২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তেরশ্রীর গণহত্যা

  • মজিবর রহমান

আজ মানিকগঞ্জের তেরশ্রী গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্থানীয় শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বর পাক হানাদারবাহিনীর সদস্যরা ঘিওর থানা সদর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরে তেরশ্রী এলাকায় তেরশ্রী স্টেটের সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ ৪৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গুলি করে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আসলে এটি কোন যুদ্ধের ঘটনা ছিল না। ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা। এই তেরশ্রীতে প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী ঘটনা ঘটেছিল তা আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। বর্তমানে জেলা ও জাতীয় পর্যায়েও বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। চুয়াল্লিশ বছর হতে চলেছে, বছর ঘুরে ২২ নবেম্বর আসে। তেরশ্রীতে গণহত্যা দিবস পালন করা হয়। যে শিশুটি জন্মেছিল ’৭১ কিংবা আরও পরে- এই বাড়ন্ত যুবকটি কি জানে তেরশ্রী গণহত্যা দিবস কী? কেন এই নৃশংস নির্মম হত্যাকা-? মানিকগঞ্জের তেরশ্রী একটি রক্তাক্ত ইতিহাস।

নবেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানা অপারেশন করার পর দৌলতপুর থানার নিরালী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধার দল যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল সেই সময় হঠাৎ পড়ন্ত দুপুরে আমাদের ক্যাম্পে সংবাদ এলো, তেরশ্রী গ্রাম এলাকায় পাকসেনারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে নারকীয় তা-বের সৃষ্টি করেছে। ক্যাম্প থেকে তেরশ্রী গ্রামের দূরত্ব হবে প্রায় আট কিলোমিটার। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দশজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা তেরশ্রী গ্রামে অপারেশনের উদ্দেশ্যে ছুটে আসি। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। তেরশ্রী জনপদের বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে স্বচক্ষে দেখতে পাই, রাজাকার-পাক সেনাদের লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও জঘন্যতম হত্যাকা-ের নারকীয় তা-বলীলা। ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী গ্রাম, বাজারসহ সংখ্যালঘুদের শতাধিক বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ৪৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যাকা-ের মাধ্যমে শ্মশান করে দিয়েছে।

স্থানীয় এক শিক্ষকের পূর্ব পরিকল্পনা এবং পাক সেনাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের মাধ্যেমে ২২ নবেম্বর ভোরে ঘিওর ও দৌলতপুর থানার তথাকথিত শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দ রাজাকার ও পাকবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তেরশ্রী জনপদের সেনপাড়ায় কালীঘরের সামনে এসে মিটিং করে এবং তারা মাথায় ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংখ্যালঘুদের পাড়ায় ঢুকে লুটপাট ও পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে হত্যাযজ্ঞ গুরু করে। এলাকার নিরীহ লোকজন ছোটাছুটি করে পালানোর চেষ্টা করে। স্থানীয় সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে মাথায় শাল চাদর মুড়িয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানকে বাসা থেকে ডেকে এনে তেরশ্রী বাজারে প্রকাশ্যে বুকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে। তাদের সঙ্গে এলাকার আরও ৪১ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতালাভের পর থেকেই তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদের স্মরণে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি ছিল তেরশ্রী এলাকার শহীদ পরিবারসহ এই এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। অবশেষে ২০১২ সালে তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তেরশ্রী শহীদ স্মৃতি পরিষদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন পর হলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তা এবং এলজিইডির কারিগরি সহায়তায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রকৃতির বুকে গড়ে উঠেছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নামে ৩০ ফুট ও ১৭ ফুট উচ্চতার দুটি স্তম্ভ মূল বেদির ওপর দ-ায়মান দৃষ্টিনন্দন নক্সায় নির্মিত হয়েছে এ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ঘিওর, তেরশ্রী-দৌলতপুর, নাগরপুর, টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের কোলঘেঁষে তেরশ্রী হাই স্কুল ও তেরশ্রী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন তেরশ্রী বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বিশাল আকারে নির্মিত তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি সর্বস্তরের মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিদিন যাত্রাপথে বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ গ্রামীণ জনপদের মানুষ ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে এমন একটি নান্দনিক স্থাপনা দেখে মুগ্ধ হন। মাথানত হয়ে আসে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায়।