২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

আমার ভাইবোনেরা

(২১ নবেম্বরের পর)

আমার পরবর্তী সহোদরা ছিল ফাওজিয়া খাতুন। সে সিলেটে মহিলা কলেজে পড়ার সময় একবার ব্যর্থ হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। তার বেশ পরে ১৯৬৭ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বিএ পাস করে। ১৯৬৮ সালে ৭ জানুয়ারি সিলেটের শেখঘাটের বজলুন নূরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বজলুন নূর সম্পর্কে আমাদের ভাই ছিল এবং তখন সে ইসলামাবাদে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের সহকারী তথ্য অফিসার হিসেবে কাজ করত। তার বিয়ের পর সে ইসলামাবাদ চলে যায় এবং আমি তখন রাওয়ালপি-িতে থাকায় আমার বোন প্রায়ই আমাদের সঙ্গে সময় কাটাত। ১৯৭০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তার সন্তান রাফাত নূরের জন্ম হয়। তারা তখন করাচিতে আগ্রাবাদ কলোনির বাঙালী পাড়ায় থাকে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা করাচিতে ছিল এবং মার্চ থেকেই নানা শঙ্কা ও বিপদের মধ্যে বসবাস করত। সেপ্টেম্বরে বিমানে ঢাকা ভ্রমণের সুযোগ পেয়েই সে ঢাকায় যায় এবং সেখানে তখন সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল ও নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছিল। ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পরেই ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে সে ইহলোক ত্যাগ করে। তার ছেলে এখন একটি ব্যাংকে চাকরি করে এবং তার দুটি ছেলে আছে।

আমার পিতামাতার সপ্তম সন্তান হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিবসে। স্কুল ছুটি হলে আমরা বাড়ি গিয়ে দেখি আমাদের একটি ফুটফুটে ভাইয়ের জন্ম হয়েছে। সে হলো আবু সালেহ আবদুল মুয়িজ, যে সুজন নামে সমধিক পরিচিত। সে ছাত্রাবস্থায় সিলেট, বাগেরহাট, ঢাকা ও ময়মনসিংহে আমাদের বাড়িতে আমার ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করে। ১৯৬৯ সালে সে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেয় এবং আজীবন এই খাতেই নিয়োজিত থাকে। সে ১৯৭০ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেলে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনে ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেয় এবং ১৯৯৬ সালে জেনারেল ম্যানেজার হয়। অতঃপর অবসরান্তে সে গ্রীন হেরাল্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেয় এবং এখনও সে উপদেষ্টা হিসেবে বহাল আছে। ১৯৮৭ সালের ১০ আগস্ট সে নিজে পছন্দ করে শারমিন ওরফে মিতা নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করে। সেই বিয়েটি কিন্তু টিকল না এবং পরে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সুজন সকলের প্রয়োজনে সব সময় সেবাদানে প্রস্তুত ও হাজির। আমার বন্ধু ও আত্মীয় মহলে সুজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি এবং সকলের সব কাজে সহায়ক।

আমাদের পরবর্তী সহোদর হলো ড. আবুল কাশেম আবদুল মুবিন। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে অর্থনীতিতে এমএ পাস করে পাকিস্তান আয়কর সার্ভিসে যোগ দেয় ১৯৬৮ সালে। ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত সে ছিল ঢাকায় আয়কর বিভাগের সহকারী কমিশনার। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালেই সে পরিকল্পনা কমিশনে সহকারী প্রধান হিসেবে যোগ দেয় এবং ১৯৮১ সালে যুগ্ম-প্রধান হিসেবে টিআইপি (ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি) প্রকল্পের পরিচালক হয়। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সে ছিল অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব। তারপর এক বছর ছিল পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সে ছিল অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। অতঃপর যমুনা সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে সে অবসরে যায় ২০০০ সালে। অতঃপর সে টার্নওভার ট্যাক্স কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয় ২০০০ সালে। সরকার পরিবর্তন হলে ২০০১ সালে পদত্যাগ করে। ১৯৭৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুর নিবাসী সৈয়দ সৈদুদ্দিনের কন্যা লুলু বিলকিস বানুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার বড় মেয়ে ড. সামিয়া ইমরান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে স্ত্রীরোগের অধ্যাপক এবং বড় ছেলে শাব্বির মুবিন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক। তার কনিষ্ঠ ছেলে শাফাত মুবিন বর্তমানে পেনসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করছে। বর্তমানে ড. মুবিন বাংলাদেশ চা বোর্ডের গবর্নিং বডির চেয়ারম্যান। আমাদের নবম সহোদর হলো ড. আবুল কালাম আবদুল মোমেন, যে বর্তমানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছে। সে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের শেষ কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেয়; কিন্তু আমার ভ্রাতা বলে ১৯৭১ সালে কোন চাকরির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষিত হয়। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী ফরিদ গাজী তাকে তার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্তি দেন। তখন সে বাংলাদেশ সচিবালয় সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই কাজ করতে থাকে। সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হলে সে হয় তার ব্যক্তিগত সচিব। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে সে নাসিম বানু পারভিনকে বিয়ে করে; কিন্তু ২০০৪ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ১৯৭৮ সালেই সে হার্ভার্ডে পাবলিক সার্ভিস ফেলোশিপ প্রোগ্রামে কেনেডি স্কুলে পড়তে যায়। সেখান থেকে ১৯৭৯ সালে এমপিএ ডিগ্রী লাভ করার পর কয়েক বছর নিউ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও শিক্ষকতা করে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত হার্ভার্ডে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত সালেম স্টেট কলেজে, ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে এবং ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত মেরিম্যাক কলেজে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে সে কাজ করে। ১৯৮৪ সালে নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করে। ১৯৮৮ সালে সে নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে। ১৯৯৮ সালে সে সউদি ও মার্কিন সরকারের একটি যৌথ প্রোগ্রামে সউদি ফাইন্যান্স এবং ন্যাশনাল ইকোনমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করে। সেখান থেকে বোস্টনে প্রত্যাবর্তন করে ২০০৪ সালে সে ফ্রেমিংহাম স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও ব্যবসা বিভাগে অধ্যাপনায় নিযুক্ত থাকে। ২০০৫ সালের ২৮ আগস্ট সে কুমিল্লার সেলিনা বেগমের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। তার একটি ছেলে রাজীব মোমেন ও একটি মেয়ে লামিয়া বোস্টনে আছে এবং তাদের সঙ্গে নিউইয়র্কে আছে স্কুলের ছাত্রী সারা মোমেন। সে মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালী শিশু ও নারী পাচার নিয়ে কয়েক দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছে এবং এই কাজে যথেষ্ট সাফল্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। তার আগ্রহ বহুমুখী এবং এখন এসব আগ্রহের বিষয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখার সুযোগও পেয়েছে এবং তার যথোপযুক্ত ব্যবহারও করছে। তার কর্মদক্ষতা সম্বন্ধে আমরা সারা পরিবার গর্ববোধ করি।

পরবর্তী সহোদরা হলো অধ্যাপক নাজিয়া খাতুন। ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তার বিয়ে হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আতফুল হাই শিবলির সঙ্গে। সেও ইতিহাসের ছাত্রী এবং রাজশাহীতে স্কুল শিক্ষিকা ছিল। বর্তমানে শিবলি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য এবং নাজিয়া একটি কলেজে অধ্যাপনা করে। তাদের প্রথম সন্তান সাবির শিবলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসেবে ডাক্তার হয় ১৯৯৯ সালে এবং সেই বছরই সহসা সামান্য রোগে ভুগে ইন্তেকাল করে। দ্বিতীয় ছেলে শাকির সপরিবারে নিউজার্সিতে বসবাস করে।

চলবে...