২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যেভাবে ফাঁসি কার্যকর

শংকর কুমার দে ॥ যেভাবে দ-িত কয়েদিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় তা জানা গেল ফাঁসি কার্যকরে অংশগ্রহণকারী প্রত্যক্ষদর্শী কারা কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া জবানবন্দীতে। ফাঁসির মঞ্চের সামনে বসানো হয় ইলেকট্রিক কেবল, উচ্চ ভোল্টের বাল্ব ও সার্চ লাইট। লাইটের আলো কারা প্রকোষ্টের অন্ধকার ভেদ করে বাইরে এসে আলো ছড়ায়। ফাঁসির মঞ্চের সামনে দাঁড়ানো দ-িত কয়েদি। দুই হাত পেছনে বাঁধা। দুই পা-ও বেঁধে দেয়া হয়। মুখম-লে জমটুপি পরানো দ-িত কয়েদি দাঁড়ানো। সতর্ক তীক্ষè দৃষ্টি সবার। জেল সুপারের হাতে লাল রুমাল। জেল সুপার লাল রুমাল হাত থেকে ফেলে দিলেন। অমনি কপিকলের গিয়ারে টান দিলেন জল্লাদ। গর্তের ওপরে থাকা পাটাতনের কাঠ সরে গেল। ফাঁসিতে ঝুলে গেল দ-িত কয়েদি। ফাঁসি কার্যকর করায় অংশগ্রহণকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী কারা কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কারাভ্যন্তরের ফাঁসি কার্যকর করার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া।

প্রত্যক্ষদর্শী ফাঁসিতে ঝোলানোয় অংশগ্রহণকারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। কি খেতে চান, জানতে চাওয়া হয় শেষ ইচ্ছার কথা। রক্তচাপসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন একজন সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে ডাক্তার। গোসল করানো হয়। নিয়মনীতি অনুযায়ী ফাঁসির কয়েদিকে মৌলভী এসে তওবা করানো হয়। ফাঁসি দেয়ার আগে প্রথমে কনডেম সেলে গিয়ে দ-িত ব্যক্তিকে কলেমা পড়ানো হয়। সামনেই থাকেন একজন ইমাম। কলেমা পড়ানোর পর মাথায় কালো রঙের জমটুপি পরিয়ে দেয়া হয় এমনভাবে যেন মুখম-ল ঢেকে যায়। তারপর দুই হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয়। জল্লাদ ধরে, ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে যায় ফাঁসির মঞ্চে। একটু দক্ষিণে গিয়ে ফাঁসির মূল মঞ্চ সামনে রেখে চলে যান পশ্চিমে। সেখান থেকে ঘুরে উত্তরে এগোলেই মূল ফাঁসির মঞ্চের সিঁড়ি। সিঁড়ির পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে মঞ্চে উঠতে হয়। মঞ্চে ওঠানোর পর যে গর্তটি কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা থাকে সেখানে দাঁড় করানো হয় দ-িতকে। তারপর ফাঁসির মঞ্চের সামনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আদেশ দানের অপেক্ষায় থাকেন ম্যাজিস্ট্রেটসহ কারা কর্মকর্তারা। ঘড়ি দেখে ইশারা দিতেই কারা কর্মকর্তার হাতের লাল রুমাল পড়ে যায়, অমনি জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের কপিকলের দড়িতে টানা দেয়। ফাঁসির রশিতে ঝুলে কূপের ভেতরে পড়ে দড়িতে ঝুলতে থাকে দ-িত। কারা কর্মকর্তাসহ কর্তব্যরত উপস্থিতদের দৃষ্টি ঘড়ির দিকেই। নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। ফাঁসির মঞ্চের গর্তের ভেতরে ঝুলে আছে দ-িত কয়েদির কাছে গেলেন জল্লাদরা। মরদেহ ফাঁসির মঞ্চের গর্ত থেকে টেনে ওঠানো হয় মঞ্চে। তারপর দড়ি খুলে মরদেহ রাখা হয় ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সামনের টেবিলে। এভাবেই হয়ে গেল দ-িত কয়েদির ফাঁসি কার্যকর। ফাঁসি কার্যকর করার সময় ফাঁসির মঞ্চের সামনে উপস্থিত থাকেন ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন, কারা কর্মকর্তা, পুলিশ, জল্লাদসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দণ্ডিত কয়েদির ফাঁসি কার্যকর করার আগে মহড়া হয়। দ-িত কয়েদির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন ডাক্তার। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় জল্লাদদেরও। দ-িত কয়েদির গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলানোর জন্য আনা হয় ম্যানিলা রোপ (দড়ি)। ম্যানিলা রশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন উর্ধতন কারা কর্মকর্তারাও। রশিতে মাখানো হয় তেল আর পাকা কলা। এই দড়িটি পিচ্ছিল করে জল্লাদরা। যে পাটাতনটির ওপর কয়েদিকে দাঁড় করানো হবে সেই পাটাতন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় কয়েক দফায়। পাটাতন ও রশির কপিকলগুলোতে দেয়া হয় বিশেষ ধরনের তেল। ফাঁসি কার্যকর করার সময় বিশেষ ইঙ্গিত বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় বিশেষ লাল রুমাল। এটা থাকে জেল সুপারের হাতে। লাল রুমাল ফেলে দিতেই জল্লাদ কপিকলের গিয়ারে টান দিয়ে দ-িত কয়েদিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিবে- এই নির্দেশ দেয়া হয়।

কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কোনার দিকে রয়েছে ফাঁসির মূল মঞ্চ। ফাঁসির মঞ্চের দৈর্ঘ্য ৮ ফুট ও প্রস্থ সাড়ে ৪ ফুট। পাশাপাশি দু’জন দণ্ড প্রাপ্তের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা রয়েছে ফাঁসির মঞ্চে। মঞ্চের ওপরে যে ফাঁসির কাষ্ঠ তার উচ্চতা ৮ ফুট। আর মঞ্চ থেকে নিচের দিকে যে গর্ত আছে তা ১২ ফুট গভীর। গর্তটি কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢাকা। ফাঁসি কাষ্ঠের লাগোয়া উত্তর দিকে আছে কপিকলের গিয়ার। এই কপিকলের সঙ্গে ফাঁসির দড়ি লাগানো থাকে এক প্রান্তে। আরেক প্রান্তে থাকে ফাঁসির কাষ্ঠের যেই দড়ি দিয়ে ঝুলানো হবে সেটা। কপিকলের গিয়ারের দায়িত্বে থাকেন একজন। তার পাশে পূর্ব দিকে অবস্থান নেন আরও তিনজন। মূল মঞ্চসহ পুরো ফাঁসির মঞ্চটি আরও বড়। মূল মঞ্চের পূর্ব দিকে রয়েছে ৩টি কনডেমড সেল। দক্ষিণে একটি লম্বা টেবিল আছে, যার পাশে বসতে পারেন অন্তত ১০ জন। তার সামনে আরেকটি টেবিল থাকে, যাতে ফাঁসি কার্যকর করার পর রাখা হয় মৃতদেহ। ফাঁসি কার্যকর করার সময় সতর্ক প্রহরায় অবস্থান নেয় অন্তত ১০ জন সশস্ত্র কারারক্ষী। সবার হাতে থাকে ভারি আগ্নেয়াস্ত্র। একটি ফাঁসির দণ্ডিত কার্যকর করতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মূল ফাঁসির মঞ্চে সময় নেয় ১৭ মিনিট। মূল ফাঁসির মঞ্চের কাছেই আছে তিনটি কনডেমড সেল। ফাঁসি দেয়ার আগে দ-প্রাপ্ত আসামিকে রাখা হয় এই সেলেই। সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চের দূরত্ব ৫০ গজেরও কম। জল্লাদরা সেল থেকে দ-িত কয়েদিকে হাঁটিয়ে আনেন মূল ফাঁসির মঞ্চে। মঞ্চের কপিকলের গিয়ারের কাছে অবস্থান নিয়ে প্রস্তুত হন কর্তব্যরত ও উপস্থিতরা। জল্লাদরা ফাঁসির রজ্জু পরিয়ে দেয় দ-িত কয়েদিকে। কনডেমড সেল থেকে মঞ্চ পর্যন্ত এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে একজন কয়েদিকে নিতে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ মিনিট। ১৭ মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর নিচের দিকে থাকা গর্তের গেট দিয়ে গর্তের ভেতরে প্রবেশ করেন জল্লাদরা। মরদেহ আবার গর্ত থেকে টেনে মঞ্চে ওঠানো হয়। তারপর মরদেহের দড়ি খুলে দেয়া হয়। লাশ নেয়া হয় পাশের মর্গে। স্পাইনাল কর্ড ও হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এভাবে আধা ঘণ্টায় শেষ হয় মৃত্যুদ- কার্যকরের যাবতীয় আনুষ্ঠনিকতা।

এভাবেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আরেক জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সর্বোচ্চ আদালতে অপর মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী) ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির দ- কার্যকর করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এভাবেই মহড়া দেয়া হয়েছে।