাপরাধীর দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধ হোক। আর জনগণ যেটা চায় সেটা হবে। ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রীও আগামী মার্চ মাসের মধ্যে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য আইনী প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলেছেন। মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ-ের আদেশ বহাল রেখে রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার প্রতিবাদে জামায়াত আহূত হরতাল জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। হরতালে জনজীবন স্বাভাবিক আছে। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও জামায়াত অনেকবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা সফল হয়নি। দেশের জনগণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ছিল বলে তাদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাত হয়েছে। দেশবাসী এ বিচার চায়, এটা বুঝতে পেরে দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের পরও বিএনপি নিশ্চুপ হয়ে আছে। দিনাজপুরে বুধবার ইতালীয় নাগরিকের ওপর হামলার ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার আরেকটি চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। এ সময় অন্যদের মধ্যেÑ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এ কে এম এনামুল হক শামীম, আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী সমর্থক জোট আয়োজিত হরতালবিরোধী এক মিছিল পূর্ব সমাবেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলেই বিএনপির কোন প্রতিক্রিয়া নেই, নিশ্চুপ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর সময়ের ব্যাপার মাত্র। যত ষড়যন্ত্রই হোক যুদ্ধাপরাধীদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। ত্রাণমন্ত্রী বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের মতো অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীরাও সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে এমনটিই আশা করেন মুক্তিযোদ্ধারা ও দেশবাসী। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্টপোষকতার জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকেও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এখন জনগণের দাবি। কারণ উনি যুদ্ধাপরাধীদের এমপি থেকে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বানিয়েছেন। আর এ জন্য তাকেও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।

দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত হরতালবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল পূর্ব সমাবেশে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতাবিরোধীরাই বিদেশীদের ওপর হামলা করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং এটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ ৪৬ বছরের ক্ষত সারবে। কামরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলেই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির চূড়ান্ত রায় নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট দেশের বিরুদ্ধে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এ ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, একে একে একাত্তরের সব ঘাতকের সাজা নিশ্চিত করা হবে। যারা এ দেশের বিরুদ্ধে লড়েছিল তাদের এদেশে থাকার কোন অধিকার নেই। তিনি বলেন, যারা এক সময়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে তাদের বাঁচানোর জন্য হরতাল ডাকা হয়েছে। এটা সত্যিই হাস্যকর। তারা এত দুঃসাহস কোথা থেকে পায় তা খতিয়ে দেখা উচিত। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানার সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেনÑ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এমপি, তালুকদার মোঃ ইউনুস এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক বলরাম পোদ্দার, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল প্রমুখ।

এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ-ের আদেশ বহাল রেখে রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার জামায়াতের ডাকা হরতালে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য রাজপথে সোচ্চার ছিল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউসহ রাজধানীতে বিভিন্ন স্থানে শতাধিক হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশও করেছেন তারা। সকাল থেকেই রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট ও পুরানা পল্টন এলাকায় অবস্থান নেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পরে খ- খ- মিছিল নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমবেত হয়ে হরতালবিরোধী বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকেন। হরতালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ। সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মোঃ আবু কাওছারের সভাপতিত্বে সমাবেশে সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সোহেল রানা টিপুসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।

হরতালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সামাবেশ করেছে ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি বায়েজিত আহমেদ খানের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে জিপিও, পল্টনসহ নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণ। সমাবেশে আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এর আগে সকালে বঙ্গবন্ধু এভনিউয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ২২টি সহযোগী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘আওয়ামী সমর্থক জোট’ হরতালবিরোধী মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি আব্দুল হক সবুজের সভাপতিত্বে সভায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বক্তব্য রাখেন। বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট।

এছাড়া জামায়াতের ডাকা হরতালকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। সমাবেশে সভাপতিত্বে করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম।

এদিকে জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে যুবলীগের মিছিলে হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় যুবলীগের পাঁচকর্মী আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম রামপুরায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত পাঁচ যুবলীগ কর্মীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পশ্চিম রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় যুবলীগ মিছিল বের করে। এ সময় ছাত্রলীগের তপু গ্রুপ মিছিলকারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে যুবলীগকর্মী জাহাঙ্গীর, জহিরুল ইসলাম, সোহেল, নিপুণ ও আরিফ গুরুতর আহত হন। তারা এখন ঢামেকে চিকিৎসাধীন। আহত আরিফ জানান, ছাত্রলীগের তপু গ্রুপ যুবলীগের হরতালবিরোধী মিছিলে হামলা চালায়। এ সময় গুলিও চালায় হামলাকারীরা।