১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রমনায় সান্ধ্য ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

  • শরীর চর্চায় বিড়ম্বনা

এমদাদুল হক তুহিন ॥ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রমনা পার্ক কেবল নগরবাসীর নির্মল বিনোদন কেন্দ্রই নয়, সান্ধ্য ও প্রাত:ভ্রমণের অন্যতম একটি স্থান। অথচ অন্ধকারাচ্ছন্ন এ পার্কেই চুরি ছিনতাই প্রতিরোধের কথা বলে সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ রয়েছে এখন! ফলে নিয়মিত হাঁটতে আসা প্রবীণ নাগরিকদের পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো নিরপত্তা বলয়ে আবৃত থাকা সত্ত্বেও পার্কের নিরাপত্তা দিতে না পারায় নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে রমনা পার্ক। শহরে অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকায় অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প রাস্তা হিসেবেও কেউ কেউ বেছে নেন পার্কের ফুটওয়ে। আর প্রাত:ভ্রমণের অন্যতম স্থান হিসেবে পার্কটির পরিচিতি বহু বছরের। দেখা গেছে, পার্কটিতে শরীরচর্চার সঙ্গী হিসেবে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আসেন পিতা। বাবার সঙ্গে আসা শিশুরাও মেতে ওঠেন শরীর চর্চায়। দর্শনার্থী হিসেবে ঘুরতে আসা শিশুরা পরিচিত হচ্ছে নানা প্রজাতির সঙ্গে। অন্যদিকে বেঞ্চে বসে কপোত-কপোতীকে আড্ডা দিতে দেখা গেলেও একা একাও ঘুরতে যান অনেকেই। জানা যায়, একাকী একা বসে থাকার জন্যেও কোন অংশে পার্ক কম নয়। কানে হেড ফোন চেপে প্রিয় কোন গান শুনতে থাকা অবস্থায় রমনার লেকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকামাত্রই যে কেউ উদাস হতে বাধ্য। মধ্য দুপুরে পার্কের বেঞ্চে বসে গ্রামের পুকুর পাড়ের স্মৃতিতেও হারিয়ে যান অনেকে। এমনকি বেঞ্চিতে বসে কিছুটা উদাস সময় কাটানোর মুহূর্তেই চোখে পড়তে পারে কাঠবিড়ালি। অবিশ্বাস্য নয়, এটিই সত্যি। রবিবার সরেজমিনে পার্ক ঘুরে ও বসে থাকা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এমনটি।

নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, আনুমানিক ৮ হাজার মানুষ প্রতিদিন এ পার্কে প্রাত:ভ্রমণে অংশ নেয় । আর দর্শনার্থীর সংখ্যা কমপক্ষে দেড় থেকে ২ লাখ। তবে এ সংখ্যা আরও কম বা বেশি হতে পারে।

গণপূর্ত অধিদফতরের তথ্য থেকে জানা যায়, ৬৮ দশমিক ৫০ একর জমির ওপর ১৯৪৯ সালে পার্কটি স্থাপিত হয়। স্থাপনকালে এর উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা ছিল ৭১টি। বর্তমানে এর উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১১টি। এর মধ্যে ফুল ও শোভাবর্ধক প্রজাতির সংখ্যা ৮৭টি, ফল জাতীয় উদ্ভিদ ৩৬টি, ঔষধী প্রজাতি ৩৩, কৃষি বনায়নের উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি, বনজ জাতীয় উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি, জলজ উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি ও মশলা উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি। এছাড়া পার্কটিতে ৮ হাজার ৭৬ একর জমির ওপর একটি লেক রয়েছে, এটি ৯ থেকে ৯৪ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত ও লম্বায় ৮১২ মিটার ।

ছায়া সুনিল, অনেকটা মায়াময়! লেকের টলমলে পানি। পার্কের যতটা ভেতরে যাওয়া যায়, মনে হয় ঠিক যেন চলে এসেছি কোন বনে। দেখা মেলে ফটোগ্রাফরের দল। অধিকাংশই সখের; গাছের, পাখির, ও লেকের ছবি তোলায় মত্ত তারা। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে লাজুক বান্ধবীটাও হয়ে ওঠে ’মডেল কন্যা’। তরুণীদের নানা ঢঙ ও ভঙ্গিমায় মেতে থাকতে দেখা যায় পার্কটিতে। এমনকি বড়রাও মেতে ওঠেন ওঠে সময় বন্দীর নেশায়।

মন ভরিয়ে দেয়ার মতো নানা সুবিধার মধ্যেও পার্কের ফটকগুলোতে একটি নির্দেশনা ঝুঁলিয়ে দেয়ায় শুরু হয়েছে বিড়ম্ব^না। পার্কে এখন সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবীণ নাগরিকররা। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ‘সন্ধ্যা ৭ ঘটিকার পূর্বে সকল দশনার্থীগণদের রমনা পার্ক ত্যাগ করার জন্যে অনুরোধ করা হইল’ সম্বলিত সাইনবোর্ড ঝুলছে রমনার প্রতিটি ফটকে। যেখানে ‘দর্শনার্থী’ শব্দটির বানানেও রয়েছে ভুল, লেখা রয়েছে ‘দশনার্থী’!

