২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী মৌলবাদ দমন ॥ মিসরীয় অভিজ্ঞতা

  • মুনতাসীর মামুন

মিসরের জেনারেল সিসি ও বাংলাদেশের জেনারেল জিয়াউর রহমানের মধ্যে অনেক মিল আছে। দুই জেনারেলই সামরিক বাহিনীর রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন। মিসরের সামরিক বাহিনী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ বছর ক্ষমতায়। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীও একই রকমভাবে প্রায় ৩৫ বছর ক্ষমতায়। দু’জনই হ্যাঁ-না ভোট এবং পরে গাছ মার্কা ‘প্রতিনিধি’র বিপক্ষে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। কিন্তু, একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রচুর মানুষকে খুন করে ক্ষমতা পাকা করেছেন। এরশাদ যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার সহযোগী ছিলেন কিন্তু পূর্বসূরির রক্তাক্ত কার্যকলাপ থেকে নিজেকে আলাদাভাবে তুলে ধরার জন্য বলতেন, ‘আমার হাতে রক্তের দাগ নেই।’ জিয়া দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেছেন, দেশের মৌল নীতি নষ্ট করেছেন, ক্ষমতায় এনেছেন মৌলবাদী পরাজিত শক্তিকে। সিসি সেনাবাহিনীর মধ্যে খুন খারাবি করেননি, পরাজিত শক্তিকে ক্ষমতায় আনেননি বরং আফ্রিকার আরেকটি দেশকে মৌলবাদীরা যখন জঙ্গীবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিচ্ছে তা প্রতিরোধ শুধু নয়, সমূলে উৎপাটন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আর রাজনৈতিক দল, মধ্যবিত্ত, ছাত্রসমাজ এই উদ্যোগকে সহায়তা করেছে, করছে, স্বাগত না জানালেও। বছর কয়েক আগেও ক্ষমতাসীন ব্রাদারহুড ও প্রেসিডেন্ট মুরসি স্বপ্নেও ভাবেননি ব্রাদারহুডের অবস্থা এমন হবে। মুরসি মিসরকে হয়ত নাইজিরিয়া বানিয়ে ফেলতেন, হয়ত বর্তমান আইএসের সহযোগী হতেন, সিসি সেটি ঠেকিয়েছেন আপাতত। মিসরে জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত। তুরস্কেও ব্রাদারহুড শাসন করছে কিন্তু বাস্তব বিবেচনা করে ধীরে ধীরে তারা এগুচ্ছে। তুরস্কে রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী, এর সেক্যুলার ঐতিহ্য ১০০ বছরেরও পুরনো। তাই ব্রাদারহুড সেখানে মৌলবাদ ধীরে ধীরে গেলাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে ব্রাদারহুড। সেক্যুলারপন্থীরা যখন তা অনুধাবন করবে তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। মিসর, তুরস্কের ব্রাদারহুডকে আমাদের জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তা’হলে পুরো বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হবে।

কায়রো, আসওয়ান, লুক্সর, আলেক জান্দ্রিয়ায় নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। একটি বিষয়ে সবাই একমত ‘বিজনেস ইজ ব্যাড’। মিসর নির্ভরশীল পর্যটন ব্যবসার ওপর। গত চার বছর অর্থাৎ হোসনি মোবারকের পতনের শেষ বছর থেকে পর্যটক আসা কমে গেছে। এখন সিজন, কিন্তু পর্যটকদের দেখা নেই। রুশ বিমান দুর্ঘটনা পর্যটক আসা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। প্যারিসের ঘটনার পর সবাই আতঙ্কে আছে। তাদের ভাষ্য, মুরসির আমল থেকে ব্যবসা সেই যে খারাপ হওয়া শুরু করল এখন পর্যন্ত তা আর চাঙ্গা হলো না। কায়রোর পিরামিডের কাছে আবওয়া পরিহিত স্থানীয় গাইড বা আসওয়ানের সামান্য ব্যবসায়ীর [দু’একজন] মতে, মুরসির সময় ব্যবসা ভাল ছিল। এর অর্থ ব্রাদারহুডের সমর্থক এখনও রয়ে গেছে, তবে, তারা নিশ্চুপ। ব্রাদারহুড মিসরের সবচেয়ে পুরনো দল। এত সহজে তাকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে বলে মনে হয় না।

