২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিষকাঁটা মুক্ত সোনার বাংলা, নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়

বিষকাঁটা মুক্ত সোনার বাংলা, নতুন সূর্য  ওঠার এই তো সময়
  • আঁস্তাকুড়ে অন্ধকারের শক্তি

মোরসালিন মিজান

বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা/ এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা।/ স্বর্গ কি হবে না কেনা।/বিশ্বের ভাণ্ডারী শুধিবে না/ এত ঋণ?/ রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন...। দিন এসেছে। আবারও আলোয় ঢেকেছে সব কালো। নতুন সূর্যোদয় দেখেছে ‘আমার সোনার বাংলা’। আজ রবিবারের ভোর কেবল একটি ভোর নয়, বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ। অন্ধকারের শক্তিকে পেছনে ফেলে, পায়ে মারিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আর পেছনে পড়ে রইল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো ঘাতকরা। একাত্তরের দুই খুনীর প্রাপ্য সাকুল্যে বুঝিয়ে দিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। শনিবার মধ্যরাতে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে পাকিস্তানের পা চাটা গোলামদের। গতকাল পর্যন্ত দুই বিষকাঁটা দেশমাতার বুকে গেঁথে ছিল। সেই কাঁটা উপড়ে ফেলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সত্য ও ন্যায় আরও উদ্ভাসিত হলো। অন্যদিকে ইতিহাসের ভাগারে ঠাঁই হলো স্বজাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বেঈমানদের। একাত্তরের খুনী ধর্ষক ও অগ্নিসংযোগকারীর ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে আরও একবার জয় বাংলার জয় ঘোষণা করা হলো। বাংলার আকাশ আজ আরও বেশি সুন্দর। আরও বেশি বিশুদ্ধ আজ বাংলার বাতাস। কবিগুরুর ভাষায়Ñ বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফলÑ/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক ...। আরও যারা যুদ্ধাপরাধী, বিচার চলছে যাদের, তাদেরও একই পরিণতি হবেÑ এ কথা আজ জোর দিয়ে বলা যায়।

কেন এই পরিণতি? কেন মৃত্যুর খবরেও হা.. হা... হা... হেসে ওঠে বাংলাদেশ? সেই ইতিহাস সবার জানা। তবুও আজকের দিনে একটু পেছনে ফেরা জরুরী। আর তাহলে দিব্যি দেখা যাবে, সাকা-মুজাহিদরা মানুষের মতো দেখতে ছিল বটে। আদতে নরপশু। গোটা জাতি যখন স্বাধিকারের জন্য লড়ছে, এরা তখন বেজন্মার ভূমিকায়। ভাইটি হয়ে ভাইয়ের বুকে ছুরি চালিয়েছে। অসহায় বোনকে তুলে দিয়েছে পাকিস্তান আর্মির বাঙ্কারে। ঘর-বাড়িতে আগুন দিয়েছে। লুট করেছে। এই মানবতা বিরোধীদের অন্যতম প্রধান দুজন: সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদ। পাকিস্তানের দালাল মুসলিম লীগ নেতা ফকা চৌধুরীর পুত্র সাকা একই আদর্শ বুকে ধারণ করেছিল। একাত্তরে চট্টগ্রামের মাটিকে রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে অট্টহাসি হেসেছিল সাকা। মুজাহিদ ছিল আলবদরের শীর্ষ নেতা। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নেয় সে। অথচ কী নির্মম ইতিহাস! বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এদের স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্বাসিত করা হয়। শুধু কী তাই? সাকা-মুজাহিদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয় জাতীয় পতাকা। স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। একই কাজ করেছেন স্বৈরাচার এরশাদ। সেনাশাসক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য করেন। শহীদের রক্তে ভেজা জাতীয় পতাকা ওঠে পাকিস্তানী এজেন্টের গাড়িতে। ২০০১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। তিনি একই ব্যক্তিকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের আশীর্বাদ নিয়ে ক্ষমতায় আসা খালেদা মন্ত্রী করেন মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে। উভয়ের গাড়িতে ওড়ে জাতীয় পতাকা। ক্ষমতার দম্ভে মুজাহিদ একাত্তরের গণহত্যাকে অস্বীকার করে। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়নি দাবি করে শহীদদের অপমান করে। আর সাকার অসভ্যতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের এই ইতর শ্রেণীর লোকটি অপমান করে চলে। সব দেখে মন গুমরে কেঁদেছে শুধু। বাংলাদেশ নিয়ে শঙ্কা বেড়েছে।

তবে, ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের ঋণ শোধ করার যে দায় সে দায় থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা সরকারে আসার পর বিচার শুরু হয় সাকা-মুজাহিদদের। তারও আগে ফাঁসি কার্যকর করা হয় কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের। সেটা ছিল শুরু। কিন্তু অনেকেই ভেবেছিলেন সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হবে না। সাম্প্রতিক সময়ের ষড়যন্ত্র সেই আশঙ্কাকে কিছুটা হলেও পোক্ত করে। আর তারপর সত্যের জয়। গীতি কবির ভাষায়Ñ কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধরাতে/ নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে নতুন সূর্য উদিত হলো বাংলায়।