১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিপুর বাঘে ভীত বিজেপি!

  • তাপস মজুমদার

ছেলেবেলায় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় ইতিহাসের টিপু সুলতান, কেন জানি না, আমাদের অনেকের কাছে ছিল হিরো, নায়কের মতো, নায়কোচিত। হায়দার আলীও ছিল প্রিয়, তবে টিপু সুলতান সমধিক। তখন সিলেবাসে আলাদাভাবে ইতিহাস ছিল না। যতদূর মনে পড়ে, সমাজ পাঠ শীর্ষক একটি বইয়ে একসঙ্গে স্থান পেত ইতিহাস, পৌরনীতি ও ভূগোল, পরীক্ষা নেয়া হতো এক শ’ নম্বরে। বড় হয়ে জানতে পারি মূলত টিপু সুলতান ছিলেন কায়মনোবাক্যে ব্রিটিশবিরোধী। এমনকি তার বাবাও। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনিই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী। আক্ষরিক অর্থে প্রথম ‘শহীদ’। ব্রিটিশরা তার বাবা ও টিপুকে যে রকম অত্যাচার-নির্যাতন, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছে, তাও অকথ্য ও অতুলনীয়।

অষ্টাদশ শতকের ইতিহাসের এই নায়ককে নিয়ে সম্প্রতি কর্নাটক তথা ভারতে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক, কাদা ছোড়াছুড়ি, হুমকি-ধমকি এমনকি দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এর মধ্যে একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুর খবরও আছে।

টিপু সুলতানের জন্ম ২০ নবেম্বর, ১৭৫০ এবং মৃত্যু ৪ মে, ১৭৯৯। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা, তদুপরি একজন বীর যোদ্ধা। পিতা হায়দার আলী ছিলেন মহীশূরের সেনাপতি। শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরী নদীর একটি বদ্বীপে নির্মিত একটি দুর্গে থেকে শাসন করতেন রাজ্য। বর্তমানে গ্রামটি দক্ষিণ ভারতের কর্নাটকের মান্ডিয়া জেলার অন্তর্গত। মহীশূরের চন্দনের বন, কাঠ, কারুপণ্য, সাবান, তেল ও অন্যান্য সামগ্রী খুবই জনপ্রিয় ও মহার্ঘ। টিপু সুলতানের বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের জন্য তাকে ডাকা হতো শের-ই-মহীশূর বা মহীশূরের বাঘ নামে। পরিহাস হলো, টিপুর এই উপাধিটা ইংরেজদেরই দেয়া। স্থানীয় কন্নড় ভাষায় টিপু অর্থ বাঘ। এর পাশাপাশি তার ছিল অসাধারণ ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা, সাহস ও বুদ্ধিমত্তা, কৌশলপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা, সর্বোপরি স্বাধীনসত্তা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে ১৭৯৯ সালে শহীদ হন টিপু। এখানেও মেলে সেই বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস! মীর সাদিক নামে টিপুর এক সেনাপতি গোপনে হাত মেলায় ব্রিটিশদের সঙ্গে। পরে টিপুর পরিবারকে ভেলোরের একটি দুর্গে আমৃত্যু বন্দী করে রাখা হয়।

টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিল বাঘ। পতাকায় কন্নড় ভাষায় লেখা থাকত ‘বাঘই ঈশ্বর’। সিংহাসন মূলত ছিল ব্রাঘ্যাসন (ঃরমৎব ঃযৎড়হব), বাঘের আদলে নির্মিত ডোরাকাটা, মাথায় ১০টি ব্যাঘ্রমু-ু। টিপুর রাজ্যের প্রায় সবকিছুই ছিল ব্যাঘ্রশোভিত, ব্যাঘ্রখচিত পোশাক, আশাক, সাজ-সজ্জা, অস্ত্রশস্ত্র, প্রতীক ইত্যাদি। ছোটবেলা থেকেই একাধিক বাঘ পুষতেন এবং আমৃত্যু তার এই তীব্র ভালবাসা বজায় ছিল। টিপুর একটি বিখ্যাত উক্তি : ভেড়া বা শেয়ালের মতো দু’শ’ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকা ঢের ভাল।

১৭৮১ সালে ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মুনরোর বাহিনীর কাছে দ্বিতীয় মহীশূরের যুদ্ধে টিপু ও তার বাবা প্রায় পর্যুদস্ত হন, রাজ্যের প্রভূত ক্ষতি হয়, নিহত হয় অনেক সেনা। টিপু তবুও পরাজয় মেনে নেননি অথবা আপোস করেননি। তো এই হেক্টর মুনরোর একমাত্র ছেলে ১৭৯৩ সালে সুন্দরবনের সাগর দ্বীপে বাঘ শিকার করতে গিয়ে নিহত হন বাঘের হাতে। এ ধারণা কাজে লাগিয়ে টিপু একটি অসাধারণ খেলনা নির্মাণ করেন, যা জগতে বিখ্যাত হয়ে আছে টিপুর টাইগার নামে। যন্ত্রচালিত খেলনাটিতে দেখা যায়, সুন্দরবনের একটি বাঘ এক ইংরেজকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করছে এবং তথাকথিত বীরপুঙ্গবটি ভয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তৎকালীন ফরাসী যন্ত্রকুশলীদের নির্মিত প্রমাণ সাইজের খেলনাটি পরিচালিত হতো ক্লকওয়ার্ক সিস্টেমে। সাউন্ডবক্সও ছিল, যা থেকে অর্গানের সুরে বেরিয়ে আসত বাঘের মুহুর্মুহু গর্জন, আহত ইংরেজের করুণ আর্তনাদ, সর্বোপরি টিপু সুলতানের প্রিয় গজলের সুর। মূলত টিপু ছিলেন একই সঙ্গে ব্যাঘ্রপ্রেমিক, দেশপ্রেমিক, ব্রিটিশবিরোধী, প্রচ- স্বাধীনচেতা তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী।

২৬৫ বছর পর ২০ নবেম্বর টিপুর জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে কংগ্রেস শাসিত রাজ্য সরকার মহাধুমধামে ১০ দিনব্যাপী পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। আর এতেই বেধেছে গোল। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, টিপু ছিলেন স্বৈরাচারী শাসক। ১০ নবেম্বর তিনি কর্নাটকের ৭০০ বাসিন্দাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিলেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এর প্রতিবাদে ১৩ নবেম্বর বন্ধের ডাক দিয়েছিল। তারা এমনকি কন্নড় ভাষার বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা গিরিশ কারনাডকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। মৃত্যুর হুমকি থেকে বাদ যাননি বিজেপি সাংসদ প্রতাপ সিমহাও। গিরিশ কারনাডের অপরাধ, তিনি বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরের নাম শহরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পেগৌড়ার পরিবর্তে টিপু সুলতানের নামে রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। মৌলবাদীরা টুইটারে তাকে এই বলে হুমকি দেয় যে, যুক্তিবাদী লেখক এমএম কালবুর্গির মতো মরতে হবে তাকেও। এদের অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে গিরিশ কারনাড অবশ্য বলেছেন, তিনি ভীত নন, মর্মাহত। এনডিটিভির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি এও বলেন, টিপু সুলতান ইস্যু নন, বরং দেশের রাজনীতি কোন্ খাতে বইছে, এটি তারই উদাহরণ। গোলমাল বা গু-াগিরি রাস্তার লোকজন করে না, করেন রাজনৈতিক নেতারা।

প্রসঙ্গত ইতোপূর্বে সংঘটিত একটি ঘটনা উল্লেখ করা আবশ্যক। টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী পালনের অন্যতম উদ্যোক্তা কর্নাটকের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া গো-মাংসের পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি গরুর মাংস খাব। তুমি প্রশ্ন করার কে?’ ব্যস, আগুনে যেন ঘি ঢালা হলো! এর প্রতিবাদে কর্নাটকের সিমোনা জেলার বিজেপি সেক্রেটারি এক জনসভায় হুমকি দিলেন এই বলে, ‘যদি সাহস থাকে সিদ্ধারামাইয়াকে এখানে এসে গরুর মাংস খেতে বলুন।... আমরা তার দেহ থেকে মাথা বিছিন্ন করে তা দিয়ে ফুটবল খেলব।’

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবেত্তা ইরফান হাবিবেব বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ‘ধামাধরা ইতিহাস’ (বসনবফবফ) চায়। বিজেপিকে চালাচ্ছে মূলত আরএসএস, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ হিন্দুত্ববাদী দলগুলো।... ইতিহাস বিকৃতির পথে হাঁটছে তারা। তারা খুব শক্তিশালী এক সাম্প্রদায়িক আদর্শ সৃষ্টি করতে চাইছে। তারা স্রেফ সাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক নয়। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা গুরু এমএস গোলওয়াকার মূলত ছিলেন হিটলারের নাৎসী মতের অনুসারী। ১৯৪৭ সালের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় তাদের খুঁজেও পাওয়া যায়নি। তারা আওরঙ্গজেব সড়কের নাম বদলে ফেলেছে; অথচ রাজা মানসিং সড়কের নাম পরিবর্তন করেনি। অথচ এই মানসিং মহারানা প্রতাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। কাজেই তাদের চোখে তো তিনি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা!

‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শীর্ষক চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত দু’দিনব্যাপী এক সম্মেলনের একটি সর্বসম্মত বক্তব্য দিয়ে শেষ করি : ইতিহাসচর্চা জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ী ও মানবমুখী করে তোলে। খ-িত ও বিকৃত ইতিহাস বিভ্রান্ত করে জাতিকে। তাই দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হলে ইতিহাসকে হতে হয় সত্যসন্ধানী, তথ্যনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ, যুক্তিনিষ্ঠ। সেক্ষেত্রে বিজেপি চাইলেও শেষ পর্যন্ত এর বাইরে যেতে পারবে বলে মনে হয় না।