২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘কত রঙ্গ জানোরে জাদু, কত রঙ্গ জানো’

  • শাহীন রেজা নূর

বিএনপি রাজনীতির মাহাত্ম্যই আলাদা। বিগত কয়েকটি বছর ধরে গণতান্ত্রিক পথে সরকারের বিরোধিতা করার পরিবর্তে শাঠ্য-ষড়যন্ত্র, আর চক্র-চক্রান্তের পথকেই শ্রেয়তর বিবেচনা করে বিএনপি ও তার দোসর জামায়াত সহিংস উপায়ে সরকার হটানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ২০০৮-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটাধিক্যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতালাভের অব্যবহিত পর থেকেই চলছে এই চক্রান্তের খেলা। সেবার সরকার গঠনের পরেই বিডিআর বিদ্রোহের নামে সরকারকে উৎখাত করার যে চক্রান্ত চলেছিল, তাতে বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধন পরবর্তী সময় প্রকাশ পেতে দেরি হয়নি। কিছুকাল আগে ধর্মব্যবসায়ীদের যাবতীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে হেফাজত নামক এক দানব সৃষ্টি এবং আন্দোলনের নামে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে অকালে বহু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও হত্যাকা- ঘটানোসহ নানাবিধ হিংসাত্মক পন্থায় সরকারকে ফেলে দেয়ার অবিরাম চেষ্টা যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো এবং বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া এবং তার গুণধর পুত্র তারেক জিয়ার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ল, তখন নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়া ছাড়া এদের আর উপায় কী! এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর পরই আইএস এসব ঘটাচ্ছে বলে বিএনপি-জামায়াতের তাঁবেদার হিসেবে কর্মরত কিছু দেশী প্রচার মাধ্যম আর অর্থের বিনিময়ে কিছু বিদেশী প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে দেশে আইএসের অস্তিত্ব থাকার কথা। প্রচারের উদ্দেশ্য একটাই- আর তা হলো বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে তাদের বিদেশী প্রভুদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়া। তাতে বিদেশী প্রভুদের দয়ায় পুনরায় ক্ষমতারোহণের পথ সুগম হতে পারে বলে তারা মনে করে। বিএনপি নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলে প্রচার করে বেড়ায়। কিন্তু তাদের বিগত কয়েক বছরের কার্যক্রমে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এটি না গণতান্ত্রিক দল, না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দল।

একটি গণতান্ত্রিক দল বিভিন্ন গঠনমূলক কর্মসূচী ও কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসমর্থন লাভে সচেষ্ট থাকে। ক্ষমতা লাভের জন্য জনদাবি আদায়ে জনগণের ভোটের ওপর নির্ভর করে। মোদ্দা কথা, নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচী পালনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। কিন্তু বিএনপিকে আমরা ঠিক এর উল্টো পথে হাঁটতে দেখি। জঙ্গীবাদী-ধর্মব্যবসায়ী ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিরোধী জামায়াত ও অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের বুলি কপচাতে শুনি।

ব্যারিস্টার মওদুদ মুক্তিযুদ্ধে স্বীয় ভূমিকা নিয়ে গর্ব করেন অথচ মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নাগরিকত্ব বাতিলকৃত পাকিস্তানী দালালদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে নানা কূটকৌশল প্রয়োগ ও ভুয়া বা মিথ্যা দলিল এবং মিথ্যা সাক্ষীর ব্যবস্থা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পৃষ্ঠে যে ছুরিকাঘাত করেছেন সে কথা কিন্তু তিনি বেমালুম চেপে যান। আর তাই তার পক্ষে একবার বিএনপি, একবার জাতীয় পার্টি বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী কোন সংগঠনকেই নিজ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয়াই স্বাভাবিক বৈকি! শুধু তিনি কেন, বিএনপির এক বৃহৎ অংশই ঐ একই ধারার ভূমিকা পালনের কারণে বিএনপি বা জাতীয় পার্টিকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল ঠাওরান। তাই এদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তারাও সত্য প্রকাশের সাহস খুইয়ে ফেলেছেন নিছক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থকে টিকিয়ে রাখার হীন উদ্দেশ্যে।

দেশবাসী যখন বেগম জিয়ার জনসভায় যুদ্ধাপরাধীদের ছবিসহ তাদের মুক্তির দাবিসংবলিত পোস্টার ও ব্যানারের সমাহার দেখতে পায়, তখন বেগম জিয়া এবং তার সাঙ্গাতদের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রীতি যে সর্বৈব মিথ্যা এবং মতলবী এক বিষয়মাত্র তা বুঝতে কারোরই কষ্ট হয় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের কার্যক্রম, রায় ইত্যাদিকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার জন্য জামায়াত-বিএনপি দেশে-বিদেশে যেসব লবিস্ট ও সাংবাদিক নিয়োগ করেছে, তাতে অনায়াসেই এদের অসাধুতা ও মতলবী স্বার্থ ধরা পড়ে যায়। বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ারা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের গৌরবজনক বিজয়ের কথা মুখে আনতেই ঢোক গেলেন। এর কারণ এ বিজয়কে এরা তাদের নিজেদের পরাজয় বলে মনে করে। কেননা, তাদের সাধের পাকিস্তান ছিল এদের কাছে মুসলমানত্ব ও ইসলামত্বের পরিপূরক।

৫ মে হেফাজতের ভয়াবহ উত্থানের পথ সুগম করতে এরশাদ, কাজী জাফর এবং এমন অনেককে যেভাবে হেফাজতীদের খেদমত করার জন্য মাঠে নামতে দেখা গেল তা থেকে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এসব তথাকথিত নেতা মিথ্যাচার, প্রতারণা আর মতলবী স্বার্থে রাজনীতি করেন।

জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতারোহণ, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে কৌশলী সম্মতি দান, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য ইনডেমনিটি জারি, খুনীদের বিদেশের দূতাবাসে নিয়োগ দান, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল ও ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের গর্ভে বিএনপির জন্মদান, দালাল আইন বাতিলকরণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ জলাঞ্জলি দান, রাজনীতিকে রাজনীতিকদের জন্য ডিফিকাল্ট করে তোলা, তারুণ্যের শক্তিকে অপচয়ের জন্য তাদের নীতিভ্রষ্ট করে নানা লোভ-প্রলোভন ও হিজবুল বহরে বিলাসভ্রমণের ব্যবস্থা, তাদের হাতে অবৈধ অস্ত্র তুলে দিয়ে পেশীশক্তিকে রাজনীতির নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করা, গোলাম আযম গংকে রাষ্ট্রে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া ইত্যাদি কর্মকা-ের মাধ্যমে প্রকারান্তরে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হয়ে দেশ শাসনের এক অভাবিত নজির স্থাপন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য। ২৭ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে বিএনপি যে নষ্ট রাজনীতি করেছে এতকাল, তাকে ঘৃণিত রাজনীতি বলাই সঙ্গত। অন্যদিকে, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে মহা আড়ম্বরে কেক কেটে মিথ্যা জন্মদিন পালনের কুরুচীপূর্ণ আনন্দ প্রকাশের মাধ্যমে বেগম জিয়া নিজেকে তো বটেই এমনকি তার দলকেও বছরের পর বছর অপমান করেছেন। ক্যান্টনমেন্টের একটি বাড়ি (অন্য আরও একটি সরকারী বাড়ি পাওয়া সত্ত্বেও) আদালতের রায়ে তাকে ছাড়তে হওয়ায় তিনি যেভাবে প্রকাশ্যে কেঁদেছেন তাতে এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি তার চরম উপেক্ষা ও অশ্রদ্ধাই প্রকাশ পায়। একজন রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রী যদি ত্যাগের প্রেরণা দ্বারা উজ্জীবিত না থাকেন তাহলে তাকে অবশ্যই মতলববাজ বলে অভিহিত করতে হবে বৈ কি।

