২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামের মানুষ সাকার ফাঁসিতে ঝোলার অপেক্ষায়

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ বাঙালীর মহান বিজয়ের মাস দ্বারপ্রান্তে। এমনি এক সময়ের পূর্বে বাঙালীর স্বাধীনতা বিরোধিতাকারী দুই নরঘাতক বিএনপি নেতা সাকা চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে আইনী লড়াইয়ে হেরে গিয়ে ফাঁসির রশিতে ঝোলার জন্য ক্ষণ গণনায় রয়েছেন। যে কোন মুহূর্তে বাঙালী জাতির স্কন্ধ থেকে অপসারিত হবে দুই পাপী, নরঘাতক, ধর্ষক। শত শহীদের রক্তে রঞ্জিত যাদের হাত।

কারও মনে কোন আফসোস নেই, দুঃখ নেই, অনুশোচনা নেই। উল্টো আছে স্বস্তি ও অনাবিল প্রশান্তি। চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মূর্তিমান আতঙ্ক রাজাকার ফকার পুত্র সাকার শেষ পরিণতি অর্থাৎ ফাঁসিতে ঝোলার প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করতে অপেক্ষার যেন শেষ হচ্ছে না। মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী নারী পুরুষের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর খলনায়ক সাকা, তার পরিবার ও সাঙ্গপাঙ্গদের দম্ভ চুরমার হয়ে গেছে। শত ষড়যন্ত্র চালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না। আইনের হাত থেকে রেহাই পেল না। এই সাকা দেশের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে দশকের পর দশক দাম্ভীকতা প্রকাশ, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করেই স্বাধীনতার সপক্ষের বিশাল শক্তিকে চ্যালেঞ্জ দিয়েই ঘুরে বেড়িয়েছেন এদেশে। মন্ত্রী হয়েছেন। যে দেশটির স্বাধীনতা তিনি চাননি, সে দেশটির পবিত্র জাতীয় পতাকা পেয়েছেন মন্ত্রিত্ব লাভের মাধ্যমে। যারা এদেশের স্বাধীনতাকে মানতে পারেননি, বাঙালীর স্বাধীনতা নিয়ে এখনও যাদের গা জ্বালা করে সাকা চৌ তাদের অন্যতম।

কি দুর্ভাগ্য এদেশের! মহান মুক্তিযুদ্ধে সাকা যেমন নরহত্যার নায়কের ভূমিকায় ছিলেন তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও রাউজান-রাঙ্গুনীয়ায় তার লেলিয়ে দেয়া ক্যাডার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি তথা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতাকর্মী সমর্থক এমনকি তার বিরোধিতা যারাই করেছেন তাদের শেষ করে দিয়েছেন হত্যা ও গুম করার মাধ্যমে। মামলা করেও তার এসব অপকর্মের বিচার পায়নি জনগণ। সেই সাকা আজ ফাঁসির রশিতে ঝুলার অপেক্ষায়। চলছে শুধু ক্ষণ গণনা। সাকার ঘটনা এখন টক অব দা চিটাগং। এ জাতীয় পাপিষ্টের বিচার একদিন হবে অনেকে তা ভাবলেও এইভাবে আইনী সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দীর্ঘ সময় পর তিনি ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলবেন তা অনেকের ভাবনাতেও কখনও আসেনি। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। ইতিহাস বড়ই নির্মম।

রাজনীতির এ ডিগবাজকে আইনী প্রক্রিয়ায় আটকানোর কাজটি এত সহজসাধ্য ছিল না। তবে এ সরকার তা করেছে। সাকার অর্থ বিত্তের যে পাহাড়, তেমনি ক্ষমতার প্রভাব সীমাহীন। মানুষকে মানুষ ভাবা তার স্বভাবে কখনও ছিল না। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কখনও কেয়ার করেননি তিনি। শুধু তাই নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বিচার চলাকালে এ সাকা আদালত, সরকার পক্ষের কৌঁসুলিদের কিভাবে কটাক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন তা সকলেরই জানা। তার বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরায়। এই রাউজানে তিনি মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবেই ছিলেন বছরের পর বছর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা স্বাধীনতার আগে ও পরে সম্পূর্ণ জিম্মি ছিল সাকা ও তার পরিবারের সদস্যদের হাতে। জীবনের শেষ সময়ে এসে শত শহীদের আত্মার করুণ আর্তনাদে সেই সাকাকে আইনী জালে আটকা পড়ে চূড়ান্ত বিচারে এখন মৃত্যুকে আলিঙ্গনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। তার বাঁচার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এ পৃথিবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি তাকে নিয়ে নিতে হচ্ছে। তার যে অবস্থা হবে তা তিনি কোনদিন ভাবতে পেরেছেন কিনা তা কারও মনে হয় না। কিন্তু ভার্গের নির্মম পরিহাস পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকে করে যেতেই হচ্ছে। আর এ কারণেই ফাঁসিতে ঝুলার বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম জুড়ে কোন মানুষের মনে কোন ধরনের সামান্যতম অনুশোচনাও নেই। চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে তিনি অহংকার করতেন। তিনি ও তার পরিবারের মতো আর কেউ প্রভাবশালী আছে বলে ধারণাও করতেন না। কিন্তু চট্টগ্রাম বরাবরই তাকে ঘৃনার চোখে দেখেছে। চট্টগ্রামবাসীর সৌভাগ্য যে, সাকার কারণে চট্টগ্রামের নামের উপর যে কলঙ্কের ছাপ এ সাকা লেপে দিয়েছেন তাতে পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। যার পাপ তাকেই তার প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম জুড়ে মানুষের মুখে মুখে আওয়াজ উঠেছে কখন ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলছে এ নরঘাতক। আজ-কাল না পরদিন উৎকণ্ঠার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না।

এদিকে, সাকার মৃত্যুদ- কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে রাউজানের কুন্ডেশ্বরী ভবন। যে ভবনের মালিক দানবীর নূতন চন্দ্র সিংহকে সাকার নেতৃত্বে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই ভবন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গ্রামের লোকজন ছাড়া বাইরের লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে সাকা ও তার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। কু-েশ্বরী ভবনের মূল ফটকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। গত ২৯ জুলাই সাকার বিরুদ্ধে আপীল বিভাগের রায় ঘোষণার পর যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল তা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। রীতিমতো ১৬টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে পুরো কুন্ডেশ্বরী ভবনের সীমানা জুড়ে। এদিকে, চট্টগ্রাম মহানগরীর চন্দনপুরাস্থ গুডস হিলকে কেন্দ্র করেও পুলিশ প্রহরা বলবৎ করা হয়েছে। সাকার পিতা ফকার মালিকানাধীন এই গুডস হিলটি ছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অন্যতম প্রধান টর্চার সেল। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামীদের ধরে এনে নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো হতো। অনেককে হত্যা করে ফেলে দেয়া হতো। এ ভবনটিতে এখন সাকা পরিবারের কোন সদস্যের অবস্থান নেই। আছে শুধু কেয়ারটেকার। প্রধান ফটকে তালাবদ্ধ। ফটক সম্মুখে রয়েছে পুলিশী প্রহরা। এ গুডস হিল একদিকে যেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধে টর্চার সেল তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী হয়ে, বিএনপির নেতা হয়ে ক্ষমতা ও প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছিল।