২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষি জমি সুরক্ষায় ভূমি ব্যবহারে নতুন আইন হচ্ছে

  • শীঘ্রই খসড়া মন্ত্রিসভায় তোলা হবে

সমুদ্র হক ॥ আবাদী জমিতে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন, ঘরবসতি ও শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় কৃষিভূমি কমে যাচ্ছে। অকৃষি খাতে ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহারে সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ওপর হুমকিও নেমে এসেছে। গবেষকরা এমনও বলেছেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশে সব ধরনের ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও খাদ্য রফতানি হচ্ছে। তারপরও জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার চাপের সঙ্গে কৃষিভূমি কমে যাওয়ার আনুপাতিক হার ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব পড়তেও পারে।

এ অবস্থার অবসানে জরুরীভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার- এমন মন্তব্য গবেষকদের। তবে সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার ২০১৫ নামে নতুন একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ে উত্থাপনের আগে তা আরও ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। আইনটির সকল খুঁটিনাটি বিষয় চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। শীঘ্রই তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত হবে। মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পেলে তা দ্রুত বিল আকারে পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে।

দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২শ’ ২০ হেক্টর কৃষি জমি অকৃষি খাতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর করে আবাদী জমি কমছে। এভাবে গত দুই দশকে (২০ বছরে) কৃষি ভূমির পরিমাণ কমেছে ৫০ লাখ একরেরও বেশি। এই প্রবণতা অব্যহত রয়েছে। উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে রাস্তাঘাট অবকাঠামো বসতভিটা শিল্পকারখানা ইটভাঁটি আবাসন অকৃষি স্থাপনাসহ নানা কিছু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। আরেকদিকে কৃষি জমিতে পরিবেশের ক্ষতিকর ফসল (যেমন- তামাক গঞ্জিকা নারকোটিকস) চাষাবাদ করা হচ্ছে। খোঁজখবর করে জানা যায় বনভূমি, টিলাভূমি, টিলা, পাহাড়, প্রাচীন প্রতœ নিদর্শনের মাউন্ট, জলাভূমি, চিংড়ি ঘের, চা বাগান, ফলের বাগান, রাবার বাগান, বিশেষ ধরনের বাগান কেটে নানা ধরনের স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। বিশ্ব উন্নয়ন সূচকে বলা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ভূমি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জীবন রক্ষা ও খাবার যোগানের উৎস এই ভূমি কৃষি সভ্যতার সঙ্গে সকল সভ্যতাই টেনে এনেছে।

জনবহুল দেশে ভূমির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই দেশে একটা সময় ছিল একান্নবর্তী পরিবার। তখন জনসংখ্যাও ছিল কম। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে গিয়ে যখন খ-িত পরিবারের পালা শুরু হয়ে গেল তখন খাদ্য উৎপাদনের উৎস আবাদী জমির ওপরই সরাসরি প্রভাব পড়ে। বসতভিটা নির্মিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে একদিকে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার চাপ, আরেকদিকে নগরায়ন সম্প্রসারণের পাল্লার সঙ্গে অবকাঠামো স্থাপনার যাবতীয় কার্যক্রম সবই চলে আবাদী ভূমির ওপর। এভাবে চাষাবাদের ভূমি খ-িত হতে থাকে। এক জরিপে বলা হয়েছে, গেল শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ শহর নগরে বাস করে। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ এবং নগরে বাস করার জন্য মানুষের ঢল অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর দিকে তাকালেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। ঢাকা মহানগরীর চার ধারে নগরায়ন প্রক্রিয়া সম্প্রসারিত হচ্ছে আবাদী ভূমির ওপরই। উত্তরাঞ্চলের মধ্যনগরী বর্তমানের শপিং ও ব্যবসা বাণিজ্যের নগরী হিসেবে অধিক পরিচিত বগুড়ার আশপাশে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে আবাদী জমির ওপর। যার বিস্তৃতি ঘটছে উপজেলা পর্যায় ছাড়িয়ে একেবারে মাঠ পর্যায়ে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এ সময়ে পাকা ধানের আবাদী জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল স্থাপনা। গ্রামের লোকজন বললেন, শিল্পকারখানাসহ নানা স্থাপনার জন্য এসব জমি কেনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অধিক দামে কেনা হয় কৃষি জমি। বেচা কেনার সময় থার্ড পার্টি ভাগ পায়। একই অবস্থা দেশের সকল জায়গাতেই।

গত শতকের আশির দশকের শুরুতে দেশে মোট আবাদী জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২০ লাখ একর। ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লাখ একরে। এর আগে ২ হাজার সালে (আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দফায়) জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি প্রণয়ন করা হয়। এরপর বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় গিয়ে এই নীতি বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমানে সুদূরপ্রসারি ভাবনায় ভূমি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনের খসড়া তৈরি হয়েছে। যাতে একেক এলাকার ভূমির জোনিং বা শ্রেণীবিন্যাস থাকছে।

সূত্র জানায়, আইনের খসড়ায় বলা হযেছে কোন কৃষি জমি বিনষ্ট করে আবাসন, শিল্প কারখানা ইটভাঁটি ও অন্য কোন অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কৃষি জমিতে পরিবেশ বিপন্ন করে এমন চাষাবাদ করা যাবে না। বিশেষ করে তামাক চাষ। প্রাকৃতিক ভূমি যেমন বনভূমি টিলাভূমি পাহাড়, প্রতœ নিদর্শনের মাউন্ট, চা বাগান, রাবার বাগান, বিশেষ ধরনের উদ্যান ওষুধি উদ্যান ফল-ফলাদির বাগান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মাটি কেটে পরিবর্তন করা যাবে না। দেশের সকল কৃষি জমির ওপর কৃষক ও কৃষিজীবীদের অধিকার সুরক্ষা করা হবে। কৃষি জমির শ্রেণী পরিবর্তন হলে মালিকানা সরকারের কাছে চলে যাবে। এ ছাড়াও কৃষি জমি রক্ষা করতে আইনের অনেক ধারা সংযোজিত হচ্ছে। খসড়া আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পর ইতোপূর্বের প্রজ্ঞাপন নীতিমালা নির্দেশনা কার্যকারিতা বিলুপ্ত হবে। তবে আইনটি যতদিন পাস না হচ্ছে ততদিন পূর্বের প্রজ্ঞাপন ও নতুনভাবে দেয়া নির্দেশনা বহাল থাকবে। নতুন আইন পাস হওয়ার পর কেউ আইনের বরখেলাপ করলে তার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ আইন পাস হলে কৃষি ভূমি সুরক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া হবেÑ এমনটি বলছেন বিশেষজ্ঞরা।