বেগম জিয়ার শাসনামল সম্পর্কে এত অভিযোগ করা যাবে যে তা লিখতে গেলে রামায়ণের মতো বিশালবপু গ্রন্থের আকার ধারণ করবে। তার আমলে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা, চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র আটক, মৌলবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহকে রাষ্ট্রীয় ও সরকারীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দান, হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সীমাহীন লুটপাট, শাহ এএমএস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অজস্র প্রগতিবাদী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা, জামায়াতী তথা পাকিস্তানবাদীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বক্ষেত্রে পুনর্বাসন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্তাত বাংলাদেশের চরিত্র বদলে দেবার জন্য এমন কোন অশুভ উদ্যোগ নেই যা নেয়া হয়নি। বিএনপির আমলে তারেক-কোকো ও লালু-ফালুরা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কিভাবে শত শত কোটি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে তা জাতি জানতে চায়। আজকে যখন বিএনপির নেতানেত্রীরা বর্তমান সরকারের দুর্নীতির কিসসা শোনাতে চান তখন তারা বেমালুম ভুলে যান যে, তাদের আমলে দুর্নীতি সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে আমলে হুজি, জেএমবি, লস্করে তৈয়বা, হিযবুত তাহ্রীর, উলফা প্রভৃতি জঙ্গীগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ ছিল অভয়ারণ্য-বিশেষ। তারেক জিয়া চিকিৎসার নামে ব্রিটেনে প্রাসাদোপম বাড়িতে বছরের পর বছর যাবত আছে আর সেখানে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা গ্রহণ করছে- এত টাকা সে কোথায় পেল বা পায়? ভাঙ্গা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জির গল্প ফেঁদে এই অবিশ্বাস্য সম্পদ-সম্পত্তি অর্জনের রহস্য কী? এই অর্বাচীন যুবার মিথ্যা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে কারা এত সচেষ্ট তা সকলেরই গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। এ নিশ্চয়ই কোন ব্যক্তিবিশেষ নয় বরং কোন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের এজেন্টরা এই কাজে নিযুক্ত বলে জনশ্রুতি আছে।

সততা ও সৎ রাজনীতিকের শক্তিই আলাদা। নীতি ও আদর্শবাদী রাজনীতিকের কদরই আলাদা। কিন্তু দেশে অসৎ, অসাধু, নীতি ও আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি সৃষ্টির মাধ্যমে যে ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে তা দারুণ বিপজ্জনক। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য আদর্শনিষ্ঠ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্থাত, সৎ, সুশিক্ষিত, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

তারেক চিকিৎসার অজুহাতে লন্ডন গিয়ে তিনি এখন সেখানে বসে নতুন ষড়যন্ত্রের নকশা এঁকে চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশে অবরোধ, লং মার্চ, আন্দোলনের নামে বহু মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার মাধ্যমে যে পৈশাচিক আনন্দ তিনি লাভ করেছেন তা ক্রমান্বয়ে তার মাঝে এক বিকৃত মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে কিনা কে জানে! শুধু তার মুখেই কেন, আসলে গোটা বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যেই বিকৃত উন্মাদনা সংক্রামিত হয়েছে বলে মনে হয়। জামায়াতের সঙ্গদোষে এই বিকৃতির মাত্রা যে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এতে আর সন্দেহ কী! তারা হয়ত ভাবছেন বিদেশী প্রভুদের সহায়তায় সরকারকে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে ও মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করতে পারবেন আর তাই বেগম জিয়া সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার ব্যাপারে ইদানীং এত আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

তবে এ পরিস্থিতিতে বলতেই হবে যে, নিরীহ শান্তিবাদী ও নিরপরাধ মানুষের রক্তে হোলি খেলায় অভ্যস্ত ও ষড়যন্ত্রের মহানায়িকা বেগম জিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার কোন তাৎপর্যই থাকতে পারে না। জামায়াতের রক্তাক্ত হাতে হাত রেখে বিএনপি যে বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি করছে তাতে এদের সঙ্গে আপোস হবে কী করে?