২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘পৃথিবীর সব ভাল কবিতাই আমার কবিতা’

  • রফিকুজ্জামান রণি

দার্শনিক শিল্পপ্রয়াসী আর স্মৃতির ঘেরাটোপে আটকে থাকা কবি আবুল হাসান ছিলেন আবেগনিমগ্ন এবং প্রকৃতির পালকস্পর্শী একজন কবিতাশ্রমিক। তিনি একজন শাশ্বত প্রেমিকও বটে। তবে বাস্তবতার কোমল-কাঠিন্যকে স্বীকার করেই তিনি এগিয়ে গেছেন আপন শক্তিতে। বাংলাসাহিত্যে একমাত্র আবুল হাসানই সাহস করে উচ্চারণ করতে পেরেছেন- ‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা/জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’

মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তার অন্নদামঙ্গল কাব্যে ঈশ্বরী পাটনীর আদতে দেবী অন্নদার কাছে প্রার্থনার সুরে বলেছিলেন- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ আর স্বাধীন বাংলার কবি আবুল হাসান সেই কথারই সমর্থন জুগিয়েছেন আরও ব্যতিক্রম সুরে- ‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা, হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো।’ এখানেই পাওয়া যায় আবুল হাসানের ব্যতিক্রমত্বে ছোঁয়া। তাছাড়া ‘মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!’ এই দার্শনিক বক্তব্যটিও এ প্রজন্মের পাঠককে ঝঙ্কার খাইয়ে বুঝিয়ে দেয় কবিতার জগতে আবুল হাসান কতটা স্বতন্ত্র এবং একরোখা।

আবুল হাসানের কবিতায় কৃত্রিমতা নেই। নেই দেশ-কাল, সমাজ-সভ্যতার বাইরের কোন উপকরণও। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার চিত্র তিনি এতটাই শিল্পসৌন্দর্যে সাজিয়েছেন যে, তা শুধুমাত্র কবির ব্যক্তিগত জগতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রপান্তরিত হয়েছে অমূল্য সব পাঠক-সম্পদেও। তার কবিতা পাঠমাত্রই মনে পড়ে যায় এ যেন আমারই জীবনের চিত্র, এ যে আমারই চারপাশের নিত্যঘটনার খতিয়ান। তিনি বিশ্বাস করতেন দৃশ্যের বিপরীত পৃথিবীর সাথে কোনভাবেই মানুষ একাত্মতা পোষণ করতে পারে না। কবি তাই অতীতের ঘটনাকে চিত্রিত করেছে এভাবেÑ

‘ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই/কেন যেন আমি চলে যাই আজও সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে/যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত/মাঝে মাঝে জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দের মেদুর!/মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা/নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর/হরিকীর্তনের নদীভূত বোল/বড় ভাই আসতেন মাঝ রাতে মহকুমা শহরের যাত্রা গান শুনে/নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেন শব্দের কান পেতে রেখে/কেউ বলে যাচ্ছে যেন/বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন?’ (পাখি হয়ে যায় প্রাণ, আবুল হাসান)

কবি আল-মাহমুদ তার কবিতায় জাতিসংঘকে ‘একঠেঙা বক’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। আবুল হাসানও জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাকে কটাক্ষ করে কবিতা রচনা করেছিলেন। পৃথিবী যেখানে নতুন নতুন আবিষ্কার আর উন্নতির দিকে ছুটছে সেখানে মানবতা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? মানুষ চাঁদের খবর জানে, মঙ্গলগ্রহে ড্রোন পাঠায় কিন্তু নিজের ঘরের কাছে কি হয় তার কোন খোঁজ রাখে না। শামসুদ্দীন আবুল কালাম তার ‘পথ জানা নাই’ গল্পে যথার্থই বলেছেনÑ ‘সব কিছুরই দাম বাড়িলো, কমিলো শুধু জীবনের দাম!’ আবুল হাসানের কবিতায়ও সেই কথারই অনুরণন পাওয়া যায়Ñ ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না/আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে/আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই/সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন/কী লাভ যুদ্ধ কোরো?/শত্রুতায় কী লাভ বলুন?/আধিপত্যের এতা লোভ?/পত্রিকাতো কেবলি আপনাদের/ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর.../মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম/পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলো না!’ (জন্ম মৃতু জীবনযাপন, আবুল হাসান)

দুই.

আবুল হাসানের কথা উঠলেই অনিবার্যকারণে চলে আসে কবি নির্মলেন্দু গুণের কথা! বাংলাসাহিত্যে তিরিশের পঞ্চপা-বের মতো শক্তিশালী একটি বলয়ের উত্থানের মধ্য দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি-সাহিত্যিক খুঁজে পেয়েছি আমরা। তারপর নানান সময়ের পটপরিক্রমায় কবিদের মধ্যে দেখা গেছে সখ্যভাব কিংবা যূথবদ্ধতার বিরলচিত্র। আমাদের চোখ উজ্জ্বল করে দেয় শামসুর রাহমান, আল-মাহমুদ, শহীদ কাদরি, ফজল শাহাবুদ্দীনের মতো কবিতার সারথিদের বন্ধুবাৎসল্যময় মুহূর্তগুলোর কথা। নক্ষত্রপ্রতিম এ মানুষগুলো যেমন আমাদের জন্য বিস্ময়ের হেতু, তেমনিভাবে আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণের জুটিও মুগ্ধতায় আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। নির্মলেন্দু গুণ এবং আবুল হাসানের জুটি শুধুমাত্র বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ক্ষেত্রেও তারা দেখিয়েছেন বিরল সব দৃষ্টান্ত। কেননা গুণ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আবুল হাসান একদা তাকে মসজিদে ঢুকিয়ে ফজরের নামাজ পড়িয়েছেন। হাসান যেমনিভাবে ওজু করেছেন এবং যে প্রক্রিয়ায় নামাজ আদায় করেছেন লক্ষ্মী ছেলের মতো গুণও সেভাবেই তা অনুসরণ করেছিলেন সেদিন। জোড়া কবুতরের মতোন তারা ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে। বাড়ি-গাড়ি কিংবা নারী নয়, তাদের একমাত্র তপস্যা ছিল কবিতার দেবীকে খুঁজে বের করা।

বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত কবি জুটি ছিল টেড হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথ দম্পতি। বিশ শতকের ইংরেজী সাহিত্যের কবি টেড হিউজ এবং আমেরিকান রোমান্টিক কবি সিলভিয়া প্লাথের ভালবাসার সংসারের কাহিনী আজও সমস্ত পৃথিবীতে মিথের মতো সমাদৃত। তাদের ভালোবাসার গৃহে বিভেদের সাপ ঢোকার পূর্বেই সিলভিয়া আত্মাহুতি করে একেবারেই দিকভ্রান্ত করে দেন কবি টেড হিউজকে। কিন্তু বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জুটি হলো নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান। গুণ ও হাসানের জুটি ছিল বন্ধুত্বের, সমলিঙ্গের। তবুও যেন দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা নবদম্পতির মতোই ছিলেন ঘনিষ্ঠ! সিলভিয়ার আত্মাহুতিতে টেড হিউজ যেমন ভেঙ্গে পড়েছিলেন তেমনিভাবে হাসানের মৃত্যুতেও পিজি হাসপাতালের বারান্দায় হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলেন গুণ। নারীর টানের উষ্ণতা দুজনকে কখনও কখনও দূরত্বের দিকে ঠেলে দিলেও বন্ধুত্বের টানের কাছে সে দূরত্ব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। হাসানের প্রেমিকা সুরাইয়া খানমের রক্তচক্ষুও দেয়াল বানাতে পারেনি দুই বন্ধুর মধ্যকার সম্পর্কে। ‘সত্তরের দশকে এই বোহেমিয়ান জুটি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ঢাকার অলিগলি, কখনও ঝগড়া হয়েছে, কখনও অভিমান, তারপর সব কিছু ডিঙিয়ে আবারও তাদের একত্রে পথচলা হয়েছে কবিতার পথে।’

প্রযুক্তির চরম অপ্রতুলতারকালে সবাই কমবেশি চিঠি চালাচাালি করেছেন। দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চিঠি সাহিত্য। এককালে মনের আবেগ, অনুভূতি, ভালোলাগা, মন্দলাগার কথা কাগজের সফেদ বুকে কালো হরফে এঁকে রাখত মানুষ। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার প্রিয় বন্ধুকবি অরুণ মিত্রকে প্রায়ই চিঠি লিখতেন, নিজের মা না থাকায় বন্ধুর মাকেই মা বলে ডাকতেন এবং সন্তানোচিত ভাষায় চিঠি লিখতেন। সেখানে কবির মনের সুখ-দুঃখের গাঁথা লুকিয়ে থাকত। তবে সুকান্তের চিঠির ভাষা এখনও আমাদের মুগ্ধ করে, চোখ ভিজিয়ে দেয়। সুকান্তের মতো আবুল হাসানও ছিল ক্ষণজন্মা একজন শক্তিমান কবি। আবুল হাসানও তার বন্ধুকবি নির্মলেন্দু গুণকে চিঠিতে দুছত্র লিখেছেন। কিন্তু সেখানেও ভেসে ওঠেছে নিঃসঙ্গ মনের আকুতির কথা, দীর্ঘসময়ের বিচ্ছেদ ও যাতনার প্রচ্ছায়া। সেবার প্রেমিকা সুরাইয়া খানমের সঙ্গে রিক্সাযোগে আবুল হাসান যাওয়ার পথে গুণ তাকে উদ্দেশ্য করে হাত উঁচিয়েছিল কিন্তু সুরাইয়া খানমের মনঃ রক্ষার্থে হাসান তা দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া এই উপেক্ষার দুঃখ ভুলতে পারেনি গুণ। খুব দ্রুত পাততাড়ি গুটিয়ে ঢাকার মাটি ছেড়ে চলে গেছে নিজের গ্রামে, বন্ধ করে দিয়েছিলেন হাসানের সঙ্গে সকল ধরনের যোগাযোগ। ঘটনাচক্রে বিষয়টা একটু দেরিতে হলেও টের পেয়েছিলেন আবুল হাসান। ফলে প্রিয়বন্ধুকে চিঠি লিখে অভিমান ভুলে আবার ফিরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চিঠিটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। গুণ এই চিঠি পেয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন। কেননা গুণ বুঝতে পেরেছেন আবুল হাসানের উপেক্ষা গুণকে যতটা কষ্ট দিয়েছে তারচেয়ে বেশি আবুল হাসানকে কষ্ট দিয়েছে গুণের গ্রামে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা। সেই চিঠি সম্পর্কে গুণ নিজেই বলেছেনÑ ‘ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিলাম। কাঁদিনি। ...আমি সহজে কাঁদি না। একেবারেই কাঁদিই না বলা যায়। কিন্তু হাসানের চিঠি পড়ে আমার প্রায় কান্না চলে আসে। আমি মনে মনে কাঁদি।’ চিঠিটা পড়লে সহজেই উপলব্ধি করা যায় দু’জনের বন্ধুত্বের পবিত্র পানি কতটা গভীর সমুদ্র পর্যন্ত গড়িয়েছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো আবুল হাসানও প্রিয় বন্ধুকে চিঠিতে পৃথিবী থেকে শেষ বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলÑ

প্রিয় গুণ

আজ রাত্রে মহাদেবের সঙ্গে আল-মাহমুদের এক তুমুল বাকবিত-ার পর, মহাদেবের বাসায় এসে দেখি, তোমার একটি অভিমানী চিঠি মহাদেবের কাছে, যা তুমি লিখেছ। চিঠিটা বারবার পড়লুম। অনেক দিন পর তোমার সান্নিধ্য চিঠির মাধ্যমে পেয়ে একদিকে যেমন ভাল লাগল, অন্যদিকে তেমন আহত হলুম, এই ভেবে যে তুমি আমার ঠিকানা জানা সত্ত্বেও একটা চিঠিও আমাকে লেখোনি। জানি না কী কারণ, তবে চিঠি না পেলেও তোমার সম্পর্কে অনবরত এর-ওর কাছ থেকে খবর নিতে চেষ্টা করেছি, মাঝে মধ্যে তোমার অনুপস্থিতির নৈঃসঙ্গের তাড়নায়ই হয়ত বা। এ ছাড়া এর পেছনে আর কোন মানবিক কারণ নেই। এক সময় ছিল, যখন তুমি আমাকে হলুদ পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতে, তখন তুমি বাইরে থাকলেও মনে হতো, তোমার উপস্থিতি উজ্জ্বলভাবে বর্তমান। আমি মানুষ হিসেবে কতটুকু সৎ এবং শুভবুদ্ধির, সেটা বিচারসাপেক্ষ, তবে বন্ধু হিসেবে এক সময় তো আমরা পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলাম। আমাদের জীবনযাপন সূত্রগুলো একে একে পরে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হলেও সেই প্রবল প্রচ্ছন্ন দিনগুলোর কি কোন কিছুই আর আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই, যা তোমার স্মৃতিকে একবারও নাড়া দিতে পারে বা পারত? এবং সেই স্মৃতির সুবাদে একটা চিঠি কি আমিও পেতে পারতুম না? মানি, আমার নিজের কিছু কিছু এককেন্দ্রিক দোষত্রুটি এবং মানবিক দুর্বলতা শেষকালে আমাদের দুজনকে দুদিকে সরিয়ে দিয়েছিল। প্রথমদিকে আমি যা ভালবাসতাম না, সেইগুলি তোমার ভালবাসার জিনিস ছিল, পরে যখন তুমি সেই মদ, মাগী, গাঁজা, চরস পরিত্যাগ করলে এবং সেই সময় যখন আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সময়, কেন জানি না এক অনির্দিষ্ট অদৃষ্টের তাড়নায় আমরা দুজন পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ত বা আমার দুরারোগ্য ব্যাধির তাড়না। বার্লিন থেকে আসার পর আমি অন্য মানুষ। ফলে পুরনো যোগসূত্র সংস্থাপনের চেষ্টা করেছি যতবার, ততবার দেখেছি আমার শরীর আমার বৈরী। তুমি যা ভালবাসো, সেই সব আমার শরীর ভালবাসে না, তবে অসুস্থতার কারণেই। কিন্তু সত্তায় আমাদের যে গভীর সম্পর্কের সূত্র, কবির সঙ্গে কবির সেই সম্পর্ককে তো আমি কোনদিন ম্লান করিনি। ১৬ আগস্টের পর, তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে; কিন্তু পরে একদিন হঠাৎ জানলাম, তুমি আর ঢাকায় নেই। তোমার ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারটায় দুঃখ পেয়েছিলাম, নৈঃসঙ্গও কম বাজেনি। কিন্তু পরে আবার ভেবেছি, যেভাবে তুমি মাঝে মধ্যে বাড়ি যাও, সেভাবেই হয়ত গিয়েছ, পরে আবার কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসবে। কিন্তু পরে জানতে পারলুম, তুমি গিয়েছ অনেক দিনের জন্য। বাড়ি গিয়ে তুমি বিভিন্নজনের কাছে চিঠি লিখেছ, সেই সব চিঠিতেই এসব জানতে পেরেছি। আমিও অপেক্ষায় ছিলুম, একটা চিঠি পাব; কিন্তু সব সময় অপেক্ষা যে ফলপ্রসূ হবে, এটার তো কোন কথা নেই। মহাদেবের কাছে তোমার চিঠি বারবার পড়েছি। বারবার পড়ার মতোই। কবির চিঠির মধ্যে যে দুঃখবোধ এবং নৈঃসঙ্গবোধ থাকে, তার সব রকম চিৎকার হঠাৎ আমাকেও একা-সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। এই একাকিত্বের দরকার ছিল আমারও। আমি অনেক দিন এ রকম সুন্দরভাবে একা হতে পারিনি। বার্লিন থেকে ফেরার পর আমি এই একাকিত্বই বিভিন্নজনের সান্নিধ্যে খুঁজতে চেষ্টা করেছি। যার জন্য আমি এক রমণীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম, এখন সেই শ্রীমতীও আমাকে আর একাকিত্ব দিতে পারেন না। হতে পারে এই একাকিত্ব কেবল তুমিই আমাকে একবার অনেক দিন ধরে দিয়েছিলে। তুমি কি ভুলেই গেলে সেই সব দিনের কথা-যখন শীতের কুয়াশায় মধ্যরাত্রির বাতাসকে আমরা সাক্ষী রেখে ঢাকা শহরের অলিগলি চষে বেড়িয়েছি। আমরা কি তখন সুখী ছিলাম না? সেই সুখের কারণেই কি তুমি আবার ফিরে আসতে পার না? যতই ভালবাসার পেছনে ধাবমান আমাদের ছায়া এর-ওর সঙ্গে ঘুরুক, তুমিও জানো আর আমিও জানিÑ এক সময় আমরাই আমাদের প্রেমিক ছিলাম। আর একমাত্র পুরুষ এবং আরেকজন পুরুষই ভালবাসার স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে, কারণ রমণীরা অতিনশ্বর। কিন্তু সেই নশ্বরতার বেদনাবোধ কেবল কবিÑ পুরুষরাই একমাত্র গ্রহণ করতে পারে। সেই নশ্বরতার অঙ্গীকারে আমরা আমাদের বেঁধেছিলুম একেক দিন। এখনও সেই বোধ, সেই ভালবাসা আমার জীবনের একমাত্র স্মৃতি, জানি না তোমার ক্ষেত্রে তার স্পর্শ কতদূর মূল্যবান।

ভালবাসা নিও। ভাল থেকো এবং ফিরে এসো।

ইতি

চির শুভাকাক্সক্ষী হাসান

তিন.

‘পৃথিবীর সব ভাল কবিতাই আমার কবিতা’ এই ভয়ঙ্কর বাক্যটি এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে উচ্চারণ করে আবুল হাসান সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। হয়ত বা সেকারণেই নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এ কথাও প্রচলন আছে যে, নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত ‘হুলিয়া’ কবিতাটির খসড়া কপি দেখে আবুল হাসান এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে বাধ্য হয়ে পুরো কবিতাটাই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছেন। বুঝাতে চেয়েছেন, এত চমৎকার একটি কবিতা লিখার অধিকার একমাত্র তারই আছে! তারপরও তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। শেষ হয়নি ফুটপাথে কিংবা রেলস্টেশনের কোন নির্জন জায়গায় কবিতার খাতা মাথায় দিয়ে পরম সোয়াস্তিতে রাত্রিযাপনের গল্পও। কেননা নির্মলেন্দু গুণই স্বীকার করেছেনÑ ‘হাসান সঙ্গে না থাকলে ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমার কবিতা লেখা হতো না। কে জানে, আমি হয়ত শুধু জুয়াড়িই থেকে যেতাম।’ গুণ লেখার খাতা হারিয়েছেন কিন্তু মাথা হারাননি।। কবিতাটি তিনি আবার স্মৃতি থেকে স্মরণ করে করে লিখে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন বটে! কিন্তু সেই ক্ষেপাটে বন্ধুটিকে আজ আর কোথাও খুঁজে পাননি গুণ। প্রায় চার দশকের নিঃসঙ্গতা বুকে চেপে রেখে এখনও কবিতা লিখে চলেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, শুধু সীমাহীন নৈঃশব্দতা বুকে নিয়ে নিঃসঙ্গ ঝিনুকের মতো চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন আবুল হাসান, সঙ্গীহীন কবরের উদরে একা!

তথ্যঋণ :

০১. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী

০২. ইন্টারনেট।

০৩. বিভিন্ন ছোট কাগজ

০৪. উত্তরাধিকার