২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঙালীর সম্প্রীতি বন্ধন নবান্নে মাছের মেলা

সমুদ্র হক ॥ গাঙের পানি নিরবধি সাগর পানে চায় আর দিনে দিনে চন্দ্রকলা পূর্ণিমারে পায়.... বাঙালীর সম্প্রীতির চিরন্তন বন্ধন এভাবেই পূর্ণতা পেয়েছে অনাদিকাল ধরে। এবারের নবান্নেও সেই পূর্ণতার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। আরও বেড়েছে। বঙ্গাব্দের তারিখে দেশের পঞ্জিকা অনুযায়ী অগ্রহায়ণের প্রথম দিন নবান্ন। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরাতন নিয়মে পরের দিন নবান্ন উৎসব করে। এই দিনে মাছের মেলারও আয়োজন হয় গ্রামের কোন বটতলায় হাটখোলায় নদীর ধারে কোন পাথারে।

এবারের ব্যতিক্রমী চিত্র হলো, এক দিনের মেলা একেক স্থানে একেক দিনে হওয়ায় তা সপ্তাহ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আবার কোন স্থানে এক দিনের মেলা টেনে নেয়া হচ্ছে কয়েক দিন। বিশেষ করে পুরানো মেলাগুলো বাঙালীর শিকড়ের সম্প্রীতির টানে আপন গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলী গ্রামের মাছের মেলা। জনশ্রুতি আছে এবং প্রবীণরাও বলেন, এই মেলার উৎপত্তি দুইশ’ বছরেরও আগে। যাদের বয়স নব্বইয়ের প্রান্তে (অশীতিপর বৃদ্ধ) তাদের কথা-শিশু বেলা থেকেই এই মেলা দেখছেন। যেখানে সকল বর্ণের সকল ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করে। সকলেই মিলে মিশে মাছ কিনে নতুন চালের আটা কুটে (ভেঙ্গে) পিঠা পুলি বানায়। শিবগঞ্জের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর মাছ তো আছেই অন্য নদী থেকেও জেলেরা মাছ ধরে আনত। নদীর মাছের স্বাদই আলাদা। সম্প্রীতির মেল বন্ধনের চিরন্তন ঢেউ আজও সমান ধারায় বয়ে চলেছে।

শুকনো মৌসুম শুরুর এই সময়টায় নদ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। তারপরও জেলেরা মিলন মেলার আবেগে মাছ নিয়ে আসে। উথলী গ্রামের প্রান্তরে শুরু হওয়া এই মেলার রেশ এখনও রয়ে গেছে। আশপাশের গ্রাম সাদুল্লাপুর, বেড়াবালা, রথবাড়ি, নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, দেবীপুর, রহবল, আকনপাড়া, গুজিয়া বাকশন মেদিনীপাড়া গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নবান্নের আনন্দধারা বইছে। সকল ধর্মের মানুষের ঘরে নবান্নকে ঘিরে কুটুম্বর (আত্মীয় স্বজন) আসা যাওয়ার পালা চলছে। গাঁয়ের লোক জানালেন, আগে নবান্নের আনুষ্ঠানিকতা হতো একদিন। এখন অঘ্রাণের অনেকটা সময় ধরে চলে কুটুম্বদের সঙ্গে। মাছের মেলার অনুসঙ্গে নবান্ন আরও গতি পেয়েছে। মাছের মেলায় কত ধরনের যে বড় মাছ ওঠে। রুই কাতলা মৃগেল চিতল বোয়াল....এগুলোর ওজনও বেশি। ২শ’ টাকা কেজি থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত। রহবলের আনসার আলী বললেন ‘নাবানে মেয়ে জামাই ডাক্যে আনছি, বড় মাছ না খিলালে হবি...’। মনতাজ বললেন ‘খালি মাছ! পিঠা পুলি খাওয়ান লাগবি। জামাই জানি কোদ্দ (রাগ বা অভিমান) না করে।’ দীনেশ নাথ বললেন ‘আমরা হগলি (সকলে) এখন এক সাথে নাবন করি’। শিবগঞ্জের সমাজকর্মী রতন রায় বললেন ‘সম্প্রীতির অটুট বন্ধনে আমরা একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেই।’