২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হুকুমের অপেক্ষা ॥ জল্লাদ প্রস্তুত

  • প্রাণভিক্ষা নিয়ে সাকা মুজাহিদের নানান বাহানা

আরাফাত মুন্না ॥ একাত্তরের দুই কুখ্যাত মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রাণভিক্ষার বিষয়টি ঝুলিয়েই রেখেছেন। নিজেদের দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি করবেন না, শুক্রবার কারা কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলেও স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি এই দুই যুদ্ধাপরাধী। এদিকে, সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরে সমস্ত প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছে। সচিবালয়ে ফাঁসি পূর্বক বৈঠকও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফাঁসির মঞ্চ, জল্লাদরাও রয়েছে হুকুমের অপেক্ষায়। সম্পন্ন হয়েছে সাকা-মুজাহিদের মেডিক্যাল চেকআপও।

কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রাণভিক্ষা চাওয়ার বিষয়টি অনেকটা ঝুলিয়ে রেখেছেন যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। দুপুরে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি-না, তা জানতে সাকা ও মুজাহিদের সঙ্গে দেখা করেছেন সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির ও জেলার নেছার আলম। সিনিয়র জেল সুপার ও জেলার সাকা-মুজাহিদের সঙ্গে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো এ বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না- তা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি দু’জনই। তবে প্রাণভিক্ষার বিষয়টি সরাসরি স্পষ্ট না করলেও পরিবার এবং তাদের আইনজীবীর মাধ্যমেই জানাতে চান বলে আভাস দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, রিভিউ রায় পরবর্তী বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে আজ শনিবার সংবাদ সম্মেলন করবে যুদ্ধাপরাধী

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবার। দুপুর ১২টায় সুপ্রীমকোর্ট অডিটরিয়ামে এ সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানান মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে সুপ্রীমকোর্ট থেকে রিভিউ খারিজের রায় পাওয়ার পর তা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ। রায় হাতে পাওয়ার পর রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ইংরেজী থেকে বাংলা অনুবাদ করে পড়ে শোনানো হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা দেশের দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে।

এ বিষয়ে ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, আইনী সব বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের (সাকা-মুজাহিদ) সামনে কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগই বাকি আছে। তারা আবেদন না করলে বা রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা না পেলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে কারা কর্তৃপক্ষ, যার সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে।

গত বুধবার সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় দেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ রায় হয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। বৃহস্পতিবার এই দুই যুদ্ধাপরাধীর রিভিউ খারিজের রায়ে স্বাক্ষর করেন বিচারপতিরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ॥ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি-না, সে প্রশ্নের কোন জবাব এখনও পাননি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এখনও আমার কাছে কিছু আসেনি।

এর আগে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সরকার আইনের বাইরে কিছু করবে না। আইনে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা আছে, তার সবই করা হবে। মন্ত্রী বলেন, দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে কোন ধরনের অবনতি ঠেকাতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে। দেশের মানুষ রিভিউ খারিজের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সচিবালয়ে বৈঠক ॥ দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকর করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইজি (প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। শুক্রবার সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে সচিবালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়। ধারণা করা হচ্ছে এটিই ফাঁসির আগে উচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত বৈঠক।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বৈঠক শেষ করে আইজি (প্রিজন) দুপুর সাড়ে ১২টায় সচিবালয় থেকে বের হয়ে যান। বৈঠকে তিনি ফাঁসি সংক্রান্ত সব কাগজপত্রও বুঝে নেন। এরপর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে স্বরাষ্ট্র সচিব সচিবালয় থেকে বেরিয়ে যান। একজন অতিরিক্ত সচিবও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

ফাঁসির মঞ্চ ও জল্লাদ প্রস্তুত ॥ দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর করতে আবারও ডাকা হয়েছে দুই জল্লাদ শাজাহান ও রাজুকে। জল্লাদ শাজাহান ও রাজু অন্যদের চেয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সেই সঙ্গে সুঠাম দেহ ও অধিক মনোবলের কারণে জল্লাদদের তালিকা থেকে তাদের ডেকেছে কারা কর্তৃপক্ষ। এই দুইজনের পাশাপাশি সাত্তার নামে আরো একজন জল্লাদকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারা সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রথম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরে জল্লাদের ভূমিকা পালন করেন শাজাহান। অপরদিকে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকরে সময় জল্লাদের ভূমিকায় ছিলেন রাজু। জল্লাদ শাজাহান ১৪৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন কয়েদি। তিনি ৩৬ বছর ধরে কারাবাস করছেন। কারাগার থেকে দ্রুত মুক্তি লাভের জন্যই তিনি জল্লাদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন বলেও সূত্রটি জানায়।

এরই মধ্যে এরশাদ শিকদার, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৫ আসামি ও কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরে ভূমিকা রেখে তিন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গেছেন। অপরদিকে, জল্লাদ রাজু প্রায় ১৫ বছর ধরে কারাবাস করছেন। কারা সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর ফাঁসির জন্য মঞ্চের প্রস্তুতি অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। মঞ্চ ধোয়া-মোছা শেষে টানানো হয়েছে শামিয়ানা। ফাঁসির মঞ্চের চুনকামও শেষ। এখন রায় কার্যকরের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

সাক্ষাত পাননি আইনজীবীরা ॥ যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাকা চৌধুরীর সাক্ষাত পেতে তিন দফায় চেষ্টা চালিয়ে ফিরে গেলেন তার দুই আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান আল ফেসানী ও জাকারিয়া ইসলাম। শুক্রবার দুপুর পৌনে ২টা থেকে বিকেল পৌনে ৬টা পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে ওই লিখিত আবেদনটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাত করতে চান তারা। কিন্তু তৃতীয় দফার চেষ্টায়ও আবেদনটি গৃহীত না হওয়ায় ফিরে গেছেন তারা। তারা আবারও সাকা চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।

দুই আইনজীবী সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার সাকা চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। তাদের সঙ্গে আলাপের পর আমরা সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেই। তারা বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি-না, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে চেয়েছি আমরা। কিন্তু তিন দফায়ই কারাফটকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন নিয়ে গেলে তারা বলেন, উর্ধতন কর্মকর্তারা নেই। তারা এলে বিষয়টি জানানো হবে। তাই আজ আমরা ফিরে যাচ্ছি। তবে আবারও তার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করব।

অন্যদিকে, মুজাহিদের সঙ্গেও সাক্ষাতের অনুমতি পাননি তার আইনজীবীরা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবীরা। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কিছুই জানায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর মুজাহিদ বলেন, ‘আমাদের আইনজীবীরা সকালে বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি।’

সাকা-মুজাহিদের মেডিক্যাল চেকআপ সম্পন্ন ॥ দুই সাবেক মন্ত্রী শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের মেডিক্যাল চেকআপ সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে দু’জন কারা চিকিৎসক তাদের মেডিক্যাল চেকআপ সম্পন্ন করেন। মেডিক্যাল চেকআপে অংশ নেয়া ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা রাতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের মেডিক্যাল চেকআপ করেছি। উনারা সুস্থ আছেন। তাদের শারীরিক কোন সমস্যা নেই। তার সঙ্গে ডা. হাবিব নামে আরও একজন কারা চিকিৎসক চেকআপে অংশ নেন বলেও জানান বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস।