১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভিনদেশী ক’জন কবির সান্নিধ্যে

  • দক্ষিণের জানালা-৩;###;নুরুল করিম নাসিম

চেন্নাই নেল্লোর মহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লেখক উৎসব ২০১৩-তে বেশ ক’জন লেখক ও কবির সাথে আলাপ পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। কথাপ্রসঙ্গে বাংলাদেশের কবি ও কবিতার সাম্প্রতিক অবস্থা উঠে এলো আলোচনায়।

ওরাও ওদের নিজ নিজ দেশের শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আমাকে দিতে চেষ্টা করলেন। আসলে একটা কথা খুব স্পষ্ট এবং ধ্রুবসত্য যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে গদ্যচর্চার চেয়ে কবিতাচর্চা বেশি হয়। একথা উজবেকিস্তানের তরুণ বন্ধু কবি ও সম্পাদক আসরর আলেয়ারব যেমন আন্তরিকভাবে স্বীকার করলেন, মালায়লাম কবি ফিলিপজ মাইকেলও স্বতঃস্ফূর্তভাবে একথার সমর্থন করলেন।

বাংলা সাহিত্যের তিরিশের দশকের বিপ্লবী কবি সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় যতই বলুকণা কেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, কবিতা, আজিকে তোমাকে দিলাম ছুটি’ আসলে কবিতাকে ছুটি দেয়া এতটা সহজ কর্ম নয়। কবিতা মিশে আছে বাঙালীর রক্তের অণুপরমাণুতে, কবিতা পরম প্রেয়শী, এত দ্রুত, এত সহজে তাকে পরিত্যাগ করা যায় না।

সাম্প্রতিক ম্যান বুকার পুরস্কার প্রাপ্ত ক্যারিবিয়ান লেখক জামাইকার মরলেন জেমস অ ইজওঊঋ ঐওঝঞঙজণ ঙঋ ঝঊঠঊঘ কওখখওঘএঝ গ্রন্থে প্রমাণ করলেন কথা সাহিত্যও এপিকধর্মী হাতপায়ে ধ্রুপদী সাহিত্যের সবগুলো প্রবণতা তার এই উপন্যাস দেদীপ্যমান হয়ে পাঠককে উদ্ভাসিত করেছে। তার এই উপন্যাসের ভেতর-মহলে লুকিয়ে আছে কবিতা। তিনি এক সাক্ষাতকারে অত্যন্ত ক্ষোভ আর মর্মবেদনা নিয়ে বলেছেন, ‘ক্রিয়েটিভ রাইটিং’ ক্লাসে সৃজনশীল লেখাচর্চা করতে বলেছি ছাত্রছাত্রীদের, গদ্যের ওপর জোর দিতে বলেছি, কিন্তু অধিকাংশ তরুণরা কবিতার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

এটা কোনো অন্যায় নয়, এটা এমন কোনো বিষয় নয়, কবিতা সভ্যতার শুরু থেকে মানব হৃদয়কে উদ্বেলিত ও অনুপ্রাণিত করেছে; কিন্তু তাই বলে গদ্যসাহিত্য হবে না, গদ্যচর্চা অব্যাহত থাকবেন, তা’তো কাম্য হতে পারে না।

উজবেকিস্তানের আসরার আলোয়ারব মালায়লাম কবি ফিলিপজ মাইকেল এবং আরও দু’তিনজন কবি আমার তিনতলার ছিমছাম নির্জন ঘরটিতে অনুষ্ঠান শেষে জড়ো হতো। বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে যেত অনুষ্ঠানের যাবতীয় কর্মকা-। তারপর অফুরন্ত সময়। এইসময় নারী কবিরা যেত মার্কেটে কেনাকাটা করতে। নারীর সেই চিরায়ত অভ্যাস। জাতীয় কবিতা উৎসবে কোলকাতা থেকে আমন্ত্রিত নারী কবিদের ভেতরও কেনাকাটার এই প্রবণতা দেখেছি। এদেশের বইপুস্তক নয় বরং শাড়ি তাদের কাছে বেশি কাম্য।

আমরা ক’জন শেষের দিনের সন্ধ্যাটিকে আলাদা করে রেখেছিলাম দেশের বন্ধুবান্ধবদের জন্য উপহার সামগ্রী কেনার জন্য। কিন্তু এর বাইরে যে সময় আমাদের হাতে ছিল তা’ কিছুটা ব্যয় করেছি আমরা ‘সাইট সিয়িং’ (ঝওএঐঞ ঝঊঊওঘএ) করে, আর বাকি সময়টুকু কবিতা নিয়ে আলোচনা করে, তুমুল আড্ডা দিয়ে।

একপর্যায়ে মালায়লাম কবি ফিলিপজ মাইকেল স্বরচিত কবিতা পাঠের প্রস্তাব করলেন। উজবেকিস্তানের তরুণ কবি-সম্পাদক আলোয়ারব সদাসর্বদা রঙ্গরসে ভাঙ্গাভাঙ্গা হিন্দীতে, কখনও ইংরেজীতে। অনর্গল বলে যাচ্ছেন। বেশ জমে উঠেছিল সেদিনের সন্ধ্যা। এসি বন্ধ করে দেয়া ছিল। জানালার ভারি সবুজ পর্দা তুলে দিলাম। বিশাল জানালার বাইরে নেল্লোর শহরের আকাশে বিশাল এক অচেনা চাঁদ। আজ ভরা পূর্ণিমা। সেই আলোতে ভেসে যাচ্ছে জগৎসংসার। আমাদের হৃদয়-মন-ভালবাসা, স্মৃতি সত্তা, ভবিষ্যৎ। কেমন যেন এক উদাসীন হাওয়া বইছে চারদিকে। আমরাও হারিয়ে যাচ্ছি কোথায় যেন। হঠাৎ, কী হলো, আলেয়ারব দ্রুত বাইরে চলে গেল। হয়তোবা কিছু কিনে আনতে। এভাবে প্রাণহীন আসর জমে না। এরকম নিরামিষ আসর কারো কাম্য নয়। আমি ভাবছিলাম কিছু একটা আনি। হালকা ভাজাপোড়া কিছু, একটু ঝাল, একটু টক। যখন ভাবছি এসব কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে, আলেয়ারব দ্রুত হরিণীর মতো নিচে নেমে গেল। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরের সবকিছু দেখা যায়। শহর এখন ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত ও মুখর, কোথায়ও তার ফিরে তাকানোর উপায় নেই। দেখলাম, আলেয়ারব জায়গামতো পৌঁছে গেছে। আমাদের এই হোটেলের ঠিক বিপরীতে একটি দোকান আছে। সেখানে যাবতীয় পানীয় বিক্রি হয়, মেড ইন ইন্ডিয়া, নো ফরেন গুডস্।

কবিতার আসর জমে উঠলো। আলেয়ারব একজন সম্ভাবনাময় তরুণ কবি শুধু নন, একজন সফল সম্পাদক নন, একজন ভাল সংগঠক ও হোক্টও বটে। আমার ঘরে বসে আমার ওপরই টেক্কা মারছে। যেন এ আমার ঘর নয়, আমি বহিরাগত, আমি ‘আউট সাইডার’। হঠাৎ আলবেয়ার কাম্যর ঞঐঊ ঙটঞ ঝওউঊজ উপন্যাসের বিপন্ন নায়ক মারসেলের কথা মনে পড়ল, আর সেই অবিস্মরণীয় বাক্য, হৃদয় তোলপাড় করা উচ্চরণ, মা গতকাল মারা গেছেন, গতকাল না আজ? আমার ঠিক মনে পড়ে না।

এই সময়কার, যেন এই প্রজন্মের, অগইওইওঠঅঝঞ দোদুল্যমান মানসিকতার চমৎকার নির্মম উদাসীন বহিঃপ্রকাশ। দু’বছর আগে মাকে হারিয়েছি। তিনি আমার প্রতিটি প্রকাশিত লেখার পেপার কাটিং যতœকরে পুরনো বিবর্ণ একটা খাতায় জমিয়ে রাখতেন। সপ্তাহান্তে, কখনো দুসপ্তাহ পরে পরনো ঢাকার নিবাস নারিন্দার বেগমগঞ্জ লেনে গেলে, তিনি তুলে দিতেন সেইসব অমূল্য রতœ, অন্ততঃ আমার কাছে যৌবনের সেই দিনগুলোতে তাই মনে হতো। মা বই পড়তে ভালবাসতেন। আমি সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশ এবং কোলকাতার উপন্যাস আর লাড্ডু নিয়ে যেতাম। দুটোই মার খুব প্রিয় ছিল।

পুরনো ঢাকার সেই বাড়িতে জায়গা ছিল, পর্যাপ্ত জায়গা ছিল, তবুও কিন্তু আমি ও আমার সদ্য বিবাহিতা কবিতা-শাশুড়ি ও বিরোধী স্ত্রী, সেখানে থাকত না। আমি থাকতাম গ্রীনরোডে, সাড়ে আট হাজার টাকার (১৯৯৩) একটি ভাড়াটে বাড়িতে। বাজারের ভেতর, দোতলার দুটো কক্ষে।

আমার পালা এলে, আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘তুমি রাত্রির সাথে’ থেকে ‘সীমান্ত’ ঞঐঊ ইঙজউঊজ কবিতাটি পড়লামঃ পর্দাটা তুলে দাও, সীমান্ত দেখা যায়, এখন ভোর, তোমার ভোরবেলা। মুখেমুখে চটজলদি তাৎক্ষণিক ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিতাম। সবাই ইংরেজী কবিতা পড়ছে, স্বরচিত। কারো কারো ইংরেজীতে অনুবাদ করা। এই পথম মনে হলো, বাইরের পৃথিবীর জন্য অন্ততঃ ইংরেজীতে কবিতা লেখা উচিত, অথবা অনুবাদের বই থাকা উচিত।

আমার তরুণ প্রকাশক মিঠু কবির অসংখ্যবার আমাকে প্ররোচিত করেছে ইংরেজীতে কবিতার পা-ুলিপি দেয়ার জন্য, আমি গা’ লাগাইনি।

এবার ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে ঢাকায় যে আন্তর্জাতিক চেন্নাই লেখক সম্মেলন হতে যাচ্ছে তাতে একটা ইংরেজী কবিতার বই থাকা খুব বাঞ্ছনীয়, খুবই জরুরী। বেশ কিছু কবিতা ইংরেজীতে লেখা আছে, নিজের কবিতা কিছু ইংরেজীতে রূপান্তর করা আছে, নিজের কবিতা কিছু ইংরেজীতে রূপান্তর করা আছে, এখন অলসতা ঝেড়ে ফেলে ৪ ফর্মার একটি পরিপূর্ণ পা-ুলিপি তৈরি করতে হবে। ইংরেজী কবিতার নামও দু’বছর আগে চেন্নাই কবিতা উৎসবে যাওয়ার আগে ঠিকঠাক করে রেখেছিলাম ঞঐঊ ঝঐঅউঙড ঙঋ ঊঠঊঘওঘএ, শুধু সময় ও অদম্য ইচ্ছের অভাবে আর দশটা স্বপ্নের মতো এই স্বপ্নটিরও আঁতুড়ঘরে মৃত্যু হলো।

আলেয়ারব তার সম্পাদিত সংকলন থেকে পড়ল। বাংলা অনুবাদ আমার। কবিতার শিরোনামঃ সত্য।

প্রায় প্রতিদিন

ধন্যবাদ বলি

তিরিশ লক্ষ ভাষায়

আবেগ বিহ্বল এই শব্দ উচ্চারণে

সকালে শান্ত

তখন ঘুম থেকে উঠি

প্রায় প্রতিদিন

ষাট লাখ হাত উত্তোলিত হয়

শক্তি প্রয়োগ হয়

এটা কি ধ্রুব সত্য

হে হৃদয় আমার

তুমি কি চাও

তুমি উদ্বিগ্ন কেন

বিস্ময়করভাবে বিষাদময়

অন্যজায়গা খুঁজছো কেন?

তুমি আমাকে সবসময় জিজ্ঞেস করো

সত্য কোথায়

আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সত্য

কেউ জানেনা

প্রথমে সত্যকে খোঁজো

তারপর সত্যের দেখা পাবে।

ফিলিপজ মাইকেল তার ওঘ জঅওঘ ওঝ ঈঙগগওঘএ বৃষ্টি আসছে কবিতাগ্রন্থ থেকে পড়লো। কবিতাটির শিরোনাম ঃ বৃষ্টি আসছে। অনুবাদ আমার ইংরেজী থেকে বাংলায়।

বৃষ্টি আসছে

সমস্ত ভাবনাচিন্তা উড়িয়ে নিয়ে

কি বিপুল বৃষ্টি আসছে

আমার মনের গহনে

বৃষ্টি আসছে, বৃষ্টি আসছে

স্বপ্নহীন জীবনের দৌড়ে

যেন শান্ত এক প্রবাহ

যেন স্বপ্ন

প্রেয়শী আমার

তুমি শুধু একা এখানে নও

তুমিও আসছো/ স্মৃতিও আসছে।

তারপর তুমুল হাততালি

কর্তৃপক্ষ খাবরের আয়োজন রাখেননি।

বাইরে, কাছেই একটা চমৎকার পরিচ্ছন্ন রেস্তরাঁ আছে, সেখানে যেতে হবে আমাদের। এখানে, মুসলমান গরিষ্ঠ এই এলাকাটিতে শুনেছি ভাল বিরানি পাওয়া যায়। আজ তবে তাই হোক।

রচনাকাল: শরিয়তপুর ৩১ অক্টোবর, ২০১৫