২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বচ্ছতা-মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই বিচার হচ্ছে যুুদ্ধাপরাধীদের

  • নুরেমবার্গ ট্রায়ালের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সেমিনারে বক্তাদের অভিমত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালকে মডেল হিসেবে ধরে আরও স্বচ্ছতা ও অপরাধীদের মানবাধিকারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। শহীদ পরিবার, দেশবাসী ও সুশীল সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। যদিও নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল চরিত্রগতভাবে ছিল সামরিক আদালত। সেখানে আদালতের রায়ই ছিল চূড়ান্ত। এর বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে আপীলের সুযোগ দেয়া হয়নি। ঢাকার ‘আইসিটি’ আইনে অভিযুক্তকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। নুরেমবার্গে অভিযুক্তদের আইনজীবী ও সাক্ষীদের যে সময় দেয়া হয়েছিল ঢাকার ট্রাইব্যুনালে তার চেয়ে বেশি সময় দেয়া হয়েছে। এমনকি ঢাকার ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের চেয়ে বেশি ছিল অভিযুক্তদের আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা। মানবাধিকারের বিবেচনায় ঢাকার আইসিটি নুরেমবার্গ ও টোকিওর চেয়েও মানসম্পন্ন।

শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার : নুরেমবার্গ থেকে ঢাকা’ আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়ে দেশী-বিদেশী যুদ্ধাপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। বক্তারা অবিলম্বে দেশবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি সকল কর্মকা- বন্ধের দাবি জানান।

তারা বলেন, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বিচার শুরু হয়েছিল অপরাধের পর পরই। আমাদের দেশে ৪০ বছর পর বিচার শুরু হওয়ায় বহু প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। বহু তথ্যপ্রমাণ হারিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় ছিল ’৭১-এর গণহত্যাকারীরা ও তাদের সহযোগীরা। ক্ষমতায় থাকার সুযোগে তারা বহু তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করেছে। পাঠ্যপুস্তক ও প্রচারমাধ্যম থেকে ’৭১-এর গণহত্যার যুদ্ধাপরাধ শুধু নয়, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের ইতহাস মুছে ফেলতে চেয়েছে। এ বিষয়গুলো ছিল বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের সার্বিক কার্যক্রম অনুসরণীয় উল্লেখ করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পীকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশের বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। এ নিয়ে কোন দেশের প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। অনেক দেশই আমাদের দেশের বিচারপ্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। পুরো কার্যক্রম দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে অনেক দেশ। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইট ইজ জাস্টিস, নট চ্যারেটি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনুফেস্ট অনুযায়ী সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। পুরো জাতি এ বিচারে ঐক্যবদ্ধ। জাতীয় দাবির প্রেক্ষিতে বিচার কাজ এগিয়ে চলছে।

বক্তারা বলেন, নুরেমবার্গ থেকে আরাম্ভ করে কম্বোডিয়া পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অপরাধে ঘটনার দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবধানে বিচার একমাত্র বাংলাদেশেই চলছে। এ বিচার ও রায় প্রমাণ করেছে দেশের মানুষ ও সরকার যদি চায় অপরাধ যতই অতীতে ঘটুক না কেন স্বজনহারাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাদের দুঃসহ বেদনা সম্পূর্ণ উপশম না হোক, লাঘব করা সম্ভব।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর থেকে অপরাধীদের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী বিচার প্রশ্নবিদ্ধ ও বিঘিœত করার জন্য শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের পক্ষে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তাদের পক্ষে বহু গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠন ভাড়া করেছে এই বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য। আইসিটির ভেতরেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহল অবগত রয়েছেন। নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বহু কারণেই নুরেমবার্গে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ’৭১-এর গণহত্যাকে জামায়াত যেভাবে ধর্মের নামে বৈধতা দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধকে আখ্যায়িত করেছে ইসলামের ওপর আঘাত হিসেবে, একইভাবে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে তারা বলছে ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র। ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ ও ধর্মভিরু কিছু মানুষকে ইসলামের নামে মাওদুদীবাদ তথা ধর্মের নামে ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যার জন্য প্ররোচিত করা কঠিন কোন কাজ নয়।

তিনি বলেন, নাৎসি দর্শনের একনিষ্ট অনুসারী জামায়াতে ইসলামীর মিত্র যেমন দেশের ভেতরে আছে, তেমনি দেশের বাইরেও আছে এর চেয়েও অনেক বেশি। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াতের কোন প্রভু বা বন্ধুরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের বিরোধিতা না করলেও কয়েকটি দেশও সেসব দেশের আল কায়েদার সহযোগীরা অনুষ্ঠানিক ও পরোক্ষভাবে এ বিচার সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার ও নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করছে। যে সুযোগ নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের ছিল না।

কানাডার বিশিষ্ট মানবাধিকার নেতা ও উত্তর আমেরিকার জুরিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান এ্যাটর্নি ইউলিয়াম সেøান বলেন, চিলিতে এক সময় অপশক্তিকে হটিয়ে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছিল সে দেশের মানুষ। গণতন্ত্রকে পাওয়ার পর পরই দেশের মানুষ গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবি তোলে। তারা মনে করেন, গণহত্যাকারীদের বিচার না হলে গণতন্ত্র অর্থবহ হতে পারে না। তাই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে ও এর ধারাবাহিকতা চলমান রাখতে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের বিকল্প নেই। এতে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়। গণতন্ত্রের পথচলা হয় সুগম ও মসৃণ।

আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়াকে আমাদের বিচার এগিয়ে নিতে কাজে লাগিয়েছি। জাতির দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার হচ্ছে এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক বিচার নিশ্চিত করা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা সফলতার সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি। ইতোমধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া অনেকটাই সফলতার দিকে এগিয়ে গেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, এ প্রজন্মকে কখনই মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা যেমন ভুলে গেলে চলবে না, তেমনি স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর অশুভ কাজগুলোও মনে রাখতে হবে। তিনি বলেন, আজ আমাদের অনেক আনন্দের দিন। দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকরের পথে। আমরা তাদের শাস্তির অপেক্ষা করছি। গোটা জাতি আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। তিনি জামায়াত নিষিদ্ধ ও তাদের সকল কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি বন্ধের জবাবে অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শুরু থেকে আমাদের নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়। তবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের চেয়েও স্বচ্ছ। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বিচার পরিচালনা করছে, তা আপনারা দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক বিষয় থাকে, ইস্যু থাকে। বিশেষত যাদের ফাঁসি হয়েছে, ফাঁসির রায় হয়েছে, তারা বাইরে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। এগুলো তারই ফলাফল। বিচার বানচালে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলেছে। তাদের দোসররাই বিচার ও রায় বন্ধে বিবৃতি দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে, যেসব দেশ বা সংগঠন এসব বিবৃতি দিচ্ছে তারা কোন দিনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। দল ও গোষ্ঠী রক্ষার স্বার্থে এসব বিবৃতি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশের ১৬ কোটি মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে একমত উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই প্রেক্ষাপটে কে কি বলল তা দেখার সময় নেই। প্রয়োজনে আমরা জবাব দেব। যেমন এ্যামনেস্টির ক্ষেত্রে জবাব দিয়েছি। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে কোন জবাব দেয়া প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমাদের বিরোধী যারা তারাই যুদ্ধাপরাধীদের মিত্র। তারা বিচার নিয়ে চক্রান্ত করবেÑ এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেমিনারে বলেন, সব দেশেই বিচার নিয়ে কিছু বিরোধী গোষ্ঠী কাজ করেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যাদের বিচার হবে তারা তো ঠেকানোর চেষ্টা চালাবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের বিচার নিয়ে প্রশ্নের কোন সুযোগ নেই।

তুরিন আফরোজ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ড. নুজাত চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোন রাজনৈতিক ইস্যু নয়। সিভিল সোসাইটি, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহীদ পরিবারের সদস্যদের দাবির প্রেক্ষিতে এ বিচার চলছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবা আলীম চৌধুরীকে চৌধুরী মঈনুদ্দীন হত্যা করেছেÑ এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি যেমন হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে সবার কাছে গিয়েছি, দাবি তোলেছিÑ এমনিভাবে সকল শহীদ পরিবার দীর্ঘ সময় এ দাবিতে সোচ্চার ছিল। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করারও দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার এ নিকোলেব বলেন, সন্ত্রাসবাদের কোন সীমান্ত নেই; দেশ নেই। এরা যে কোন দেশে গিয়ে নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এদের যে কোন মূল্যে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বাংলাদেশে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে অরাজনৈতিক উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রকৃত বিচার করেই অপরাধীদের শাস্তি দিচ্ছেন। এ নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। ৪৪ বছর পর স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীই এখন ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের হত্যা করছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি সৈয়দ আমীরুল ইসলাম।