২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতিসত্তার দীপ্ত প্রকাশে আন্তর্জাতিক মৃত্তিকালগ্ন নাট্যোৎসব শুরু

জাতিসত্তার দীপ্ত প্রকাশে আন্তর্জাতিক মৃত্তিকালগ্ন নাট্যোৎসব শুরু
  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আপন দেশের জাতির ভেতরেও খোঁজা হয় ভেদাভেদ। বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হিসাবে পৃথক ভাষা ও সংস্কৃতির বিবেচনায় জুড়ে দেয়া হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তকমা। বৃহস্পতিবার হেমন্তের সন্ধ্যায় দেখা মিলল সেই বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার দীপ্ত প্রকাশ। রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হলো প্রথম আন্তর্জাতিক মৃত্তিকালগ্ন নাট্যোৎসব। ভারত ও বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের গানের সুরে ও নৃত্যের ছন্দে মুখরিত হলো একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন।

সকল জাতিসত্তার মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও সহনশীল বিশ্ব নির্মাণের আকাক্সক্ষায় এ উৎসবের আয়োজন করেছে সম্প্রীতি নাট্যোৎসব পর্ষদ। ৮ দিনের এ উৎসবে বাংলাদেশের ৭টি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯টি মৃত্তিকালগ্ন জাতিগোষ্ঠীর নাট্যদল অংশ নিচ্ছে। সব মিলিয়ে মঞ্চস্থ হবে দুই দেশের ১৬টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রযোজনা। বাংলাদেশের চাকমা, মনিপুরী, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো, মারমা, ওঁরাও এবং ভারতের অসমিয়া, খাসিয়া, বড়ো, মনিপুরী, ত্রিপুরা, মিজো, ঝাড়খ- ও ছৌ মৃত্তিকালগ্ন গোষ্ঠী পরিবেশন করবে তাদের প্রশংসিত নাটকসমূহ। সঙ্গে থাকবে দুই দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। একযোগে উৎসব চলবে একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চ, পরীক্ষণ থিয়েটার হল ও নন্দন মঞ্চে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নাট্যশালা মিলনায়তনে বর্ণিল এ উৎসবের উদ্বোধন হয়। অতিথিদের মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে সূচনা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সম্মানিত অতিথি ছিলেন আইটিআইয়ের সাম্মানিক সভাপত্বি রামেন্দু মজুমদার, নাট্যজন আতাউর রহমান, নাট্য নির্দেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক জয়শ্রী কু- ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট নাট্য নির্দেশক প্রবীর গুহ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পর্ষদের সদস্য সচিব কামাল বায়েজীদ। সভাপতিত্ব করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও পর্র্ষদের আহ্বায়ক লিয়াকত আলী লাকী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত শতকের ষাটের দশক থেকে এই অঞ্চলে নাট্যোৎসব শুরু হলেও স্বাধীনতার পরে সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব বেড়ে যায়। মৃত্তিকালগ্ন এই নাট্যোৎসব সৃজনশীল সাংস্কৃতিকচর্চাকে আরও গতিশীল করবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ ধরনের নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনেকগুলো দল এসেছে তাদের মৃত্তিকাসংলগ্ন নাটক নিয়ে। দুই দেশের সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হবে। পাশাপাশি আরও বিকশিত পরস্পরের জানাশোনা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, তাদের সেনাবাহিনীও অংশ নিয়েছে আমাদের সঙ্গে স্বাধীনতার যুদ্ধে। আর শুধু যুদ্ধে অংশ নেয়া নয়, ঢেলে দিয়েছে তাদের বুকের রক্ত। সংস্কৃতিমন্ত্রী আরও বলেন, পুরো নবেম্বর মাসে ঢাকায় এমনভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে যেন এটি পরিণত হয় সাংস্কৃতিক রাজধানীতে। একইসঙ্গে আয়োজন ছড়িয়ে দেয়া হবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে।

অন্য বক্তারা বলেন, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সামনে তুলে ধরার ব্যর্থতাকে ঘুচিয়ে দিয়েছে এই অনন্য আয়োজনটি। মাটির সঙ্গে সংযোগ আছে দুই দেশের এমন দলগুলোকে এ নিয়ে উৎসবের আয়োজন চমকপ্রদ। এদেশের তরুণ নাট্যকর্মীদের উদ্যমের ফসল এই উৎসব। ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অবলম্বনে এই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে তাই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কোন স্থান নেই।

উদ্বোধনী সন্ধ্যায় ছিল না কোন নাটকের প্রদর্শনী। তবে মিলনায়তনে ভেসে বেড়িয়েছে দুই দেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের গানের সুর ও নৃত্যের ছন্দ। পাহাড়ী ঝর্ণা ও বৃক্ষের অবয়বে সাজানো চমৎকার মঞ্চে প্রথমে পরিবেশিত হয় ভারতের অসমের সঙ্গীতদল স্তুতির যন্ত্রসঙ্গীতের পরিবেশনা। পাঁচ শিল্পীর দলটি অনবদ্য সুরের খেলায় সিক্ত অতিথিসহ মিলনায়তনভর্তি শ্রোতা-দর্শক । বেহালার সুমধুর সুরে ঢোল-তবলা, মাদল ও খঞ্জনির সহযোগে দলটি পরিবেশন করে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসেসহ অসমিয়া গানের সুর। শিলকল্পা একাডেমির পরিবেশনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সমন্বিত নৃত্য পরিবেশনাটিও ছিল মনমাতানো। সম্প্রীতি নৃত্য শীর্ষক পরিবেশনায় নাচের ছন্দে তুলে ধরা হয় দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা।

আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত একাডেমির নন্দন মঞ্চে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেবে বাংলাদেশের ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দল ‘য়ামুক’ ও মণিপুরী থিয়েটার। সন্ধ্যা ছয়টায় এক্সপেরিমেন্টাল পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ মণিপুরী থিয়েটারের নাটক। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে নাটক মঞ্চস্থ করবে ভারতের অসম রাজ্যের দল পূর্বরঙ্গ। ২৬ নবেম্বর পর্যন্ত চলমান উৎসবে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় একাডেমির নন্দন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে দুই দেশের নাট্যদলসমূহের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দর্শকদেরর জন্য উন্মুক্ত থাকবে এ পরিবেশনা। এছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে বাংলাদেশের মৃত্তিকালগ্ন সম্প্রদায়ের পরিবেশিত নাটক এবং সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় নাট্যশালার মূল মঞ্চে মঞ্চস্থ হবে ভারতীয় নাট্যদলসমূহের পরিবেশিত নাটক।

আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘হাজার গল্প’ ॥ বৃষ্টিস্নাত হয়ে খেলা করছে একদল গ্রাম্য কিশোর, চিন্তামগ্ন এক বৃদ্ধের মায়াভরা চাহনি, গাছের ভাঙ্গা ডালে বসে আছে পাখি, সবুজ ধান ক্ষেত্রের আল দিয়ে ছাগল নিয়ে যাচ্ছে গ্রাম্য বধূ, পড়ন্ত বিকেলে নদীর তীরে বসে আছে এক বৃদ্ধ, ঐতিহাসিক পুরনো দালানের দরজা, পথশিশুরা পড়ালোখা করছে-এভাবেই গ্রাম ও শহুরে জীবনের নানা দৃশ্য উঠে এসেছে তরুণ প্রতিভাবান আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায়। গ্যালারির কোথাও ঠাঁই পেয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রীদের ছবিও। এসব আলোকচিত্র নিয়ে ধানম-ির দৃক গ্যালারিতে ‘হাজার গল্প’(থাউজেন্ট স্টোরিজ) শীর্ষক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার বিকেলে। ‘একটি নির্বাক আলোকচিত্রের মাঝেই নিহিত আছে হাজার কথা’ প্রতিপাদ্যে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ‘ছবি’। দেশ-বিদেশের হাজারখানেক আলোকচিত্রীর প্রায় পাঁচ হাজার ছবির মধ্য থেকে ১২০টি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়। প্রদর্শনী উদ্বোধনের সময় বিচারকম-লীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুদরত-ই-খোদা, হাসান চন্দন, আবির আবদুল্লাহ, ‘ছবি’র প্রতিষ্ঠাতা তৌহিদ পারভেজ বিপ্লবসহ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী আলোকচিত্রীরা। প্রদর্শনীটির মিডিয়া পার্টনার দৈনিক জনকণ্ঠ ও একুশে টেলিভিশন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের বরেণ্য শিল্পীদের নিয়ে ‘ছবি’ হয়ে উঠে একটি আন্তর্জাতিকক মাধ্যম। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে শুরু হলেও ‘ছবি’ এই গ্রুপটির ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। পরবর্তীতে নিয়মিত ফটোওয়াক, ওয়ার্কশপ নানাবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে তৌহিদ পারভেজ বিপ্লবের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে এই গ্রুপের পরিধি বড় হতে থাকে। প্রদর্শনী চলবে ২১ নবেম্বর পর্যন্ত এবং প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে।