১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শীতকালীন শাকসবজিতে ব্যবহার হচ্ছে অতিমাত্রায় কীটনাশক ॥ মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ

  • ৯৮ ভাগ শাকসবজিতেই বালাইনাশক প্রয়োগ ॥ রান্নার তাপেও নষ্ট হয় না

শাহীন রহমান ॥ শীতকালীন শাকসবজিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শীতকাল আসলেই কাঁচা শাকসবজির চাহিদা বেড়ে যায়। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে একশ্রেণীর কৃষক রাসায়নিক সারের পাশাপাশি ব্যবহার করছে অতিমাত্রায় কীটনাশকও। তাদের মতে, আমাদের খাবারের শতকরা ৯৮ ভাগ শাকসবজিতেই বালাইনাশক প্রয়োগ করা হয়। এই বালাইনাশক রান্নার সময় তাপে নষ্ট হয় না। বরং কোন কোনটির তাপে কার্যকারিতা বেড়ে যায়। তাদের মতে খাদ্যের এই বিষাক্ততার প্রভাব মানবদেহে ধীর গতিতে ক্রিয়া করে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝার উপায় থাকে না কেউ এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে কিনা। এ কারণে না বুঝেই বেশিরভাগ মানুষ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

তাদের মতে, শাকসবজিতে রোগ ও পোকা দমনের জন্য বালাইনাশক প্রয়োগ করায় অধিকাংশ শাকসবজিই বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। এসব বালাইনাশক প্রয়োগের ১৫ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত বিষাক্ততা শাকসবজিতে থাকে। কিন্তু দেখা যায় বালাইনাশক প্রয়োগের ২-৩ দিন পরই শাকসবজি সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হয়। ফলে বিষাক্ত শাকসবজি নিয়মিত খেতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অথচ গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চবিষযুক্ত ১২টি কীটনাশকের প্রভাবে গত ৫০ বছরে পুরুষ ও মহিলার সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে। মানবদেহের রক্তে, মাংসপেশীতে ও দুধে কীটনাশক পাওয়া গেছে। কীটনাশকের প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুও জন্ম নিচ্ছে। কিডনি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, লিভার, পিত্ত, পাকস্থলির রোগের অন্যতম প্রধান কারণও অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার। জানা গেছে টমেটো পাকানো, রঙিন ও সংরক্ষণের জন্যই রাইপেন, ইথোপেন, টমটমসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা হচ্ছে বর্তমানে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুধু কীটনাশকের ব্যবহার নয় ঢাকার আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত শাকসবজিসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যেও প্রাকৃতিকভাবেই মিশে যাচ্ছে বিষাক্ত পদার্থ। কারণ এসব এলাকায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে টেক্সটাইল ও ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ। এসব ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে যেমন তরল বর্জ্য নদীতে মিশছে তেমনি এর একটি বড় অংশ কৃষিজমিতেও মিশে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিষ ছড়াচ্ছে। শীতকালে সবজির ব্যবহার বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

তাদের মতে, ঢাকার চার নদীর আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য কারখানা থেকে উৎপাদিত বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। এছাড়াও হাজারীবাগের বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আর নদীর বিষাক্ত পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শাকসবজি ও ধান এবং মাছে ভারি ধাতু যেমন লিড, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, মারকারি ও ক্রোমিয়ামের মিশ্রণ ঘটে যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত।

খাদ্য বিষাক্ততার জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের ১৫-২০টি দেশ বাংলাদেশ থেকে শাকসবজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের মতে দেশে খাদ্য ঘাটতি না থাকলেও বিষযুক্ত খাবার আজ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি। কারণ খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এসব বিষাক্ত পদার্থ ছাড়াও অতিরিক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে দেশে উৎপাদিত খাদ্য পণ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এ অরাজক অবস্থায় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সবজি উৎপাদনে কীটনাশক ব্যবহারের তীব্রতা অনেক বেশি বলেও বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশ হতে সবজি রফতানি কমে যাওয়া অন্যতম কারণ অতিমাত্রায় এই কীটনাশক ব্যবহার। সবজিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, চামড়ার রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী কিডনিরোগসহ মানবদেহে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী কীটনাশক বিষক্রিয়ায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি কীটনাশক মাছ, পাখি এবং অনেক গাছপালা ধ্বংসের জন্য দায়ী। পরিবেশ সংগঠন পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান বলেন, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট পন্থার ওপর ভিত্তি করে উপযুক্ত শিল্প বিকশিত না হলেও এর ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

উৎপাদিত কৃষিপণ্যে কি পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে সে বিষয়েও কোনও নজরদারি নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিমাণ কীটনাশক যেমন ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি কীটনাশক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর শস্য বা ফল বাজারে নেয়ার কথা থাকলেও সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় না। ফলে দেশে চাল মাছ, সবজি, মসলা এবং ফলমূলে ব্যাপকভাবে বিষাক্ত রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত করণ পর্যন্ত প্রত্যেক পর্যায়ে বিষ মেশানো হচ্ছে।

কৃষিবিদদের মতে দেশে বর্তমানে একাধিক গ্রুপের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় সবই বালাইনাশক। বালাইনাশকের ব্যবহারও খুব দ্রুত বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ১৬৯টি দেশীবিদেশী কোম্পানি বালাইনাশক আমদানি করছে। অথচ নিয়ম না মেনে বালাইনাশক ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিরাট হুমকির মুখে পড়েছে। আবার ভেজাল ও অননুমোদিত কীটনাশক, রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোন ব্যবহার করায় আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। প্রভাব ধীরগতিতে হওয়ায় দ্রুত বোঝা সম্ভব হয়না কেউ এর প্রভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে কিনা।

তারা বলেন, শাকসবজি কাটার আগে ও পরে ভাল করে পানিতে পরিষ্কার করলে কিছুটা বিষাক্ততা কমে। কিন্তু পুরোপুরি এটা দূর করা সম্ভব হয় না। এ কারণে শাকসবজির পোকা ও রোগ দূর করার জন্য বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের আহ্বান জানান তারা। বিশেষ করে বালাইনাশকের পরিবর্তে আইপিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। আইপিএম পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে উপকারি পোকা দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন, বালাইসহনশীল জাতের চাষ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি, যান্ত্রিক পদ্ধতি, সেক্সফেরোমন ফাঁদ, আলোর ফাঁদ, ডিমের গাদা নষ্ট করা, আক্রান্ত ডগা তোলা ইত্যাদি। ফসলের গাছের রোগ দমনের জন্য জৈব কীটনাশক স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত।