২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জমে উঠেছে বাফুফে বনাম শেখ জামাল লড়াই

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ দেনা-পাওনা নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। ২০১০-১১ থেকে ২০১৩-১৪ মৌসুম পর্যন্ত ঘরোয়া ফুটবলে অংশ নিয়ে অংশগ্রহণ ফি ও প্রাইজমানি বাবদ বাফুফের কাছে বিরাশি লাখ আটচল্লিশ হাজার দুই শত চার টাকা পাওনা শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের। এ ছাড়া ক্লাব সভাপতি, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক মনজুর কাদেরের কাছ থেকে ধার হিসেবে বাফুফে নিয়েছে ৬২ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে পাওনার পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। এ রকম কমবেশি সব ক্লাবই বাফুফের কাছে পাওনা। ২০১২ সালের ৭ নবেম্বর ইউসিবি ব্যাংকের চেকে ৬২ লাখ টাকা বাফুফেকে ধার দেন মনজুর কাদের। পরবর্তিত দুই চেকে (ত্রিশ ও বত্রিশ লাখ) বাফুফে উক্ত অর্থ ফেরত দেয় ঢাকা ব্যাংকের চেকে। কিন্তু বিগত প্রায় তিন বছরে বাফুফের দেয়া ওই দুই চেকে টাকা তুলতে পারেননি মনজুর কাদের। কারণ একটাই, একাউন্ট শূন্য। কোন অর্থ নেই। জানান মনজুর কাদের। তবে কি দেনার দায়ে জর্জরিত বাফুফে? এ বিষয়ে মনজুর কাদের সুস্পষ্ট জানালেন, আমার পাওনার হিসেব তো তাই প্রমাণ করে। এদিকে দেশের আরও তিন শীর্ষ ক্লাব আবাহনী, শেখ রাসেল ও মোহামেডানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ক্লাব কর্মকর্তারা মনজুর কাদেরের দেয়া তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খ্যাতিমান ক্লাব কর্মকর্তা বললেন, বাফুফে এখন দেউলিয়া। যদিও টাকা কোথা থেকে আসছে জানা গেলেও কিভাবে কোন খাতে কত খরচ হচ্ছে তার কোন হিসেব বা জবাবদিহিতা নেই। আর এ কারণে বাফুফের এই দৈন্যদশা। বিধান থাকলেও বিগত সাড়ে তিন বছরে কোন বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হয়নি। কারণ একটাই এজিএম করতে গেলে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে হবে। এতে ফেঁসে যেতে পারেন বাফুফের বর্তমান কমিটির অনেক রথী-মহারথী। ফলে নিজেদের গাঁ বাঁচানোর লক্ষ্যে এজিএম করা থেকে বিরত রয়েছেন তারা। মনজুর কাদের জানালেন, ফুটবল ফেডারেশনকে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। একটা বিমানের টিকেটও কোন প্রতিষ্ঠান বাকি দিতে রাজি হয় না। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মানসন্মান নিয়ে বর্তমানে ফুটবলের সঙ্গে জড়িত থাকা দায়। আর এ কারণেই আমি বাফুফের জেলা ফুটবল লীগ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এ দায়িত্ব নিয়েছিলাম। গাঁটের অর্থও কম খরচ করিনি। আমি যেখাকে গিয়েছি এক লাখ করে টাকা অনুদান দিয়েছি। ১০ হাজার ডলারের ফুটবল কিনে প্রত্যেক জেলায় পাঠিয়েছি। কিন্তু জেলা ফুটবল সঠিক আলোর দেখা পায়নি বাফুফের গাফিলতিতে। উদাহরণ টানতে গিয়ে মনজুর কাদের বললেন, আপনি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সবার আগে প্রয়োজন জবাবদিহিতা। এ্যাকাউন্টিবিলিটি না থাকলে ধস নামতে বাধ্য। অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠান। বাফুফের অবস্থা এখন তাই। এখান থেকে ইতোমধ্যে অনেকেই আখের গুছিয়ে নিয়েছে। পর্দার অন্তরালে থেকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট মালিক হয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপসহ বিভিন্ন খেলা, অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাফুফের ভেতরে থাকা ওপরের সারির কর্মকর্তা-সদস্য হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এটা ‘ওপেন সিক্রেট’। ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই কমবেশি অবগত। কাজেই এসব অসৎ লোকজনের সঙ্গে ফেডারেশনে আমি থাককে পারি না। আর এ কারণেই সন্মান নিয়ে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এদেশের ফুটবলে আমার অবদান কি সবার জানা। নব্বই দশকে সাদামাটা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রকে ‘ড্রিম টিম’ হিসেবে পরিণত করে ঘরোয়া ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলাম। এরপর ধানমন্ডি ক্লাবের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেঝো ছেলে শেখ জামালের নাম যোগ করে (লে., শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব) একটি সাড়া জাগানো দলে পরিণত করেছি। নতুনরূপে গঠিত এই ক্লাবটির যাত্রা শুরু দেশে-বিদেশে একের পর এক শিরোপা জয়ের মধ্যে দিয়ে। যা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। এক কথায় দেশের মৃতপ্রায় ফুটবলে পুনর্জীবন দিয়েছি। ফেডারেশনের বিরুদ্ধে কথা বলায় শুনেছি আমাকে নাকি ‘শোকজ’ করা হয়েছে। চিঠি আমি এখনও হাতে পাইনি। ফলে বলতে পারছি না কি লেখা আছে। তবে এ বিষয়ে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে অসৎ বাফুফের কর্মকর্তাদের কোন শোকজের জবাব দিতে আমি দায়বদ্ধ নই। আমি তাদের বেতনভুক্ত কেউ নই যে, তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আমি বাফুফের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ, অন্তঃপ্রান ফুটবলপ্রেমী সংগঠক হিসেবে কথা বলার অধিকার রাখি। এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কাউকে জিজ্ঞেস করে কথা বলা বা ভয় পেয়ে না বলার লোক আমি নই। আমি দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই বিগত সাত বছরে দেশের ফুটবলের কোন উন্নতিই হয়নি। ফিফা ও এএফসির অনুদানের অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে কেউ জানে না। ফুটবলের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ বাফুফেকে দেয়া হয়। কিন্তু ফুটবলের পেছনে খরচ করার পরিবের্তে বেশিরভাগ অর্থ গোপনে আত্মসাত করা হচ্ছে। যদি উন্নয়ন খাতে খরচ হতো তাহলে গোটা দেশের ফুটবল কেন ঝিমিয়ে পড়েছে। খেলোয়াড় তৈরির পাইপ লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের মামুনুলরা ছাড়া পরবর্তী কোন জেনারেশন তৈরি হয়নি। কাদের বললেন, সালাউদ্দিন ও সালাম মুর্শেদীর কাছে আমার প্রশ্ন ফিফা, এএফসির দেয়া অর্থ দেশের কোন ক্লাব, জেলা বা বিভাগকে দেয়া হয়েছে ফুটবল উন্নয়নে? শেখ জামাল টিম চালাতে বছরে আমাদের ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা খরচ হয়। সালাম মুর্শেদী তো কালো-সাদা মিলিয়ে কত টাকার মালিক নিজেই বলতে পারবেন কিনা সন্দেহ। তিনি আমার মতো এ রকম তিনটা ক্লাব একা চালানোর ক্ষমতা রাখেন। তার কাছে আমার প্রশ্ন, বাফুফের সিনিয়র সহ- সভাপতির হয়ে ‘আপনি কত টাকা ফুটবলকে দিয়েছেন?’ উত্তর একটাই, এক পয়সাও না। আমি মনে করি সালাম শূটিং করতে বাফুফেতে রয়েছেন। আমার এ ধরনের লোক প্রয়োজন নেই। আমরা কাজের লোক চাই ওই পদে। সালাম মুর্শেদীর মত কঞ্জুস লোকের সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে থাকার কোন অধিকার নেই।

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আয়োজন করতে আট কোটি টাকা খরচ হয়েছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে। তাদের পাওনা পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে টুর্নামেন্ট শেষ না হতেই। অথচ ক্লাবগুলোর পাওনা পরিশোধের কোন উদ্যোগ নেই। এতে বিষয়টা পরিষ্কার ওই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সালাম মুর্শেদী গংদের ‘আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংস’ রয়েছে। ফুটবল বাঁচিয়ে রেখেছে ঢাকার ক্লাবগুলো। ক্লাবগুলোর উন্নয়নে অনুদান দেয়া দূরের কথা, উল্টো ন্যায্য পাওনাটা পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে না। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ নেই। আমি জানি সালাউদ্দিনই পারবে দেশের ফুটবল এগিয়ে নিতে। আর এ কারণে গত নির্বাচনে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিভাবে পাশ করানো হয়েছে তা আমি ও ঢাকা মোহামেডানের ডিরেক্টর ইন চার্জ লোকমান হোসেন ভুঁইয়া জানি। কিন্তু বন্ধু বলে সালাউদ্দিনের দায়ীত্বজ্ঞানহীন কর্মকা-কে সমর্থন করতে পারি না। আমরা সত্য কথা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়েছি বলেই আমাদের দু’জনকে শোকজ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় দল পাঠানো হয়েছে চীনের একটি টুর্নামেন্টে। অথচ অন্য দেশগুলো ক্লাব টিম পাঠিয়েছে। আর ওই ক্লাব টিমের কাছে গোল খাচ্ছে আমাদের জাতীয় দল। এটা ফুটবলের জন্য লজ্জা। ক্লাব দল না পাঠনোর অন্যতম কারণ শেখ জামাল ধানমন্ডিকে কোণঠাসা করে রাখা। কারণ ক্লাব টিম নিলে লীগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেখ জামালকে পাঠাতে হতো। সদ্য সমাপ্ত শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার সুযোগ দেয়া হয়নি শেখ জামাল ধানমন্ডিকে। এটা সালাম মুর্শেদীদের ষড়যন্ত্র। এসব অন্যায় সালাউদ্দিন থাকতে কিভাবে হচ্ছে তা আমার বোধগম্য নয়।

এদিকে সালাম মুর্শেদী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার কাজ আমি করি। আমি এখানে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে কাজ করতে এসেছি। মোহামেডানেও অনেকদিন কাজ করেছি। এখন আমাকে নিয়ে কে কি বলছেন, সেটা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই, প্রতিক্রিয়াও নেই।

মনজুর কাদের বাফুফের কাছ থেকে কত টাকা পাবেন এ বিষয়েও কিছু বলার নেই। তিনি একজন বড় মনের ক্রীড়া সংগঠক। তিনি আমার বয়সে বড়, তাকে আমি শ্রদ্ধা করি, তাই আমি তাকে নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আমাদের উভয়ের অবস্থান ভিন্ন। আমি যা করতে পারি সেটা তিনি করতে পারবেন না। আবার তিনি যেটা করতে পারবেন, আমি সেটা করতে পারবো না।

নির্বাচিত সংবাদ