বর্তমানে পার্কের লেকে গোসলও নিষিদ্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের যে কোন সময়ের তুলনায় রমনা পার্ক এখন অনেক নিরাপদ। নেই কোন হকারের উৎপাত। বিরক্তিকর ঘটনাগুলো আর ঘটে না হারহেমাশায়। তবু নিরপত্তাহীনতার কথা বলে সন্ধ্যা ৭টার পর পার্কে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করায় হতাশ অনেকেই। অফিসের কাজ শেষে প্রাত:ভ্রমণে আর পার্কে প্রবেশ করতে পারেন না অনেকেই। বিড়ম্বনার শিকার হতে পারেন এমন অশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রবীণ নাগরিক জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা যারা চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীÑ তারা মূলত সন্ধ্যার পরই পার্কে যাই। কেউ কেউ কিছুক্ষণ ব্যায়াম করে বাসায় ফেরেন। কিন্তু সাইনর্বোড ঝুলিয়ে দেয়ায় আমাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। এখন আর রাতে প্রবেশ করতে পারছি না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, পুলিশের আইজির বাড়ি থেকে পার্কের দূরত্ব ১৫০ গজ। পাশেই দুটি থানা ও মন্ত্রী পাড়া, অথচ পার্কের নিরাপত্তা নেই। বিশাল এলাকার নিরাপত্তা দিতে পারলে শুধু পার্কে নিরাপত্তা দিতে তারা অপারগ!

রমনা পার্কের মৎস্য ভবন সংলগ্ন ফটকের সামনের কয়েকজন দোকানদারে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহু দর্শনার্থীকে এখন ফটকের কাছ থেকে এসে ফিরে যেতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানদার বলেন, ‘কে ব্যায়াম করতে আসেন, আর কে ঘুরতে আসেনÑ তা তো সাধারণভাবে বুঝার কথা নয়। অনেকেই ফিরে যেতে দেখি।’ আরেক দোকানদার রবিউল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ভেতরের পরিবেশ এখন অনেক ভাল। নিরাপত্তা কর্মীরা সাদা পোশাকেও পার্ক পর্যবেক্ষণ করেন। হকার নেই বললেই চলে।’ শাহবাগ শিশুপার্ক সংলগ্ন অস্তাচল গেটেও ঝুঁলছে ওই নির্দেশনা। ফটকে দায়িত্বরত এক সদস্যও বিষয়টি স্বীকার করেন।

পার্কে কথা হয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোঃ করিমের সঙ্গে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সাধারণত আমরা যারা অফিস পাড়ায় কাজ করি তারা সন্ধ্যার আগে ফ্রি হতে পারি না। আমিও এর ব্যতিক্রম নয়। এখন সাতটার পর রমনায় আর প্রবেশ করা যাচ্ছে না। আবার ভেতরে থাকলেও বের করে দেয়া হয়। ফলে একদিকে বিড়ম্বনায় অছি। আরেক দর্শনার্থী মোঃ সেলিম বলেন, সমস্যা আসলে আমাদের। আমরা নিজেরাই এর জন্য দায়ী। নতুবা কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতো না।

পার্কের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী প্লাটুন কমান্ডার শহীদুল ইসালাম জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যক্তি বিশেষ ছাড়া সন্ধ্যা ৭টার পর এখন আর পার্কে কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। ডিএমপির নির্দেশনার কারণ আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, এখানে থাকা প্রতিটি আনসার সদস্য ন্যায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দায়িত্বের তুলনায় জনবল কম।

তিনি আরও জানান, হকারের উৎপাত এখন আর নেই। দর্শনার্থীদের বিরক্তের উদ্রেক হয় এমন কোন ঘটনাই আর পার্কে ঘটে না। পার্কে গোসলও বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে পার্কের অভ্যন্তরের অবস্থা এখন নিরাপদ।

নিরাপদ বলা হলেও নির্দেশনা এখনও বহাল। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ মশিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, অন্ধকার পার্কে চুরি ছিনাতাইয়ের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার জন্যই সন্ধ্যার পর পার্কে দর্শনার্থী প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত দর্শনার্থীরা রাতে পার্কে প্রবেশ করেন না। যারা থাকেন তাদের নিরাপত্তার জন্যেই এ সিদ্ধান্ত। অপাতত এ নির্দেশনা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।’