প্যারিসের ঘটনার পর তরুণ-প্রৌঢ় শিক্ষিত যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে, এক বাক্যে সবাই বলেছেন, এটা পাগলামি, এসব চলতে দেয়া যায় না এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত একটি বিষয়ে একমত যে, সবকিছুর জন্য আমেরিকা দায়ী। প্যারিসের ঘটনা ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতি আরও কমাবে।

খালেদা জিয়া-নিজামী ক্ষমতায় এসেই ভেবেছিলেন তাদের সমর্থক সারাদেশে সুতরাং আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার এখনই সময়। প্রথম দিন থেকে তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এখন তার প্রতিফল পাচ্ছেন। একদিক থেকে আমি মনে করি, খালেদা-নিজামীর শাসনটি ছানিপড়া বাঙালীর ছানি খানিকটা কেটেছে। তুরস্কের মতো যদি তারা কার্যক্রম নিত তা’হলে আওয়ামী লীগের বড় একটা অংশ তাদের সমর্থন করত এবং এখন শেখ হাসিনা মৌল জঙ্গীবাদ ঠেকাতে পারতেন না, অন্তত এই নতুন আওয়ামী লীগ দিয়ে নয়। মুরসি, খালেদা-নিজামীর মতো কার্যক্রম শুরু করেছিলেন অর্থাৎ ব্রাদারহুডের একছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলেন তড়িঘড়ি করে। সেনাবাহিনী এবং তাদের সমর্থক বিগ বিজনেস সেটা পছন্দ করেনি। অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতে। এমন এক অস্থিতিশীল অবস্থা তারা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ যারা বুঝে না বুঝে ব্রাদারহুডকে ভোট দিয়েছিল তারাও ব্রাদারহুডের বিপক্ষে চলে যায়। সিসি সেই সুযোগে ব্রাদারহুডের বিপক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় এসে ক্ষমতা দখল করেন।

মিসরের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষজন বলছেন, সিসি ব্রাদারহুডের শিকড় যেভাবে উৎপাটন শুরু করেছেন অতীতে কেউ আর তেমনভাবে করেননি। ব্রাদারহুড এটি অনুভব করেছিল সেদিন যেদিন তারা কায়রোর এক মসজিদকে কেন্দ্র করে সমাবেশ ও মিছিল করেছিল। সেদিন পুলিশ সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে, মসজিদে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাও রক্ষা পায়নি। সেদিন সাধারণ মানুষ আর পুলিশকে প্রতিরোধ করেনি। হোসনি মোবারকের আমলের শেষ দিকে পুলিশ পেলেই সাধারণ মানুষ পেটাত। পুলিশ ভয়ে ইউনিফর্ম পরা ছেড়ে দিয়েছিল। এরপরও বিভিন্ন জায়গায় ব্রাদারহুড সমাবেশ মিছিল করতে চেয়েছে। তাদের দাঁড়াতে দেয়া হয়নি।

সিসি এরপর কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে মুরসি ও নেতৃস্থানীয়দের গণগ্রেফতার শুরু করেন। গণবিচারে ফাঁসির দ-াদেশ দেয়া শুরু হয়। একদিনে ১০০ জনেরও বেশি ব্রাদারহুড নেতার ফাঁসির আদেশ হয়। একই সঙ্গে তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট থেকে উৎখাত শুরু হয়। আমি যে এলাকায় থাকছিলাম, তার কাছাকাছি ব্রাদারহুড এক নেতার বাড়ি ছিল। ড্রাইভার জানাল, পুলিশ আর্মি এসে সে বাড়ি তছনছ করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভার আরেকটি গল্প বলল, তার ডাক্তার কোন পার্টি করে না তবে, শ্মশ্রুশোভিত ধার্মিক মানুষ। হাসিখুশি, সিসির ব্রাদারহুড দমনের প্রথম পর্যায়ে ড্রাইভার ডাক্তার দেখাতে গিয়ে অবাক। ডাক্তারের গাল সাফফান সাফা। অর্থাৎ দাড়ির চিহ্নমাত্র নেই। ডাক্তার বললেন, সাবধানের মার নেই। আমি ব্রাদারহুড করি বা না করি পুলিশ এসে দাড়ি দেখলেই তো আমাকে ব্রাদারহুড মনে করে প্রথমে একটা ধোলাই দেবে। সে ধোলাই সহ্য করতে পারব না।

আইডি কার্ডে ধরা গেল, একজনের দাড়িবিহীন ছবি আছে। পরে হয়ত দাড়ি রেখেছে। পুলিশ আইডি চেক করার সময় যদি এই অসঙ্গতি ধরা পড়ে তা হলে কপালে দুঃখ আছে।

মিসরে এখন অনেকেই শ্মশ্রুবিহীন থাকা নিরাপদ মনে করেন।

ব্রাদারহুডের পরিবারের চাকরি পাওয়াও এখন মুশকিল। শুনেছি, সত্যমিথ্যা বলতে পারব না, দাদা হয়ত ব্রাদারহুড করতেন সে কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নাতির চাকরি হচ্ছে না। বাংলাদেশের জামায়াতের মতো ব্রাদারহুড যেসব অর্থনৈতিক স্বার্থ গড়ে তুলেছিল সেগুলো থেকেও তাদের উৎপাটন করা হচ্ছে।

ব্রাদারহুড মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করত। মূলত মিসরে মৌলবাদ জঙ্গীবাদ ছড়িয়েছিল মসজিদ এবং ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে। বাংলাদেশেও মৌলবাদ ছড়িয়েছিল ওয়াজ ও মসজিদের বয়ানের মাধ্যমে। বিএনপি আমলে জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠলে মসজিদগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রধানত অর্ধশিক্ষিত সুরা মুখস্থ করা ইমামদের মাধ্যমে। সাঈদী, আহমদ শফিদের অশ্লীল অসত্য বয়ান তৃণমূলে তাদের সমর্থক বৃদ্ধি করে। সিসি সরকার এক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে।

লুক্সরে গত রবিবারের ইংরেজী ‘ডেইলি নিউজ’ পড়ছিলাম। সেখানে এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে জানলাম, মিনইয়া প্রদেশে ধর্ম মন্ত্রণালয় পাঁচ জন ইমামকে সাসপেন্ড করেছে কারণ শুক্রবারের খুতবার জন্য যে রূপরেখা দেয়া হয়েছিল তারা তার ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে যারাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের রূপরেখা না মেনে বয়ান দিয়েছেন তাদেরই কর্মচ্যুত করেছেন। এর সংখ্যা কয়েক ডজন। এর অন্য অর্থ যা আগে উল্লেখ করেছিলাম, ব্রাদারহুড সমর্থকরা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আরেকটি বিষয় বোঝা গেল, মসজিদে কি বলা যাবে কি বলা যাবে না তার রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এবং ইমামদের লাইসেন্স নিতে হয় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের থেকে। প্রতি সপ্তাহে বুধবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই প্রকাশ করা হয় মসজিদে বয়ান কি বিষয়ে দেয়া যাবে। গত সপ্তাহে বিষয় ছিলÑ সংলাপে সংযম [দি ডিসিপ্লিন অব ডায়লগ] । যে পাঁচ জন বয়ান করছিলেন তারা বয়ান করছিলেন সময়ের গুরুত্ব [ইমপর্টেন্স অব টাইম] নিয়ে।

আর কয়েক দিন পর লুক্সরে ৭০টি ‘ইসলামী’ দেশের ধর্মবিষয়ক প-িতদের নিয়ে একটি সভা হবে। সেখানেও ইমামদের বয়ান নিয়ে আলোচনা হবে। আরও আলাপ হবে উগ্রপন্থা কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় তা নিয়ে।

উগ্র জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায় মসজিদ নিয়ন্ত্রণ। মিসর সরকার কার্যকর একটি পন্থা গ্রহণ করেছে। আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ হজের ব্যবস্থাপনা, এ নিয়ে বিভিন্ন স্তরে টাকা আদান-প্রদান। এবং প্রতিবছরই হজ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা হচ্ছে। হজ আউটসোর্সিং করে দিলে মন্ত্রণালয়ের আর কোন কাজ থাকে না।

কায়রো, ২০.১১.২০১৫ (বাকি অংশ আগামীকাল)