২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী মৌলবাদ দমন ॥ মিসরীয় অভিজ্ঞতা

  • মুনতাসীর মামুন

(শেষাংশ)

উগ্রপন্থা নিয়ন্ত্রণে আরেকটি কার্যকর পন্থা হতে পারে দ্রুত বিচার। একই দিনে ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট আরেকটি খবর হলো এক জঙ্গীর বিচার। আবেল হাবারা ও আরও ছয়জন ২৫ জন নবিসী পুলিশ বহনকারী একটি গাড়ি এ্যামবুশ করে হত্যা করে। এরা তাকফিরি গ্রুপ নামে পরিচিত। এদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে আইএসের। ইসলামের অন্য অনেক ফিরকাকে এরা কুফরি মনে করে। তাকফিরি গ্রুপ পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে টার্গেট করেছে। এদের সবাইকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে।

আমাদের এখানে কয়জন জঙ্গী গ্রেফতার হয়েছে? সঠিক সংখ্যা কত? কতজনকে মহামান্য আদালত জামিন দিয়েছেন। মিসরে কোন জঙ্গী জামিন পেয়েছে বলে শোনা যায়নি। কোন জঙ্গীর বিরুদ্ধে তদন্তকারী অফিসার যদি দুর্বল চার্জ দেয় তা হলে তাকেও বিচারের সম্মুখীন করা উচিত। অন্তত এ ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল এ্যাক্টিভিজম কাম্য।

আলেকজান্দ্রিয়ায়ও আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। আল গামাল নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন সদস্য। তার বিয়ে ছিল ১৪ নবেম্বর। বিয়ে সেরে কনেকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছেন তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানায়, ব্রাদারহুডের আন্দোলনের সময় আলেকজান্দ্রিয়ার আল আসাফারা পুলিশ ফাঁড়িতে গুলি চালান তিনি। ঐ সময় সৃষ্ট আরও অনেক ভায়োলেন্সের সঙ্গে আল গামাল জড়িত।

কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার ফলে মিসরে এখন ব্রাদারহুড বলে পরিচয় দিতে কেউ রাজি নয়। ব্রাদারহুডের সমর্থন ছিল ২৩ ভাগ। সুতরাং, নিষিদ্ধ করলেই ব্রাদারহুড আদর্শ অস্তমিত হয়ে যাবে তা নয়। সিসির আগেও তো গত দু’তিন দশকে ব্রাদারহুডের অনেকে চাকরি, ব্যবসা পেয়েছেন। আদর্শ অস্তমিত হবে না তবে যাদের সেই আদর্শ কার্যকর করার কথা, তাদের পক্ষে তা অসম্ভব হয়ে উঠছে।

২০০৭-০৯ সালে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াত ব্রাদারহুডের মতোই কার্যকলাপ চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার এখন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং তা নিয়ে কিন্তু সাধারণ মানুষ আপত্তি করেনি। কিন্তু সমস্যা অন্য খানে। আমাদের নীতি নির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসকদের অনেকে বিএনপি-জামায়াতকে আলাদা দল মনে করেন। বিএনপি-জামায়াত যে একই আদর্শে বিশ্বাসী দু’টি দল তা তারা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু, কেন আলাদা তাও ব্যাখ্যা করতে পারেন না। এখন তাদের পোশাক-আশাকও এক। বলা যেতে পারে একই দলের দুটি ফ্যাকশন। একটি অংশের নেতা খালেদা, অপর অংশের নিজামী। এক অংশের নেতাদের মুখে দাড়ি নেই, প্রকাশ্যে অনেক মহিলা আছেন, অন্য অংশের নেতাদের মুখে দাড়ি আছে, তাদের মহিলা নেতারা প্রকাশ্য নয়- এই পার্থক্য। আসলে, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসীদের অনেকের বন্ধুবান্ধব, ব্যবসায়ী পার্টনার, আত্মীয় বিএনপি করে। আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতার ‘বেয়াই’ বিএনপি নেতা। বিএনপি-জামায়াত এক করে দেখলে রাজনীতিতে তাদের অসুবিধা হতে পারে। এ কারণেই আমরা দেখি, অজস্র জামায়াত নেতা-কর্মী ও বিএনপি নেতা কর্মীকে আওয়ামী লীগে যোগদান করানো হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। প্রশ্ন করতে পারেন প্রমাণ কই? উত্তর হলো, দাগী অনেক আসামি তা হলে কীভাবে আওয়ামী আনুকূল্য পায়? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও নিশ্চয় এর প্রতি সমর্থন আছে, নয়ত যারা এসব করছেন তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতেন। এ কারণে সরকার বা সরকারী দল জঙ্গী মৌলবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না।

