১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২৬ শর্তে এডিবির বাজেট সহায়তা

  • চুক্তি সই আজ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ অবশেষে মিলছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার (২৫ কোটি ডলার) বাজেট সহায়তা। এ ঋণ পেতে শেয়ারবাজার সংস্কারে নতুন ২৬ শর্ত দিয়েছিল সংস্থাটি। এসব শর্ত মেনে নেয়ায় এডিবির সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। আজ রবিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। এতে সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন ও এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কাজুহিকো হিগুচি স্বাক্ষর করবেন।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে, ইতোমধ্যেই চুক্তির খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এডিবির দেয়া বাজেট সহায়তার শর্তগুলো পুরণযোগ্য বলে মনে করছেন এডিবি ডেস্কের প্রধান ইআরডির যুগ্ম সচিব সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এসব শর্ত পূরণ করা হলে আমাদেরও তো লাভ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ে। তাই আমরা আগে থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি। এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব বলেই এই ঋণে সম্মতি দেয়া হয়েছে। কেননা, এর আগেও এরকম নানা শর্ত পূরণ করে আমরা এডিবির কাছ থেকে ঋণ পেয়েছি।

ঢাকায় নিযুক্ত এডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, পুরো বাজেট সহায়তা নিয়ে একবারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে। পরবর্তীতে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কিস্তি ছাড় করা হবে। সূত্র জানায়, তৃতীয় পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচী (সিএমডিপি-৩) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দুই ধাপে বাজেট সহায়তার এ অর্থ পাওয়ার কথা। এ জন্য পুঁজিবাজারসহ আর্থিক খাতের সংস্কারসংবলিত ২৬টি শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরের মধ্যে ৮ টি শর্ত পূরণ হলে ৬৫০ কোটি টাকা। পরবর্তী ১৮ শর্ত পূরণ হলে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ছাড় করবে এডিবি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব শর্ত পূরণ করবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ),বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।

এডিবির বেঁধে দেয়া শর্তের মধ্যে পুঁজিবাজার বিষয়ক আইনকানুন সংশোধনের কিছু প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- সিকিউরিটি এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) জনবল বৃদ্ধিসহ সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালীকরণ এবং এসইসির সব কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা, পুঁজিবাজার কারসাজিতে জড়িতদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা এবং পুঁজিবাজারের নির্দিষ্ট আয়ের ওপর কর মওকুফ সুবিধা প্রদান।

শর্তের মধ্যে আরও রয়েছে বীমা খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন। আইডিআরএ’র জনবল কাঠামো ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। এছাড়া স্বাধীন ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল গঠন করার শর্ত দেয়া হয়েছে। যারা আন্তর্র্জাতিক মানসম্পন্ন অডিট করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনকানুন হালনাগাদেরও প্রস্তাব রয়েছে এডিবির শর্তে। এসব সংস্কারমূলক কাজ বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে এডিবি। এজন্য অতিরিক্ত সাত লাখ ডলার অনুদান সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আবু সাঈদ ফকির এ বিষয়ে বলেন, মূলত পুঁজিবাজার উন্নয়নে কিছু কার্যক্রম নিতে বলেছে এডিবি। সেসব শর্ত পূরণে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে। দুই ধাপের এ অর্থ সরকার যেকোন খাতে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। এটি সংস্থাটির একটি ভাল ঋণ বলে জানান তিনি।

এডিবি বলছে, শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট আইনকানুন এবং প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের অভাবে কয়েকটি বড় কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এজন্য এডিবি খাতটিকে শক্তিশালী করতে দুই দফা ঋণ দিয়েছে। এজন্য গত পাঁচ বছরে অনেক ভাল অবস্থানে উঠে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় দফায় পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচীতে অর্থায়ন করছে এডিবি।

সূত্র জানায়, শর্ত পূরণ না হওয়ায় পুঁজিবাজার উন্নয়ন সংক্রান্ত আগের ঋণটি আটকে যায়। তৎকালীন এডিবি ঢাকা কার্যালয়ের আবাসিক পরিচালক তেরেসা খোর সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে অর্থ মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে ইআরডি তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত ঋণটি পায় বাংলাদেশ। নতুন ঋণের শর্ত পূরণে কোন ধরনের গাফিলতি যাতে না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে ইআরডি। বাজেট সহায়তা হিসেবে মোট অর্থের মধ্যে ১০ কোটি ডলার নমনীয় ঋণ হিসাবে দেবে এডিবি। পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ২৫ বছরে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সুদ দিতে হবে ২ শতাংশ হারে। বাকি ১৫ কোটি ডলার আসবে তুলনামূলক কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে। এ ঋণের বিপরীতে লন্ডন আন্তঃব্যাংক সুদ হারের (লাইবর) সঙ্গে দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সব মিলিয়ে সুদের হার দাঁড়ায় ৩ শতাংশের বেশি। মাত্র তিন বছরের রেয়াতকালসহ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আবার অব্যয়িত অর্থের ওপর আরও দশমিক ১৫ শতাংশ চার্জ দিতে হবে সংস্থাটিকে।

বাজেট সহায়তা বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী জনকণ্ঠকে বলেছেন, বাজেট সহায়তা হলে সরকারের অর্থব্যবহারের স্বাধীনতা খর্ব হয় না। প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন করলে ওই টাকা শুধু নির্দিষ্ট ওই প্রকল্পেই ব্যয় করতে হবে। আর বাজেটে সহায়তা দিলে সরকার নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছে অনুযায়ী ঋণের টাকাটা ব্যয় করতে পারে। এটি সরকারের জন্য কাক্সিক্ষত ঋণ। সূত্র জানায়, এর আগে পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচীতে (দ্বিতীয় পর্যায়ে) প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা (৩০ কোটি ডলার)সহায়তা দেয় এডিবি। ১৫ কোটি করে দুই দফায় ৩০ কোটি ডলার ছাড় করে সংস্থাটি। এজন্য পুঁজিবাজার বিষয়ক মোট ২৮টি শর্ত বাস্তবায়ন করতে হয় সরকারকে। সম্প্রতি এ কর্মসূচীর কাজ শেষ হয়েছে।

এডিবি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে এর সদস্যপদ লাভ করার পর থেকে এ সংস্থা আর্থিক সহায়তার একটি বড় অংশ বাংলাদেশকে প্রদান করছে। এডিবি এ যাবত বাংলাদেশকে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের অধিক ঋণ দিয়েছে। উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে এডিবি প্রধানত বিদ্যুত, জ্বালানি, স্থানীয় সরকার, পরিবহন, শিক্ষা, কৃষি, পানিসম্পদ এবং সুশাসন খাতকে প্রাধান্য দেয়।