২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকার লাশ রাউজানে দাফন করতে দেয়া হবে না

  • গুডস হিল ও ডালিম হোটেলকে জাদুঘর করার দাবি

মোয়াজ্জেমুল হক/হাসান নাসির ॥ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বিচারের রায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সাকা চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হলে তার লাশ রাউজানে দাফন করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে রাউজান আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধে রাউজানে গণহত্যার এ নায়কের ফাঁসির রায়ের রিভিউ আবেদন বুধবার খারিজ হয়ে যাওয়ার পর সকল মহল এখন নিশ্চিত এ নরঘাতকের ফাঁসি কার্যকর শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। সাকার ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের পর রাউজান ও এর আশপাশ উপজেলাগুলো এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে বুধ ও বৃহস্পতিবার টু-শব্দটি পর্যন্ত হয়নি। প্রতিবাদ মিছিল সমাবেশের তো প্রশ্নই ওঠে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চরম বিরুদ্ধচারণকারী ও মুক্তিকামী মানুষদের ধরে ধরে নির্বিচারে হত্যা করেও এই নরপিশাচ আইনী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকেছে চার দশকেরও বেশি সময়। শুধু তাই নয় উল্টো যে দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে সে স্বাধীন দেশের মন্ত্রীত্ব লাভ করে পবিত্র জাতীয় পতাকা নিয়ে দাবড়ে বেড়িয়েছে দেশজুড়ে। উপহাসের পর উপহাস করেছে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিগুলোকে। এছাড়া স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির বিভিন্ন সংগঠনের অনেককে হত্যা ও গুম করেছে। বর্তমানে তার যে বিচারটি হয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে।

চট্টগ্রামের রাউজানের এই সাকা চৌধুরী ফজলুল কাদের চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তার পিতা ফকা চৌধুরীও ছিলেন রাজাকার ও স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই সাকা ও তার পরিবারের সদস্যরা এ স্বাধীন দেশে সরকারগুলোর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ক্রমাগতভাবে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সেই অর্থের বদৌলতে তারা দিনকে রাত ও রাতকে দিন করতে কখনও পরোয়া করেনি। এ খলনায়ক তার জীবদ্দশায় মাত্র দু’বার গ্রেফতার হয়েছে। ছাত্রদল নেতা নিটোল হত্যা মামলায় শুধু একরাত থানায় কাটাতে হয়েছে। আদালতে যাওয়া মাত্রই তার জামিন হয়ে যায়। এরপর সর্বশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে গ্রেফতার হয়ে জেলবন্দী হয়েছে এবং বিচারে তাকে ফাঁসির দ-াদেশ দেয়া হয়েছে।

সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির দ-ে দ-িত করার আদেশের ঘটনাটি বুধবার থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় মারদাঙ্গা ছবিগুলোর খলনায়ক চরিত্রের সকল বৈশিষ্টই তার মাঝে বিদ্যমান। যা তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চলাকালেও প্রদর্শন করে নিন্দিত হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনা তার কিছু আসে যায় না বলে অতীত রেকর্ড সাক্ষ্য দেয়। বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে সাকা ঘূর্ণাক্ষরেও কোনদিন ভাবতে পারেনি তার শেষ পরিণতি হবে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলে জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আজ সাকাকেও হয়তো হতবাক করে দিয়েছে। তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সময় একেবারেই নেই। তাই বৃহস্পতিবার তার পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে সাক্ষাতপর্ব সেরে ফেলেছেন। পরিবারের সদস্যদের প্রতি কি বলেছেন, চূড়ান্ত রায়ের ব্যাপারে কি মন্তব্য করেছেন এসব বিষয় এখনও অজানা। তবে তার নিজ বাড়ি রাউজান এবং সংসদ সদস্য পদে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী এলাকা রাঙ্গুনীয়া ও ফটিকছড়িতেও আজ তার জন্য একটি শব্দও বের করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আলোচনায় বার বার উঠে আসছে তার এত পাপ যে জমেছে নতুন কোন পাপ স্থান পাওয়ার জায়গাও ছিল না। তাই তার শেষ পরিণতি ফাঁসির পাটাতনে দাঁড়িয়ে গলায় রশি ঝুলিয়ে প্রাণসংহার সময় হয়ে গেছে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া নেই ॥ রাজনীতির ডিগবাজ হিসেবে পরিচিত সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল থাকায় তার নিজদল বিএনপিতেও তেমন কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সাকার অবস্থান কখনই পাকাপোক্ত ছিল না। চট্টগ্রাম বিএনপিতে নোমান গ্রুপ, নাসির গ্রুপ, খসরু গ্রুপ ও শাহাদাত গ্রুপ নামের অস্তিত্ব থাকলেও কখনও সাকা গ্রুপ নামের কোন গ্রুপ আছে বলে শোনা যায়নি। বিএনপিতে সাকা চৌধুরী উড়ে এসে জুড়ে বসা একজন নেতা। মুসলিম লীগ থেকে এনডিপি এবং জাতীয় পার্টি হয়ে সব শেষে বিএনপিতে এসে অনেক সিনিয়র নেতাকে ডিঙ্গিয়ে তিনি হয়ে যান স্থায়ী কমিটির সদস্য। দলের প্রতি যে তার শতভাগ আনুগত্য ছিল না সে প্রমাণও তিনি বার বার রেখেছেন নানা অশ্রাব্য বক্তব্য রেখে। বলেছিলেন ‘আগে কুকুর লেজ নাড়ত, এখন লেজ কুকুরকে নাড়ায়’। একবার বিএনপি ত্যাগ করার উপক্রম হলে তখন দলে ফেরার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘তালাক হওয়া বিবির সঙ্গে সংসার হয় না।’

রাজনীতিতে কাগুজে বাঘ খ্যাত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল থাকায় চট্টগ্রামে টু-শব্দটিও হয়নি। চট্টগ্রাম নগরী ও তার নিজ উপজেলা রাউজানেও কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। বরং তার মৃত্যুদ- নিশ্চিত হওয়ায় এসেছে এক ধরনের স্বস্তি। কেননা, টাকারে জোরে দেশে বিদেশে প্রভাব থাকায় দেশজুড়ে আলোচিত এই যুদ্ধাপরাধী কোন ফাঁক-ফোঁকরে শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যান কিনা এমন আশঙ্কা ছিল জনমনে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যারা মামলার আসামি তাদের মধ্যে একমাত্র সাকা চৌধুরীকে নিয়েই দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। অবশেষে সেই বাকপটু সাকাও ঝুলতে যাচ্ছেন ফাঁসির দড়িতে। এখন চলছে ক্ষণ গণনা।

লাশ নেবে না রাউজান ॥ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর লাশ গ্রহণ করতে চায় না ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ মাস্টার দা সূর্য সেনের রাউজান। সাকা চৌধুরীর লাশ রাউজানের মাটিতে দাফন করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এদিকে, চট্টগ্রাম নগরীর দুটি টর্চার সেল গুডস হিল ও ডালিম হোটেলকে জাদুঘর করার দাবি জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আপীল বিভাগে সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল রাখার বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর সাকা চৌধুরী দ- কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার। ফলে তাকে কোথায় দাফন করা হতে পারে এ নিয়ে এখন চলছে আলোচনা। দাফনের দুটি সম্ভাব্য স্থান চট্টগ্রাম নগরীর গুডস হিল ও রাউজানে তাদের পারিবারিক কবরস্থান। নগরী এবং রাউজান দুই এলাকাতেই সাকা চৌধুরীর লাশ দাফন করতে দেয়ায় আপত্তি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের।

রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মাস্টার দা সূর্য সেনের জন্মভূমি এই রাউজান। এখানে সাকা চৌধুরীর মতো একজন যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতকের জায়গা হবে না। ফাঁসির দ- কার্যকর হওয়ার পর সাকার লাশ রাউজানে আনতে দেয়া হবে না। তাকে এখানে দাফনের চেষ্টা প্রতিহত করা হবে। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই ঘাতকের রাউজানের মাটিতে দাফন করতে দেবে না।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা কমান্ডার মোঃ শাহাব উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে গুডস হিল ও ডালিম হোটেল টর্চার সেল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সাকা চৌধুরী ও মীর কাশেম আলীর মামলার নথিতেও এ দুটি নির্যাতন কেন্দ্রের নাম এসেছে। সেখানে নির্যাতিত হয়েছেন মুক্তিকামী মানুষ। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আত্মীয়স্বজনকে ধরে এ দুই কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। তাই আমাদের দাবি গুডস হিল ও ডালিম হোটেলকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে জাদুঘর করা হোক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে ও নির্যাতিতদের স্মরণ করতে আমাদের প্রজন্মের এ দুটি নির্যাতন কেন্দ্র ঘুরে দেখা উচিত।

সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল থাকার প্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সবচেয়ে বেশি ভয় এবং আশঙ্কা ছিল সাকাকে নিয়ে। কারণ তার প্রচুর অর্থ রয়েছে। দেশের ও দেশের বাইরে লবিস্ট নিয়োগ করে সাকা চৌধুরী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন। বিচারের রায় ফাঁস করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ স্থাপন এবং সর্বশেষ বিদেশীদের দিয়ে প্রচারও চালানো হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফাঁসির দ- বহাল থাকায় স্বস্তি এসেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায়টি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এদেশে আরও অনেক যুদ্ধাপরাধী থাকলেও আর কারও এমন দম্ভ ছিল না। সাকা চৌধুরীই একমাত্র নেতা যিনি নিজে রাজাকার হিসেবে গর্ববোধ করতেন। তার বক্তব্যে কখনই মনে হয়নি যে, তিনি তার ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত। আর সে কারণেই সাকার ফাঁসির রায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল সংগঠন ও মানুষের আনন্দের মাত্রাটাও বেশি।