মিসরে এ ধরনের কর্মপন্থা অসম্ভব। কেউ ভাবতেই পারে না ব্রাদারহুডের কোন সদস্যকে সেক্যুলার কোন দলে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মিসরের মানুষজন ধার্মিক, ইসলামের আদিকাল থেকে মিসর ইসলামেরও অন্যতম কেন্দ্র, আল্লাহর অনেক নবীর জন্ম মিসরে। কিন্তু এখন এখানে প্রকাশ্যে কোন আহমদ শফি বা চরমোনাইয়ের পীর নেই। ইসলাম বোঝার পার্থক্যটা এখানেই হয়ে যায়। আমাদের অধিকাংশ মুসলমান ইসলামের মর্মবাণী না বুঝে কাজ করে। মসজিদের মাদ্রাসা পাস ইমাম এ সমাজের নেতা। যে মাদ্রাসার সিলেবাসের সঙ্গে সমসাময়িক বিশ্বের কোন যোগ নেই। এখানে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে প্রধানমন্ত্রীর পরই বা সঙ্গে স্থান দেয়া হয়। আমাদের দেশে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসকরা শিক্ষকদের বেতন নিয়ে উপহাস করেন। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা এখানে।

সিসি ব্রাদারহুড দমন করছেন দেখে বহির্বিশ্বেরও অভ্যন্তরীণ সমর্থন পাচ্ছেন। কিন্তু ব্রাদারহুড কতদিন দমিত থাকবে তা প্রশ্নের বিষয়। কারণ, এর আগেও ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অনেকবার খড়গ নেমে এসেছিল। এর একটি কারণ, মিসরের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। কয়েক হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে এই ধারণা হয়েছে আমার। অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। মিসরের সামরিক শাসকরা সাধারণ মানুষের অবস্থার কোন পরিবর্তন করতে পারেননি নিজেদের ছাড়া। এরা মিসরের ব্যবসা বাণিজ্য, জমিÑ সব নিয়ন্ত্রণ করেন। এ সেনাবাহিনী কার্যকর কোন বাহিনী নয়, কারণ এটি ব্যবসায়ী সেনাবাহিনী, প্রাইভেট কোম্পানির মতো। নিজেদের দেশ ছাড়া আর কোন দেশ জয় করতে পারেনি [যুদ্ধে]। পাকিস্তানেও একই অবস্থা। আর অস্ত্র দিয়ে আদর্শ ক্রয় করা যায় না। মিসরে রাজনৈতিক দলগুলোর যে অবস্থা সেখানে আদর্শ দিয়ে তারা ব্রাদারহুড আদর্শ কতটা পরাভূত করতে পারবে তাতে সন্দেহ আছে, সেখানে দারিদ্র্য প্রকট।

বাংলাদেশে এখনও সে সুযোগটা আছে। আওয়ামী লীগ বা জোট জামায়াত-বিএনপি আদর্শের বিপরীতে নিজেদের আদর্শের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, যেটি বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। এবং এ প্রক্রিয়ায় নিজেদের হাতও শক্তিশালী করতে পারেন। প্যারিস ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে। বরং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে বিএনপি-জামায়াতকে সমর্থন করে বাংলাদেশে জঙ্গী মৌলবাদ উসকে দিয়েছিল তা তুলে ধরা উচিত। আসলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকরে দৃঢ়তা জঙ্গী মৌলবাদের উত্থান রহিত করতে পারে। অন্তিমে, মানুষ পাশে থাকল কিনা সেটাই প্রধান অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়। আদর্শ ও গরিবের ক্রোধের সামনে অস্ত্র কার্যকর নয়। কায়রো, ২০.১১.২০১৫